লস অ্যাঞ্জেলসের রাস্তায় যাচ্ছেন—হঠাৎ পাশেই এসে দাঁড়াল একটা সাদা রঙের জিপ। কৌতূহল নিয়ে একটু উঁকি দিলেন… আর চোখ কপালে! গাড়ির ভেতরে কেউ নেই—ড্রাইভারও না! মুহূর্তটা যেন সিনেমার দৃশ্য। চারপাশে ব্যস্ত শহর, আর তার মাঝখানে একদম চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকা “নিজে নিজে চলা” গাড়ি। প্রথমে একটু অবাক, তারপর মনে হলো—এটাই তো সেই ভবিষ্যৎ যেখানে গাড়িও আর ড্রাইভারের অপেক্ষা করে না!
প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে পৃথিবী আজ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে গাড়ি চালানোর জন্য মানুষের উপস্থিতি আর অপরিহার্য নয়। যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান "ওয়েমো" সফলভাবে এমন স্বয়ংচালিত গাড়ি পরিচালনা করছে, যেখানে স্টিয়ারিংয়ের পেছনে কোনো চালক থাকে না। অত্যাধুনিক সেন্সর, ক্যামেরা, রাডার, লেজারভিত্তিক দূরত্ব নির্ণায়ক যন্ত্র এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সমন্বয়ে এই গাড়িগুলো চারপাশের পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করে, রাস্তার অবস্থা বিশ্লেষণ করে এবং মুহূর্তের মধ্যে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারে। পথচারী, ট্রাফিক সিগন্যাল, অন্যান্য যানবাহন এবং রাস্তার বাঁক—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে এটি নিরাপদভাবে যাত্রীকে গন্তব্যে পৌঁছে দেয়।
২০১৭ সালে ওয়েমো যুক্তরাষ্ট্রের অ্যারিজোনার ফিনিক্স শহরে প্রথমবারের মতো জনসাধারণের সড়কে সম্পূর্ণ চালকবিহীন গাড়ি চালায়, যা ছিল প্রযুক্তির ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন শহরে প্রতি সপ্তাহে লক্ষাধিক যাত্রীকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবহন করছে। এপ ব্যবহার করে চাইলে আপনি ও রাইড রিকোয়েস্ট করতে পারেন।
প্রযুক্তিগত দৃষ্টিকোণ থেকে এই স্বয়ংচালিত গাড়িগুলো আসলে একটি চলমান “ডেটা প্রসেসিং সিস্টেম”। গাড়ির প্রতিটি মুহূর্তে হাজার হাজার ডাটা পয়েন্ট সেন্সর থেকে সংগ্রহ করা হয়, যা রিয়েল-টাইমে বিশ্লেষণ করে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সিদ্ধান্ত নেয়। মেশিন লার্নিং মডেলগুলো বিভিন্ন ট্রাফিক পরিস্থিতি, মানুষের আচরণ এবং রাস্তার জটিল প্যাটার্ন দীর্ঘ সময় ধরে শিখে নেয়, যার ফলে গাড়িটি সময়ের সঙ্গে আরও উন্নত ও নির্ভুল হয়ে ওঠে।
এখানে ব্যবহার করা হয় উচ্চ-নির্ভুল থ্রিডি ম্যাপিং সিস্টেম, যা রাস্তার প্রতিটি বাঁক, সিগন্যাল এবং লেনকে ডিজিটালভাবে মডেল করে রাখে। পাশাপাশি ফিউশন সিস্টেমের মাধ্যমে লাইডার, রাডার এবং ক্যামেরার তথ্য একত্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ “পারসেপশন ভিউ” তৈরি করা হয়, যাতে গাড়িটি মানুষের মতো নয় বরং আরও বিস্তৃতভাবে পরিবেশ বুঝতে পারে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় অগ্রগতি হলো “রিয়েল-টাইম ডিসিশন মেকিং”—অর্থাৎ গাড়িটি প্রতিটি সেকেন্ডে সম্ভাব্য ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে নিরাপদ পথ বেছে নেয়, যা মানুষের প্রতিক্রিয়ার চেয়েও দ্রুত হতে পারে। ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি শুধু ব্যক্তিগত যাত্রাই নয়, লজিস্টিক, ডেলিভারি এবং স্মার্ট সিটির পুরো পরিবহন ব্যবস্থাকে পরিবর্তন করে দিতে পারে।
এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা হলো সড়ক দুর্ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা। একই সঙ্গে এটি বয়স্ক ব্যক্তি, দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এবং যারা নিজে গাড়ি চালাতে পারেন না, তাদের জন্য চলাচলে এক নতুন স্বাধীনতা ও স্বাচ্ছন্দ্যের দুয়ার উন্মুক্ত করছে।
বিজ্ঞান, রোবোটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও প্রকৌশলের সম্মিলিত প্রয়াসে তৈরি এই প্রযুক্তি ভবিষ্যতের শহরকে আরও স্মার্ট, নিরাপদ ও কার্যকর করে তুলতে পারে। একসময় যে ধারণা কেবল কল্পবিজ্ঞানের গল্পে সীমাবদ্ধ ছিল, আজ তা বাস্তবে রাস্তায় চলতে শুরু করেছে।
- আরিফুর রহমান
(ফেসবুক থেকে)
(ফেসবুক থেকে)