Sunday, November 8, 2026
Live
জেনে রাখুন
Verified
৪ মিনিটে পড়া যাবে

অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে বিষাক্ত সিসা মিশছে খাবারে

নতুন গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য

মাহফুজ রহমান
মাহফুজ রহমান ডেস্ক সম্পাদক
প্রকাশ: আপডেট:
অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে বিষাক্ত সিসা মিশছে খাবারে
অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি থেকে বিষাক্ত সিসা মিশছে খাবারে

প্রতিদিনের রান্নায় ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের হাঁড়ি-পাতিল নিয়েই উঠেছে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকির প্রশ্ন। বাংলাদেশে তৈরি অ্যালুমিনিয়ামের কিছু রান্নার পাত্র নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় দেখা গেছে, এসব পাত্র থেকে বিষাক্ত ভারী ধাতু সিসা খাবারের সঙ্গে মিশে যেতে পারে। বিশেষ করে নতুন পাত্রে প্রথম দিকে সিসা খাবারে যাওয়ার মাত্রা তুলনামূলক বেশি পাওয়া গেছে।

গবেষণাটি ২৫ অক্টোবর ২০২৬ আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী Journal of Exposure Science & Environmental Epidemiology-তে প্রকাশিত হয়েছে। গবেষণায় যুক্ত ছিলেন স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয় ও আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর গবেষকেরা।

ভাত ও খিচুড়িতে মিলেছে সিসা

গবেষকেরা বাংলাদেশে ব্যবহৃত অ্যালুমিনিয়ামের ২৭টি রান্নার পাত্র পরীক্ষা করেন। এর মধ্যে ২০টি ছিল নতুন এবং ৭টি ছিল বিভিন্ন পরিবারের ব্যবহৃত পুরোনো পাত্র।

পরীক্ষায় নতুন পাত্রে প্রথমবার রান্না করা ভাতে প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ গড়ে ৩০৫ মাইক্রোগ্রাম সিসা পাওয়া যায়। খিচুড়িতে এই মাত্রা ছিল আরও বেশি—প্রতি কেজিতে সর্বোচ্চ গড়ে ৪২০ মাইক্রোগ্রাম।

পুরোনো পাত্রেও সিসার উপস্থিতি পাওয়া গেছে। গবেষণায় পরীক্ষা করা পুরোনো পাত্রগুলোর মধ্যে কয়েকটি থেকে রান্না করা ভাতেও উল্লেখযোগ্য মাত্রায় সিসা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষকদের মতে, নতুন পাত্র কয়েকবার ব্যবহারের পর খাবারে সিসা মেশার পরিমাণ কমতে পারে। তবে কমে গেলেও তা পুরোপুরি ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায় না।

নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে ঝুঁকি বেশি

গবেষণায় দেখা গেছে, নতুন পাত্রের গায়ে থাকা সিসা ব্যবহারের শুরুতে তুলনামূলক সহজে খাবারে চলে আসতে পারে। পরপর কয়েকবার রান্না করলে এই নির্গমন কমেছে।

তবে শুধু পাত্র নতুন না পুরোনো—এটিই ঝুঁকির একমাত্র বিষয় নয়। পাত্র কীভাবে পরিষ্কার করা হচ্ছে এবং রান্নার সময় কীভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণায় নতুন পাত্র শক্ত স্টিলের তারের জালি দিয়ে ঘষে পরিষ্কার করার পর সিসা নির্গমন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। প্রথম ব্যবহারের পরীক্ষায় ঘষে পরিষ্কার করা পাত্র থেকে সিসা নির্গমন, না ঘষা পাত্রের তুলনায় প্রায় পাঁচ গুণ বেশি ছিল। দ্বিতীয় পরীক্ষাতেও এই পার্থক্য প্রায় তিন গুণ পাওয়া যায়।

টক খাবারে আরও সতর্কতা

গবেষণায় অম্লীয় পরিবেশে সিসা বের হওয়ার প্রবণতা বেশি দেখা গেছে। অর্থাৎ টক বা বেশি অ্যাসিডযুক্ত খাবার অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে রান্না করলে ঝুঁকি বাড়তে পারে।

গবেষকেরা মনে করছেন, বাংলাদেশের রান্নায় ব্যবহৃত বিভিন্ন টকজাতীয় খাবারের ক্ষেত্রেও বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। তবে নতুন গবেষণায় মূলত ভাত ও খিচুড়িতে সিসা স্থানান্তরের বিষয়টি পরীক্ষা করা হয়েছে।

শিশুদের জন্য কেন বেশি উদ্বেগ?

সিসা একটি শক্তিশালী নিউরোটক্সিন। দীর্ঘদিন অল্প মাত্রায় সিসার সংস্পর্শেও শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশ, শেখার ক্ষমতা, মনোযোগ ও আচরণে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। এ ছাড়া সিসার সঙ্গে রক্তস্বল্পতা, কিডনির ক্ষতি ও উচ্চ রক্তচাপের মতো স্বাস্থ্যঝুঁকির সম্পর্ক রয়েছে।

গবেষণায় শিশুদের সম্ভাব্য সিসা গ্রহণের মাত্রাও হিসাব করা হয়েছে। নতুন পাত্রে তৃতীয়বার রান্না করা ভাতে পাওয়া সিসার মাত্রার ভিত্তিতে গবেষকদের মডেলিংয়ে দেখা যায়, শুধু ওই ভাত থেকেই একটি শিশু প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সিসার সংস্পর্শে আসতে পারে।

শুধু রান্নার পাত্র নয়, সিসার আরও উৎস আছে

বাংলাদেশে মানুষের সিসার সংস্পর্শে আসার সম্ভাব্য উৎস হিসেবে এর আগেও বিভিন্ন গবেষণায় খাদ্য ও দৈনন্দিন ব্যবহারের সামগ্রীর কথা উঠে এসেছে। এর মধ্যে সিসাযুক্ত রঞ্জক ব্যবহারের কারণে দূষিত হলুদও একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস হিসেবে চিহ্নিত হয়েছিল।

তবে নতুন গবেষণাটির বিশেষ গুরুত্ব হলো—এখানে শুধু অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সিসা আছে কি না তা দেখা হয়নি; সেই পাত্রে রান্না করা খাবারে সিসা চলে যাচ্ছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা হয়েছে।

রান্নার পাত্রের মান নিয়ন্ত্রণে নজরদারি জরুরি

গবেষকদের মতে, রান্নার পাত্র তৈরিতে ব্যবহৃত ধাতুর উৎস ও মান নিয়ন্ত্রণ করা জরুরি। একই সঙ্গে বাজারে বিক্রি হওয়া অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সিসার উপস্থিতি পরীক্ষা এবং খাদ্যের সংস্পর্শে আসা সামগ্রীর জন্য কার্যকর মানদণ্ড থাকা প্রয়োজন।

বাংলাদেশে অ্যালুমিনিয়ামের রান্নার সামগ্রীর মান নিয়ন্ত্রণের বিষয়েও সাম্প্রতিক সময়ে নজরদারি বাড়ানোর উদ্যোগের কথা জানিয়েছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই)।

কীভাবে ঝুঁকি কিছুটা কমানো যায়?

গবেষণার ফল অনুযায়ী, নতুন অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে কয়েকবার রান্না করার পর সিসা নির্গমনের মাত্রা কমতে পারে। একই সঙ্গে পাত্র পরিষ্কারের সময় শক্ত তারের জালি দিয়ে অতিরিক্ত ঘষাঘষি না করাই ভালো।

রান্নার সময় ধাতব খুন্তি দিয়ে অতিরিক্ত ঘষাঘষিও এড়িয়ে চলা যেতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থা সিসাযুক্ত পাত্রকে সম্পূর্ণ নিরাপদ বলে নিশ্চিত করে না। দীর্ঘমেয়াদে পাত্র তৈরির কাঁচামাল, উৎপাদনপ্রক্রিয়া এবং বাজারজাত পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

গবেষণার মূল বার্তা

অ্যালুমিনিয়ামের সব রান্নার পাত্রে সিসা রয়েছে—এমন সিদ্ধান্ত এই গবেষণা দেয়নি। বরং বাংলাদেশে ব্যবহৃত ও তৈরি কিছু অ্যালুমিনিয়ামের পাত্রে সিসা থাকতে পারে এবং রান্নার সময় তা খাবারে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে—এটাই গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা।

বিশেষ করে নতুন পাত্রে প্রথম কয়েকবার রান্না, শক্তভাবে ঘষে পরিষ্কার করা এবং অম্লীয় খাবার রান্নার ক্ষেত্রে ঝুঁকির বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে রান্নার পাত্রের মান নিয়ন্ত্রণে কার্যকর নজরদারি জরুরি।

লেখাটি রেটিং দিন

লেখাটি আপনার কেমন লেগেছে?

মাহফুজ রহমান

মাহফুজ রহমান

ডেস্ক সম্পাদক

৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করছেন। তিনি মূলত শিক্ষাবিষয়ক এক্সপার্ট। তিনি লেখাপড়া, চাকরি বা ক্যারিয়ার, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত লেখালেখি ও সংবাদ সম্পাদনা করেন।

Featured Products

View All

আমাদের সম্পাদকীয় নীতি

We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.

Fact-Checked

Every claim is verified by our editorial team before publication.

Expert Review

Content reviewed by subject matter experts for accuracy.

Regularly Updated

We update content to reflect the latest developments.

Unbiased Coverage

We present balanced perspectives and multiple viewpoints.