আগস্ট ২১, শায়ানসি (চীন) থেকে সাকিব সিকান্দার: চীনের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় প্রদেশ শায়ানসি সফরের তৃতীয় দিনে রেড আর্মির ঐতিহাসিক লং মার্চের শেষ গন্তব্য উ ছি টাউন বিপ্লবী স্থান পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় সাংবাদিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। চীনের বিপ্লবের ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে থাকা এই স্মৃতিবিজড়িত স্থান ঘুরে দেখেন তারা।
১৯ আগস্ট চীনের প্রাচীন রাজধানী সি’আন থেকে প্রায় চার ঘণ্টার যাত্রা শেষে দলটি ইয়ান’আনে পৌঁছায়। পরে বিকেলে তারা রেড আর্মির বিপ্লবী স্মৃতিবিজড়িত উ ছি জেলায় যান।
১৯৩৫ সালের ১৯ অক্টোবর চীনের কেন্দ্রীয় রেড আর্মি প্রায় আড়াই হাজার মাইল দীর্ঘ লং মার্চ শেষ করে উ ছিতে পৌঁছায়। এর মধ্য দিয়ে ঐতিহাসিক লং মার্চ সফলভাবে সমাপ্ত হয়। সেই সময়ের বিপ্লবী ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মারক হিসেবে এখানে সংরক্ষিত রয়েছে মাও সেতুং, চাং ওয়েনথিয়ানসহ প্রবীণ নেতাদের গুহাবাসস্থল ও রাজনৈতিক কমিটির সভাস্থল।
এখানেই শত্রু বাহিনীকে পরাজিত করে ‘লেজ কাটা যুদ্ধ’ সংঘটিত হয়েছিল। উত্তর শায়ানসি অঞ্চলে রেড আর্মির প্রতিষ্ঠা এবং চীনা বিপ্লবের নতুন অধ্যায়ের সূচনার অন্যতম মাইলফলক হিসেবে স্থানটি বিবেচিত হয়। বর্তমানে এটি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নস্থল ও ‘লাল’ ইতিহাস শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে সংরক্ষিত।
বিপ্লবীদের ত্যাগে শিহরিত বাংলাদেশি সাংবাদিকরা
চীনের বিপ্লবের সেই কঠিন সময়ের মহান নেতাদের সংগ্রাম ও ত্যাগের নানা নিদর্শন দেখে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বাংলাদেশি সাংবাদিকরা।
বাংলাদেশের জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কবি হাসান হাফিজ বলেন, “স্বৈরাচারের পতনের জন্য রেড আর্মি দীর্ঘ অভিযাত্রা যেখানে শেষে করেছিলেন, সেখানে আমরা এসেছি। মাও সেতুং যে কক্ষে ছিলেন এবং অন্যান্য অংশ আমরা ঘুরে দেখলাম।”
তিনি বলেন, বিপ্লবীদের পোশাক ও ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে তাদের অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপনের বিষয়টি উপলব্ধি করা যায়। একজন কৃষক তাদের থাকার সুযোগ দিয়েছিলেন। প্রায় ১০০ বছর আগে মুক্তির সংগ্রামে তারা যে ত্যাগ স্বীকার করেছেন, দেশপ্রেম ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় যে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন—তা সত্যিই শিহরণ জাগায়।
হাসান হাফিজ বলেন, “এটা কেবল চীনের নয়, গোটা বিশ্বের মানবজাতির জন্য প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে।”
বাংলাদেশের আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসের সঙ্গে লং মার্চের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, মাওলানা ভাসানী ফারাক্কা লংমার্চ করেছিলেন। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শেষ ধাপেও ছিল ‘মার্চ টু ঢাকা’। প্রয়াত দেশনেত্রী খালেদা জিয়াও লংমার্চ করেছিলেন।
তিনি বলেন, “মার্চ শব্দটা মুক্তির আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। চীনের এই অভ্যুত্থানের জয়গাথা বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা।”
উ ছির এই ঐতিহাসিক স্থানকে ইউনেস্কোর বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা দেওয়ারও দাবি জানান জাতীয় প্রেসক্লাব সভাপতি।
বাংলাদেশের ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বাবুল তালুকদার বলেন, “আমি তো ক্যামেরার চোখে বিশ্ব দেখি। চীনের এই সফরকে আমি ব্যক্তি জীবনের অনুপ্রেরণা বলে মনে করছি।”
তিনি বলেন, অতিসাধারণ কিছু মানুষ কীভাবে অসম লড়াইয়ের সাহস করেছিলেন এবং বিশাল শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে জয়ী হয়েছিলেন, তা সত্যিই অকল্পনীয়।
বাবুল তালুকদারের ভাষায়, “এখান থেকে আমরা এ শিক্ষা নিতে পারি যে মনোবল কখনো হারানো যাবে না। ফ্যাসিবাদ যতই শক্তিশালী হোক, সংগ্রামটা দীর্ঘমেয়াদি হলেও চালিয়ে যেতে হবে। তবেই আমরা সফলতা অর্জন করতে পারবো। এটাই আমাদের বড় শিক্ষা।”
প্রায় দুই ঘণ্টা ঐতিহাসিক উ ছি এলাকায় সময় কাটান বাংলাদেশি সাংবাদিকদের দলটি।
১০ সদস্যের বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধি দল
চীন সরকারের আমন্ত্রণে ১০ দিনের সফরে শায়ানসিতে যাওয়া বাংলাদেশি সাংবাদিক প্রতিনিধি দলে রয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কবি হাসান হাফিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মহাসচিব এবং দৈনিক ইনকিলাবের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট মো. মাইনুল হাসান, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট ও চ্যানেল টোয়েন্টি ফোরের স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট রেজওয়ান উজ জামান এবং বাংলাদেশের ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও দৈনিক দিনকালের চিফ ফটো জার্নালিস্ট বাবুল তালুকদারসহ ১০ জন।
সফরে তাদের সঙ্গে রয়েছেন চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)- এর বাংলা বিভাগের পরিচালক ইয়ু কুয়াংইউয়ে আনন্দী, সাংবাদিক সিয়েনান আকাশ ও রুবি এবং ছি পেং।
এ ছাড়া সফরকারী দলের সঙ্গে রয়েছেন শাংহাই আন্তর্জাতিক বিষয়ক গবেষণা একাডেমির মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক চিন লিয়াং সিযাং, শাংহাই আন্তর্জাতিক বিষয়ক গবেষণা একাডেমির দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক চৌ শি সিন এবং সমসাময়িক চীন ও বিশ্ব গবেষণা একাডেমির বৈদেশিক ভাষা উদ্ভাবন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক চাং চিউ আন।
বাংলাদেশি সাংবাদিকদের এই সফরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)। ‘চীন-বিদেশি প্রতিনিধি যৌথ সাক্ষাৎ আয়োজন’-এর অংশ হিসেবে ‘রোমিং চায়না, শায়ানসি ট্যুর’-এর আয়োজন করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে চীনের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের প্রেক্ষাপটে দুই দেশের মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও ভাব বিনিময় আরও জোরদার করার লক্ষ্যে নিয়মিত এ ধরনের সফরের আয়োজন করে চীন সরকার।
সম্পাদনা - আফরিন মিম
তথ্য ও ছবি- সিএমজি বাংলা