বাংলার ইতিহাসে এমন এক সময় ছিল, যখন মুসলমানদের জন্য গরু কুরবানি করা ছিল অত্যন্ত কঠিন। আজকের বাংলাদেশের ভূখণ্ডে বহু এলাকায় হিন্দু রাজা ও জমিদাররা গরু কুরবানির অনুমতি দিতেন না। ইতিহাসের নানা দলিল ও সংবাদপত্রে এই বাস্তবতার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।
ব্রিটিশ আমলে ঢাকায় মুসলমানরা কিছুটা প্রভাবশালী অবস্থানে থাকলেও, ঢাকার বাইরে পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন। অনেক অঞ্চলে হিন্দু জমিদারদের বাধার কারণে মুসলমানরা ঈদ উপলক্ষ্যে প্রকাশ্যে গরু কুরবানি করতে পারতেন না।
১৮৯০ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি “সুধাকর” পত্রিকায় লেখা হয়েছিল—
বগুড়ার নারহাট্টা এলাকায় বকরি ঈদের সময় মুসলমানদের কোরবানি করতে বাধা দেওয়া হয়। পত্রিকাটি মুসলমানদের এ বিষয়ে লেফটেন্যান্ট গভর্নরের কাছে স্মারকলিপি দেওয়ার আহ্বান জানায়।
ঢাকায় নবাব পরিবার ও প্রভাবশালী মুসলিম সমাজ থাকায় সেখানকার পরিবেশ তুলনামূলক শান্ত ছিল।
১৮৯০ সালের ৩০ মার্চ “সারস্বতপত্র” লিখেছিল—
ঢাকায় হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক ছিল। উভয় সম্প্রদায় একে অপরের ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশ নিত এবং কারও ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করতে চাইত না।
কিন্তু পূর্ব বাংলার অন্যান্য অঞ্চলে গরু কুরবানিকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা বাড়ছিল। ইতিহাসবিদ মুনতাসীর মামুন উল্লেখ করেছেন, গরু কোরবানির বিষয়টি ধীরে ধীরে দুই সম্প্রদায়ের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিরোধের কেন্দ্রে পরিণত হয়েছিল।
সেই সময়ের সংবাদপত্রগুলোতেও এই উত্তেজনার চিত্র পাওয়া যায়।
“সারস্বতপত্র” লিখেছিল—
আগে প্রয়োজন ছাড়া মুসলমানরা গো-হত্যা করত না, আর হিন্দুরাও তা মেনে নিত। কিন্তু সময়ের সঙ্গে দুই পক্ষের মধ্যেই অসহিষ্ণুতা বাড়তে থাকে।
ইতিহাস বলছে, ১৯২৬ সালের আগ পর্যন্ত ভারতবর্ষে গরু কুরবানিকে কেন্দ্র করে কমপক্ষে বিশটিরও বেশি দাঙ্গা হয়েছিল। গবেষক Gene R. Thursby তাঁর বই Hindu Muslim Relations in British India-এ এসব ঘটনার বিস্তারিত উল্লেখ করেছেন। অনেক শহরে কুরবানির ঈদ এলেই ১৪৪ ধারা জারি করা হতো।
১৯৪৭ সালের দেশভাগের আগে বাংলার মুসলমানদের বহু জায়গায় গরু কুরবানি করতে হতো ভয় ও বাধার মধ্যে দিয়ে। ধর্ম পালন ছিল অনেক ক্ষেত্রেই সংগ্রামের বিষয়।
আরও পেছনের ইতিহাসে গেলে উঠে আসে সিলেটের রাজা গৌড় গোবিন্দের সময়কার ঘটনা। জনশ্রুতি অনুযায়ী, মুসলিম প্রজা বোরহানউদ্দিন তাঁর শিশুপুত্রের আকিকার জন্য গরু কুরবানি করেছিলেন। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে রাজা গৌড় গোবিন্দ তাঁর হাত কেটে দেন এবং শিশুপুত্রকে হত্যা করেন।
বিচার চাইতে বোরহানউদ্দিন বাংলার সুলতান শামসউদ্দিন ফিরোজ শাহ-এর কাছে যান। পরে সুলতানের পক্ষ থেকে সিকান্দার গাজীর নেতৃত্বে অভিযান চালানো হয়। প্রথম দুইবার পরাজয়ের পর তৃতীয় অভিযানে নাসিরুদ্দিনের বাহিনীর সঙ্গে যোগ দেন সুফি সাধক হযরত শাহজালাল এবং তাঁর সঙ্গীরা। অবশেষে ১৩০৩ সালে গৌড় গোবিন্দ পরাজিত হন এবং সিলেট মুসলিম শাসনের অধীনে আসে। এরপর কোরবানিতে বাধা কেটে যায়।
ইতিহাসের এই ঘটনাগুলো দেখায়, বাংলার মুসলমানদের ধর্মীয় অধিকার প্রতিষ্ঠা সবসময় সহজ ছিল না। গরু কুরবানির মতো একটি ধর্মীয় অনুশীলনের পেছনেও ছিল দীর্ঘ সামাজিক ও রাজনৈতিক সংঘাতের ইতিহাস।