অর্ধ শতাব্দীর করমর্দন
ইয়াং ওয়েইমিং স্বর্ণা
অক্টোবর মাস চীনাদের কাছে উৎসবমুখর সময়। জাতীয় দিবসের ছুটিতে রাস্তায় রাস্তায় লাল পতাকা টাঙানো হয়। পরিবারগুলো ঘুরতে বের হয়। কিন্তু অক্টোবরের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য আছে। ৪ অক্টোবর—চীন ও বাংলাদেশের কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার দিন। এ বছর যে সম্পর্কের পূর্ণ হচ্ছে ৫১ বছর।
ইতিহাসের দীর্ঘ নদীতে ৫১ বছর হয়তো খুব বেশি নয়। কিন্তু একজন মানুষের জীবনে জন্ম থেকে পঞ্চাশে পৌঁছানো যেমন একটি দীর্ঘ পথচলা, তেমনি দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও এই সময়ের প্রতিটি বছর রেখে গেছে নিজস্ব কিছু গল্প। এই বিশেষ দিনে আপনাদের সঙ্গে আমার চোখে দেখা দুই দেশের সম্পর্কের কিছু বাস্তব ঘটনা ভাগ করে নিতে চাই।
প্রথমেই এমন একটি ঘটনা বলি, যা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।
গত সেপ্টেম্বরে চীনা নৌবাহিনীর থাংশান ও তাছিং জাহাজ চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙর করেছিল। বাংলাদেশের নৌবাহিনীর সদস্য এবং বাংলাদেশে অবস্থানরত চীনা নাগরিকসহ শতাধিক মানুষ ঘাটে তাদের স্বাগত জানাতে এসেছিলেন। সেই কয়েক দিনে দুই দেশের মানুষ একসঙ্গে খেলাধুলা করেছেন, জাহাজ পরিদর্শন করেছেন, ডেকের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছেন।
কোনো বড় ঘোষণা ছিল না, ছিল না জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন। কিন্তু ‘বন্ধু এসেছে’—এই সহজ অনুভূতিটাই পরিবেশকে উষ্ণ করে তুলেছিল।
আমি মনে করি, দেশের সঙ্গে দেশের সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত মানুষের মধ্যে বাস্তব যোগাযোগ ও আদান-প্রদানের ওপরই দাঁড়িয়ে থাকে। নৌবাহিনীর সফরের মতো চিকিৎসকদের বাংলাদেশে আসাও তেমন একটি উদাহরণ।
গত বছরের শেষে বাংলাদেশ জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটে চীন-বাংলাদেশ কার্ডিওভাসকুলার যৌথ ক্লিনিক উদ্বোধন করা হয়। ইয়ুননান প্রদেশের ফুওয়াই হাসপাতালের চিকিৎসক দল সরাসরি ঢাকায় অবস্থান করে রোগী দেখা শুরু করেন।
গত জুনে খুনমিং মেডিকেল ইউনিভার্সিটির দ্বিতীয় হাসপাতালের বিশেষজ্ঞরাও বাংলাদেশে গিয়েছিলেন। সেখানে অস্ত্রোপচার, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ ও সরাসরি প্রদর্শনী হয়েছে। কয়েক হাজার বাংলাদেশি চিকিৎসক অনলাইনে এসব কার্যক্রম দেখেছেন। পরে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যমন্ত্রী হাইনান সফরে গিয়ে বলেন, চিকিৎসক প্রশিক্ষণ ও প্রযুক্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে দুই দেশের সহযোগিতা আরও গভীর করতে চান।
এই ঘটনাগুলো হয়তো আন্তর্জাতিক সংবাদে বড় খবর নয়। কিন্তু একটি পরিবারের কাছে একজন চীনা চিকিৎসকের করা একটি সফল অস্ত্রোপচার হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় ঘটনাগুলোর একটি।
এবার সেতুর কথা বলি। বাংলাদেশের বন্ধুরা ‘চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু’ নামটি ভালোভাবেই চেনেন। এক নম্বর থেকে ছয় নম্বর—এই সেতুগুলো গত কয়েক দশকে লাখ লাখ মানুষের প্রতিদিনের চলাচলের পথ বদলে দিয়েছে।
ছয় নম্বর সেতুর গল্পটা এখনও শেষ হয়নি। ২০০৮ সালে চালু হওয়া ধলেশ্বরী নদীর ওপর নির্মিত সড়ক সেতুটি প্রায় দুই দশক ব্যবহারের পর গতবছর সংস্কারের কাজ শুরু হয়েছে। চায়না রেলওয়ে ১৮ ব্যুরোর একটি দল সেখানে কাজ করছে। মূল সেতুর ভূমিকম্প-প্রতিরোধী সক্ষমতা বাড়ানো, বিয়ারিং প্রতিস্থাপন এবং পরিদর্শন প্ল্যাটফর্ম স্থাপনের কাজ চলছে।
অর্থাৎ, ভেঙে নতুন করে নির্মাণ নয়; পুরনো বন্ধুটিকে ভালোভাবে রক্ষণাবেক্ষণ করে আরও দীর্ঘ সময় ব্যবহারের উপযোগী করে তোলা হচ্ছে।
নতুন সেতুও আসছে। গত জুনে চীন ও বাংলাদেশ নবম চীন-বাংলাদেশ মৈত্রী সেতু নির্মাণের বাস্তবায়ন চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। বরিশালের লোহালিয়া নদীর ওপর নির্মিত হবে এই সেতু। মূল সেতু ও সংযোগ সড়ক মিলিয়ে এর দৈর্ঘ্য হবে দুই কিলোমিটারের বেশি।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমও বিষয়টি সহজভাবে তুলে ধরেছে—সেতুটি নির্মাণ শেষ হলে আশপাশের কৃষক, জেলে ও ছোট ব্যবসায়ীদের আর ফেরিতে করে পণ্য পরিবহন করতে হবে না।
সেতুর গুরুত্ব চীনারাও ভালোভাবে বোঝে। কারণ নিজেদের দেশেও চীন একের পর এক সেতু নির্মাণ করে দুর্গম পথকে সহজ যোগাযোগের পথে পরিণত করেছে।
আরেকটি বিষয় আছে, যা হয়তো সেতুর চেয়েও বাংলাদেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গত জুলাইয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারায় চায়না ইকোনমিক অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিয়াল পার্কের আনুষ্ঠানিক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। প্রায় ৮০০ একর জমির ওপর গড়ে উঠতে যাওয়া এই শিল্পপার্কে প্রত্যাশিত বিনিয়োগের পরিমাণ ১৩০ কোটি ডলার এবং এক লাখেরও বেশি কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী একটি কথা বলেছিলেন, যা আমাকে গভীরভাবে স্পর্শ করেছে—বিনিয়োগই এমন একটি শক্তি, যা উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে পারে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে এবং ২০৩৪ সালের ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভিত্তি তৈরি করতে পারে।
কথাটি সরল, আবার বাস্তবও। বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পথে। পরবর্তী ধাপে প্রয়োজন শিল্প, কারখানা এবং তরুণদের জন্য এমন কর্মসংস্থান, যাতে তাদের জীবিকার জন্য বাধ্য হয়ে বিদেশে পাড়ি দিতে না হয়। চট্টগ্রামে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগ শেষ পর্যন্ত সেই সম্ভাবনাকেই শক্তিশালী করতে পারে।
যদি এক শব্দে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ককে বর্ণনা করতে হয়, আমি ‘নির্ভরযোগ্য’ শব্দটি বেছে নেব। আড়ম্বর নয়, হইচই নয়—কিন্তু প্রতি বছর নতুন কিছু জন্ম নেয়। এ বছর নৌবাহিনীর জাহাজ এসেছে, আগামী বছর হয়তো সেতু সংস্কারের কাজ শেষ হবে, পরের বছর শিল্প পার্কে প্রথম কারখানা চালু হতে পারে।
পঞ্চাশ বছর পর ফিরে তাকালে দেখা যাবে—আগের ঘটনাগুলোই মিলে তৈরি করেছে উন্নয়ন ও বন্ধুত্বের একটি বাস্তব পথ।
আমি মাঝে মাঝে ভাবি, একজন সাধারণ বাংলাদেশি তরুণ হয়তো চীন-বাংলাদেশ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠার সঠিক তারিখটি জানবে না। কিন্তু সে হয়তো চীনের সহায়তায় নির্মিত কোনো সেতু দিয়ে চলাচল করবে, চীনে তৈরি মোবাইল ফোন ব্যবহার করবে, কিংবা চীনা বিনিয়োগে গড়ে ওঠা কোনো কারখানায় কাজ করবে।
উল্টোটাও সত্যি। একজন সাধারণ চীনা মানুষ হয়তো বাংলাদেশে তৈরি একটি টি-শার্ট পরেছেন, বাংলাদেশ থেকে আসা পাকা আম কিংবা সামুদ্রিক মাছ খেয়েছেন। এটাই দুই দেশের সম্পর্কের সবচেয়ে সরল রূপ। তাই এই অক্টোবরে আমার শুধু একটি প্রত্যাশা—পরবর্তী পঞ্চাশ বছরেও আমরা যেন এভাবেই নির্ভরযোগ্যভাবে এগিয়ে যেতে পারি।
সেতু নির্মাণ চলতে থাকুক। পথ চলতে থাকুক। মানুষ আসা-যাওয়া করুক। আপনি চীনে এলে, আমি আপনাকে জাতীয় দিবসের লাল পতাকা দেখাব। আর আমি বাংলাদেশে গেলে, আপনি আমাকে পদ্মা নদীর সূর্যাস্ত দেখাবেন। বন্ধু, শুভ অক্টোবর। শুভ কূটনৈতিক সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা দিবস।
লেখক: সাংবাদিক, সিএমজি বাংলা