Sunday, August 30, 2026
Live

বিশকেক শীর্ষ সম্মেলনে সুদূরপ্রসারী প্রতিধ্বনি: শাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় বাংলাদেশের যাত্রা

সিএমজি
সিএমজি বাংলা বিভাগ
Published: Updated:
বিশকেক শীর্ষ সম্মেলনে সুদূরপ্রসারী প্রতিধ্বনি: শাংহাই সহযোগিতা সংস্থায় বাংলাদেশের যাত্রা

২০২৬ সালের ৩১ আগস্ট কিরগিজস্তানের রাজধানী বিশকেকে শাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (এসসিও) শীর্ষ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। সংযোগ প্রকল্প, বাণিজ্য সুবিধাকরণ, জ্বালানি সহযোগিতা এবং এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের আলোচনা—এসবই এই সম্মেলনের মূল এজেন্ডা। বাংলাদেশিদের জন্য এই সম্মেলন গুরুত্বপূর্ণ শুধু অর্থনীতি বা অবকাঠামোগত কারণে নয়, বরং এর আঞ্চলিক সহযোগিতার দর্শন প্রতিফলিত হয় বাংলাদেশের নিজস্ব উন্নয়ন আকাঙ্ক্ষার মাঝেও।

গত জুলাইতে বাংলাদেশ এসসিওতে সংলাপের অংশীদার হতে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন করেছে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে একটি উন্নয়নশীল রাষ্ট্রের নিজের পথ খুঁজে নেওয়ার সুস্পষ্ট চিন্তাভাবনা।

ঢাকা থেকে বিশকেক: একটি উন্নয়ন দর্শন

পঁচিশ বছরে এসসিওর সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো, উন্নয়নশীল দেশগুলো কীভাবে সমান অংশীদারত্বের মাধ্যমে উন্নয়ন করতে পারে, সেটার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন। নিরাপত্তা সহযোগিতা দিয়ে শুরু করে এখন বাণিজ্য, জ্বালানি, অর্থনীতি ও সংস্কৃতিসহ বহুমাত্রিক এই কাঠামো ‘শাংহাই স্পিরিট’-এর ওপর ভিত্তি করে গড়ে উঠেছে। এর মূল ভিত্তি হলো পারস্পরিক বিশ্বাস, সুবিধা, সমতা, বৈচিত্র্যের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মিলিত উন্নয়ন।

বাংলাদেশ আজ ‘স্বল্পোন্নত’ থেকে ‘উন্নয়নশীল’ দেশে উত্তরণের দ্বারপ্রান্তে। ১৭ কোটি মানুষের এই দেশ দারিদ্র্য বিমোচন, শিক্ষা, নারীর ক্ষমতায়ন ও জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে অনন্য অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে। পাশাপাশি অবকাঠামো আধুনিকীকরণ, রপ্তানি বাজার বহুমুখীকরণ ও জ্বালানি রূপান্তরের মতো বাস্তব চ্যালেঞ্জও রয়েছে। এই সময়ে এসসিওর কাছাকাছি আসার পেছনে একমাত্র কারণ হলো উন্নয়নের যুক্তি। শিল্পায়ন ও আঞ্চলিক সংযুক্তির দিকে এগিয়ে চলা দেশের জন্য এমন একটি প্ল্যাটফর্ম প্রয়োজন, যা বিভিন্ন উন্নয়ন পথকে সম্মান করে এবং নানা ধরনের সহযোগিতারও সুযোগ দেয়।

এসসিওর দর্শন মানে সদস্য রাষ্ট্রগুলোকে একক মানদণ্ডে ‘পরিবর্তন’ করা নয়; বরং তাদের নিজ নিজ প্রেক্ষাপটকে সম্মান জানিয়ে সংযোগ ও পারস্পরিক লাভের কাঠামো গড়ে তোলা। এটি বাংলাদেশের স্বাধীন ও বহুমুখী কূটনৈতিক ঐতিহ্য এবং দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতার প্রতি অঙ্গীকারের সঙ্গেও সঙ্গতিপূর্ণ।

উন্নয়ন ব্যাংক ও সংযোগ: শিল্পায়নের বাস্তব চাহিদার জবাব

এই সম্মেলনে সংযোগ প্রকল্প ও এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক গঠনের আলোচনা বাংলাদেশের জন্য ‘ঋণ পাওয়া’ বা ‘প্রকল্প নেওয়ার’ চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। এটি একটি শিল্পায়নশীল রাষ্ট্রের পদ্ধতিগত চাহিদার প্রতিফলন।

বাংলাদেশের জন্য সংযোগ মানে হলো—ঢাকার তৈরি পোশাক আরও নির্ভরযোগ্য স্থল ও সমুদ্র পরিবহনপথে মধ্য এশিয়ার উদীয়মান বাজারে পৌঁছানো; সেইসঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের কার্যক্ষমতা পরিকল্পিতভাবে বাড়ানো এবং নদীবহুল দেশটির অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আরও দক্ষ লজিস্টিকস ব্যবস্থা গড়ে তোলা।

এসসিওর চীন-কিরগিজস্তান-উজবেকিস্তান রেলপথ ও বৃহত্তর পরিবহন নেটওয়ার্ক নির্মাণের উদ্যোগ একটি উন্নয়ন দর্শনকে সামনে রাখে—যেখানে অবকাঠামোই প্রথম শর্ত। বাংলাদেশের কাছে এই চিন্তা নিজের কয়েক দশকের উন্নয়ন অভিজ্ঞতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

অন্যদিকে, এসসিও উন্নয়ন ব্যাংক সম্পর্কিত আলোচনা শিল্পায়নের আরেক গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নকে সামনে আনে: অর্থায়নের স্বায়ত্তশাসন। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নশীল দেশগুলো অবকাঠামো অর্থায়নে উচ্চ সুদ, দীর্ঘ প্রক্রিয়া এবং নানা শর্তের মুখোমুখি। এসসিওর অর্থবিষয়ক উদ্যোগ—যেমন ‘জাতীয় মুদ্রায় বাণিজ্য নিষ্পত্তির রোডম্যাপ’—এমন একটি অর্থায়ন কাঠামো গড়ার প্রচেষ্টা, যা সদস্য রাষ্ট্রগুলোরও বাস্তব প্রত্যাশা।

বাংলাদেশের এই প্রচেষ্টার প্রতি আগ্রহটাকে বলা যায় অর্থায়নের উৎস বহুমুখীকরণ ও আর্থিক পরিবেশ উন্নত করার স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন।

শাংহাই স্পিরিট ও বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা

শাংহাই স্পিরিট ও বাংলাদেশের উন্নয়ন অনুশীলনের মধ্যে কয়েকটি উল্লেখযোগ্য মিল রয়েছে।

প্রথমত, ‘সম্মিলিত উন্নয়ন’-এর ওপর জোর—এসসিওর সহযোগিতা সবসময় উন্নত ও উন্নয়নশীল সদস্যদের মধ্যে সুবিধা ভাগাভাগির ওপর গুরুত্ব দিয়ে আসছে। বাংলাদেশও নিজের অভিজ্ঞতা থেকে জানে ‘সম্মিলিত উন্নয়ন’ কী। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বেরিয়ে আসা মানেই আরও বেশি অভিজ্ঞতা নিয়ে বৃহত্তর সহযোগিতায় অংশ নেওয়া।

দ্বিতীয়ত, বৈচিত্র্য ও বিভিন্ন উন্নয়ন পথের প্রতি শ্রদ্ধা—এসসিওতে বিভিন্ন সংস্কৃতি, রাজনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থনীতির দেশ রয়েছে। এই বৈচিত্র্যই এর প্রাণশক্তি। বাংলাদেশও দক্ষিণ এশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কৃতির ধারক। নিজের ভাষা আন্দোলনের গৌরব ও সমৃদ্ধ সামাজিক ঐতিহ্য নিয়ে এই বহুমাত্রিক প্লাটফর্মে স্বাচ্ছন্দ্যে অবস্থান করার সক্ষমতা বাংলাদেশের রয়েছে।

তৃতীয়ত, যুব ও ডিজিটাল বিষয়ে অগ্রগামী মনোভাব। এই সম্মেলনে যুব ডিজিটাল ফোরামের মতো নতুন উদ্যোগ চালু হচ্ছে, যা বৈশ্বিক দক্ষিণের প্রজন্মগত পরিবর্তন ও ডিজিটাল বিভাজন মোকাবিলার আগ্রহকে প্রতিফলিত করে।

বাংলাদেশে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম তরুণ জনসংখ্যা রয়েছে। ডিজিটাল অর্থনীতি ও যুব উদ্যোক্তা এখানে জাতীয় অগ্রাধিকার। এসসিওর এই ক্ষেত্রের নতুন উদ্যোগটি তরুণ প্রজন্মের অংশ নেওয়ার সুযোগ তৈরি করছে।

সংলাপ অংশীদারের গঠনমূলক ভূমিকা

বাংলাদেশ সংলাপ অংশীদার হওয়ার আবেদন করে একটি গঠনমূলক বার্তা দিয়েছে—অপেক্ষায় না থেকে, এসসিওর মৌলিক দর্শনের সঙ্গে একাত্ম হয়ে শেখা, পর্যবেক্ষণ ও ধাপে ধাপে অংশগ্রহণের মাধ্যমে এই আঞ্চলিক কাঠামোতে যুক্ত হওয়া জরুরি। এই দৃষ্টিভঙ্গি বাংলাদেশের বাস্তববাদী ও ফলমুখী কূটনীতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ।

সংলাপ অংশীদার হিসেবে বাণিজ্য, সংস্কৃতি ও যুব উন্নয়নের মতো ক্ষেত্রে সহযোগিতা শুরু করতে পারে বাংলাদেশ। সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে আরও উচ্চতর অংশীদারত্বের জন্য বিশ্বাস ও অভিজ্ঞতাও সঞ্চয় করতে পারে।

এসসিওর ইতিহাস বলে, এই প্ল্যাটফর্ম সবসময় নতুন অংশগ্রহণকারীদের জন্য উন্মুক্ত এবং প্রতিটি অংশীদারের স্বাতন্ত্র্যকে মূল্য দেয়। দক্ষিণ এশিয়ার দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতি হিসেবে বাংলাদেশের উন্নয়ন অভিজ্ঞতা ও বাজার সম্ভাবনা এই সংলাপে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।

বিশকেক সম্মেলনের আলোচনা আগামী দশকের ইউরেশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতার কাঠামোকে প্রভাবিত করবে। বাংলাদেশের জন্য এই সম্মেলনে মনোযোগ দেওয়া মানে কোনো স্বল্পমেয়াদি লাভের হিসাব নয়, বরং একটি মৌলিক বাস্তবতা উপলব্ধি করা—বিশ্বায়নের এই পরিবর্তনশীল সময়ে কোনো দেশের উন্নয়নের স্থান অনেকাংশে নির্ভর করে আঞ্চলিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সক্ষমতা ও উদ্যোগের ওপর।

বাংলাদেশ এখন এসসিওর কাঠামোর কাছে এসেছে—বাইরের চাপের কারণে নয়, এসেছে শাংহাই চেতনার অভ্যন্তরীণ যুক্তির মধ্যে যে সুর মিলছে, তার কারণেই। এই সুর হয়তো এখনই কোনো প্রকল্প বা অর্থে রূপ নেবে না, কিন্তু এটি একটি অবস্থান তৈরি করবে—একটি দেশের জন্য, যে নিজের আঞ্চলিক অবস্থান খুঁজে পেতে চায়।

সূত্র: সিএমজি

Rate This Article

How would you rate this article?

সিএমজি

সিএমজি

বাংলা বিভাগ

চায়না মিডিয়া গ্রুপ (CMG) চীনের রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচারকারী প্রধান কোম্পানি।

Featured Products

View All

Our Editorial Standards

We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.

Fact-Checked

Every claim is verified by our editorial team before publication.

Expert Review

Content reviewed by subject matter experts for accuracy.

Regularly Updated

We update content to reflect the latest developments.

Unbiased Coverage

We present balanced perspectives and multiple viewpoints.