Tuesday, June 9, 2026
Live

পদ্মা সেতু চালু হলো, হাজার মাইল দূরে আনন্দে বুক ভাসালেন চোংমেই!

সিএমজি
সিএমজি বাংলা বিভাগ
Published: Updated:
পদ্মা সেতু চালু হলো, হাজার মাইল দূরে আনন্দে বুক ভাসালেন চোংমেই!

বাংলাদেশে যখন কোটি মানুষের স্বপ্নের পদ্মা সেতু উদ্বোধনের আনন্দে মাতোয়ারা, তখন সেই উৎসবের মঞ্চ থেকে হাজার মাইল দূরে, চীনের চিয়াংসি প্রদেশের চিউচিয়াং শহরের নিজের ড্রয়িংরুমে বসে টেলিভিশনের পর্দায় চোখ রেখেছেন এক নারী। স্ক্রিনে যখন একের পর এক গাড়ি সেতু পার হচ্ছিল, তখন তার চোখে ছিল আনন্দের জল আর বুকভরা গর্ব।

তিনি ওয়াং চোংমেই। পদ্মা সেতুর জমকালো উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে হয়তো তিনি ছিলেন না, কিন্তু এই সেতুর গভীরতম ভিত্তির প্রতিটি জোড়াতালিতে মিশে আছে তার হাতের ছোঁয়া, তার শ্রম আর মেধা। তিনি চীন রেলওয়ে চিউচিয়াং সেতু প্রকৌশল কোম্পানির প্রধান ওয়েল্ডার।

পদ্মা সেতুর মতো একটি মেগা প্রকল্পের মূল চ্যালেঞ্জ ছিল এর পিলারের নিচে থাকা আমাজন নদীর পর বিশ্বের সবচেয়ে অশান্ত ও পরিবর্তনশীল পানির স্রোত এবং নরম মাটির তলদেশ। সেতুটিকে টিকিয়ে রাখতে প্রয়োজন ছিল ১২০ মিটারেরও বেশি লম্বা বিশালাকার স্টিলের পাইপ পাইল। ৩ দশমিক ২ মিটার দৈর্ঘ্যের এবং প্রায় ৬ সেন্টিমিটার পুরু একেকটি স্টিলের পাইপ জোড়া দিয়ে এই পাইলগুলো তৈরি করতে হতো।

এই পাইপগুলো পানির নিচে নরম মাটিতে পুঁতে দেওয়ার পর বছরের পর বছর ধরে তীব্র স্রোত ও মাটির প্রচণ্ড চাপ সহ্য করতে পারবে কিনা—তা নির্ভর করছিল নিখুঁত ওয়েল্ডিং বা ঝালাইয়ের ওপর। আর এই গুরুদায়িত্ব পড়েছিল ওয়াং চোংমেই এবং তার দলের ওপর। পদ্মা সেতুর জন্য তৈরি প্রথম স্টিলের পাইপ পাইলের ওয়েল্ডিং পরীক্ষাটি হয়েছিল তার হাত ধরেই।

পানির ওপর কীভাবে দ্রুত ও নিখুঁতভাবে এই পাইপগুলো জোড়া দেওয়া যাবে, তা নিশ্চিত করতে ওয়াং এবং তার দল কারখানায় টানা ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে বারবার পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ওয়েল্ডিংয়ের পরীক্ষা চালান। চীনের 'বেল্ট অ্যান্ড রোড' উদ্যোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এই প্রকল্পের মজবুত ভিত্তি তৈরিতে তাদের নেপথ্যের শ্রম ছিল অনবদ্য।

সেতুর ওপর দিয়ে যখন গাড়ি চলে, তখন নিচের এই ইস্পাতের ভেতরের কারিগরি সাধারণ মানুষের চোখে পড়ে না। ওয়াং বলেন, ‘আমাদের সবসময় যাত্রীদের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হয়। রেল ও সড়ক নিরাপত্তা কোনো ছোট বিষয় নয়।‘

সেতু তৈরিতে শ্রম ঢালার এই নেশা ওয়াং পেয়েছিলেন উত্তরাধিকার সূত্রে। তার বাবাও একজন ওয়েল্ডার ছিলেন, যিনি চীনের বিখ্যাত 'চিউচিয়াং ইয়াংজি রিভার ব্রিজ' নির্মাণে অংশ নিয়েছিলেন। বাবার অনুপ্রেরণায় ২০০১ সালে কারিগরি স্কুল থেকে পাস করে এই পেশায় আসেন ওয়াং। তবে কাজটা সহজ ছিল না। তীব্র তাপ, ধোঁয়া, আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর সংকীর্ণ জায়গায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে কাজ করা—প্রথম দিনের অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করে ওয়াং বলেন, ‘কাজের প্রথম দিন শেষে তীব্র তাপ আর আলোয় আমার চোখ দুটি ফুলে গিয়েছিল।‘

সে সময় তার সাথে আরও সাত নারী এই পেশায় এসেছিলেন। কিন্তু কঠিন পরিবেশের টিকতে না পেরে একে একে সবাই চাকরি ছেড়ে দেন। কেবল ওয়াং হাল ছাড়েননি।

ধৈর্য আর মেধা দিয়ে ওয়াং শুধু টিকেই থাকেননি, বরং নিজের কাজে এনেছেন বৈপ্লবিক পরিবর্তন। ১৬ থেকে ২৮ মিলিমিটার পুরু স্টিলের প্লেট ঝালাই করার প্রচলিত ও জটিল 'ডাবল-সাইডেড' পদ্ধতিকে বদলে তিনি 'সিঙ্গেল-সাইডেড' পদ্ধতিতে রূপান্তর করেন। এতে কাজের গতি ও দক্ষতা বহুগুণ বেড়ে যায়। পরবর্তীতে তার এই উদ্ভাবনটি কোম্পানিতে "ওয়াং ঝংমেই ওয়েল্ডিং পদ্ধতি" নামে স্বীকৃতি পায়।

গত দুই দশকে ওয়াং চীনের ৬০টিরও বেশি বড় বড় মেগা সেতুর ওয়েল্ডিং ও প্রাথমিক পরীক্ষা-নিরীক্ষার কাজ সফলভাবে সম্পন্ন করেছেন। ২০১৩ সালে তিনি চীনের সেতু নির্মাণ ইতিহাসের প্রথম নারী ওয়েল্ডিং দলের নেত্রী হন। ২০১৫ সালে তার নামে একটি 'ইনোভেশন স্টুডিও' প্রতিষ্ঠা করা হয়, যেখানে তিনি তরুণ কর্মীদের প্রশিক্ষণ দেন।

আজ ওয়াং চোংমেইয়ের ছাত্রীরাও পুরোদস্তুর ওয়েল্ডার হয়ে উঠেছেন এবং নতুন প্রজন্মকে শেখাচ্ছেন। একটি সেতু যখন চালু হয়, সাধারণ মানুষ দেখে তার অবয়ব। আর ওয়াং ঝংমেইয়ের মতো কারিগরদের মনে ভেসে ওঠে কারখানার ভেতরে আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর রাতজাগা ক্লান্তিকর সব পরীক্ষার স্মৃতি। বাংলাদেশের পদ্মা সেতুও আজ বিশ্বমঞ্চে চীনের এই লড়াকু নারীর দক্ষতার এক নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। সূত্র: সিএমজি বাংলা

Rate This Article

How would you rate this article?

সিএমজি

সিএমজি

বাংলা বিভাগ

চায়না মিডিয়া গ্রুপ (CMG) চীনের রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচারকারী প্রধান কোম্পানি।

Our Editorial Standards

We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.

Fact-Checked

Every claim is verified by our editorial team before publication.

Expert Review

Content reviewed by subject matter experts for accuracy.

Regularly Updated

We update content to reflect the latest developments.

Unbiased Coverage

We present balanced perspectives and multiple viewpoints.