শেনজেনের ফুতিয়ান জেলায় আমার ছোট্ট ডরমিটরির জানালা দিয়ে বাইরে তাকালে যে ছবিটা চোখে পড়ে, সেটা যেন কল্পনার কোনো সিনেমার দৃশ্য। আকাশছোঁয়া কাচের দালান, নিঃশব্দে ছুটে চলা বৈদ্যুতিক গাড়ি, রাস্তার ধারে ঝুলন্ত বাগান আর রাত নামলেই যে আলোকসজ্জা শুরু হয়, তাতে মনে হয় এ যেন অবাস্তব কোনো পৃথিবী। ২০২৩ সালে যখন প্রথম ঢাকা ছেড়ে চীন আসি, তখন আমার মনের মধ্যে ছিল কৌতূহল আর দ্বিধার মিশ্রণ। দু'বছর পর, ২০২৬ সালের জুনে বসে যখন এই লেখা লিখছি, তখন সেই দ্বিধা কেটে গেছে, কিন্তু কৌতূহল আগের চেয়েও তীব্রতা পেয়েছে। কারণ চীন যে শুধু উন্নতি করেনি; চীন উন্নয়নের সংজ্ঞাটাই বদলে দিয়েছে। আর এই বদলের গল্প শুধু পরিসংখ্যানের নয় এ গল্প মানুষের,এ গল্প একটা সভ্যতার আত্মবিশ্বাস পুনরাবিষ্কারের।
যে ইতিহাস ভোলার নয়
সত্তরের দশকের শেষে চীন ছিল এক ভিন্ন দেশ। ১৯৭৮ সালে দেং শিয়াওপিং যখন "সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ" নীতি ঘোষণা করেন, তখন চীনের মাথাপিছু জিডিপি ছিল মাত্র ১৫৬ ডলার। চার কোটি মানুষ অনাহারের দ্বারপ্রান্তে। শিল্প বলতে বলতে কিছু ভারী কারখানা, প্রযুক্তি বলতে সাইকেল। অথচ আজ? ২০২৫ সালে চীনের অর্থনীতির আকার দাঁড়িয়েছে ১৪০ লাখ কোটি ইউয়ান, যা ডলারে প্রায় ১৯.৬ লাখ কোটি, বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ। মাথাপিছু জিডিপি ১৩,৯৫৩ ডলার ছাড়িয়েছে। আর ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকেই অর্থনীতি বেড়েছে ১.৩ শতাংশ, যা পূর্বাভাসের চেয়ে বেশি।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, গত চার দশকে চীন গড়ে ৯ শতাংশের বেশি হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করেছে এবং প্রায় ৮০ কোটি মানুষকে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্তি দিয়েছে। এই সংখ্যাগুলো শুনতে শুকনো লাগতে পারে, কিন্তু ভেবে দেখুন, ৮০ কোটি মানে পুরো ইউরোপ মহাদেশের জনসংখ্যার চেয়েও বেশি। এ এক নীরব বিপ্লব।
শাসনব্যবস্থা: পরিকল্পনার স্থাপত্য
চীনের রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে পশ্চিমা বিশ্বে নানা বিতর্ক আছে, কিন্তু আমি একজন শিক্ষার্থী হিসেবে এখানে থেকে যেটা অনুভব করেছি, সেটা হলো নীতিনির্ধারণে এক অসাধারণ ধারাবাহিকতা। চীনের কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে যে "পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা" ব্যবস্থা চালু আছে, তা তাদের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে সহযোগিতা করে। এখন চলছে ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২৬-২০৩০)। এই পরিকল্পনাতেই প্রথমবারের মতো দারিদ্র্য প্রতিরোধের জন্য "নিয়মিত প্রক্রিয়া" চালু করা হয়েছে, অর্থাৎ দারিদ্র্য দূর করাই শেষ নয়, যাতে কেউ আবার দারিদ্র্যে না ফেরে, সেটাও নিশ্চিত করতে চায় চীন। ঢাকায় যখন দেখি কোনো ফ্লাইওভারের কাজ শুরু হওয়ার পাঁচ বছর পরও শেষ হয় না, তখন এখানকার এই পরিকল্পনার শৃঙ্খলা দেখে ঈর্ষা হয় আর ভাবি, বাংলাদেশেও যদি এমন একটি ধারাবাহিক নীতি-কাঠামো থাকত!
২০২০ সালের মধ্যে চীন ৯ কোটি ৮৯ লাখ ৯০ হাজার গ্রামীণ দরিদ্র মানুষকে দারিদ্র্যমুক্ত করেছে। তারপর পাঁচ বছরের একটি "অন্তর্বর্তীকালীন" সময় ধরে সেই অর্জনকে সুসংহত করেছে। ২০২৫ সালে প্রাক্তন দরিদ্র কাউন্টিগুলোতে গ্রামীণ বাসিন্দাদের মাথাপিছু আয় পৌঁছেছে ১৮,৬২৭ ইউয়ানে আর এই সময়ে গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ৮.২ শতাংশ।
দারিদ্র্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধ
গত বছর ইউনানের একটি পাহাড়ি গ্রামে ঘুরতে গিয়েছিলাম। যে পথ দিয়ে হেঁটেছি, সেই রাস্তাগুলো পাকা ছিল, অথচ স্থানীয় এক বৃদ্ধা বললেন, "পাঁচ বছর আগেও এই রাস্তা ছিল কাদা-মাটি ভরা। বৃষ্টি হলে গ্রাম বিচ্ছিন্ন হয়ে যেত শহর থেকে।" আজ? ২০২৬ সাল নাগাদ চীনের দরিদ্র অঞ্চলগুলোতে ১১ লাখ কিলোমিটার গ্রামীণ সড়ক নির্মাণ বা সংস্কার করা হয়েছে, সব যোগ্য গ্রাম ও শহর পাকা সড়ক ও বাস পরিষেবার আওতায় এসেছে, আর ৯৫ শতাংশের বেশি গ্রামে পৌঁছেছে ৫জি নেটওয়ার্ক। এটা শুধু অবকাঠামো নয় এটা সুযোগের সমতা। বাংলাদেশের হাওর অঞ্চলের কোনো কিশোরী যদি ইন্টারনেট পেত, সে হয়তো বিশ্বের সেরা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোর্স করত। চীন সেই সুযোগটাই তৈরি করেছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ ম্যাক্সিমো তোরেরো কুলেন বলেছেন, চীন শুধু আয় নয়, গ্রামীণ অবকাঠামো, কৃষি উদ্ভাবন আর মানবসম্পদে বিনিয়োগ করে বহুমাত্রিক দারিদ্র্যের মোকাবিলা করেছে।
২০২৫ সালে দারিদ্র্যমুক্ত মানুষদের কর্মসংস্থান স্থিতিশীল ছিল ৩ কোটির বেশি যা তাদের পরিবারের মোট আয়ের দুই-তৃতীয়াংশেরও বেশি। ৫৩টি দেশ ও ৯টি আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ উদ্যোগে ২০২৬ সালের মে মাসে বেইজিংয়ে চালু হয়েছে "গ্লোবাল পার্টনারশিপ ফর পোভার্টি অ্যালিভিয়েশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট" । চীন এখন শুধু নিজে দারিদ্র্য জয় করছে না, বিশ্বকেও শেখাচ্ছে।
বুলেট ট্রেন আর ডিজিটাল মানিব্যাগ
একটা মজার ঘটনা বলি। চীনে আসার প্রথম সপ্তাহে বাজারে গিয়েছিলাম সবজি কিনতে। দোকানি যখন বললেন, "উইচ্যাট নাকি আলিপে?" আমি হতভম্ব। আমার পকেটে নগদ টাকা, অথচ তিনি নগদ নিতে রাজি নন। পরে বুঝলাম, এখানে রাস্তার ফেরিওয়ালাও কিউআর কোড স্ক্যান করে পেমেন্ট নেয়। বাংলাদেশে এখনো "ডিজিটাল বাংলাদেশ" স্লোগানে আটকে থাকলেও, চীন ডিজিটাল জীবনকে রক্তমাংসের বাস্তবতায় পরিণত করেছে।
আর হাই-স্পিড রেল? ২০২৬ সালের শুরুতে চীনের হাই-স্পিড রেল নেটওয়ার্ক ৫০,০০০ কিলোমিটার ছাড়িয়েছে, যা পৃথিবীর পরিধির চেয়েও লম্বা। সাংহাই থেকে বেইজিং প্রায় ঢাকা-দিনাজপুরের তিন গুণ দূরত্ব, পাড়ি দেওয়া যায় মাত্র সাড়ে চার ঘণ্টায়। ট্রেনের ভেতরে বসে যখন ঘণ্টায় ৩৫০ কিলোমিটার গতিতে ছুটছি, তখন জানালার বাইরের ধানক্ষেত আর শহরগুলো যেন স্মৃতির মতো মিলিয়ে যাচ্ছে। ৬০০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টার ম্যাগলেভ ট্রেনের পরীক্ষামূলক চলাচল ইতোমধ্যেই শুরু হয়েছে। প্রযুক্তি খাতে চীনের অগ্রগতি চোখ ধাঁধানো। ২০২৫ সালে গবেষণা ও উন্নয়ন খাতে ব্যয় হয়েছে ৩৯,২৬২ কোটি ইউয়ান, জিডিপির ২.৮০ শতাংশ। ২০২৬ সালে চীনের মূল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা শিল্পের আকার ১.২ লাখ কোটি ইউয়ান (প্রায় ১৭১ বিলিয়ন ডলার) ছাড়াবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বেল্ট অ্যান্ড রোড
চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের "বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ" (বিআরআই) নিয়ে পশ্চিমা সংবাদমাধ্যমে প্রায়ই "ঋণের ফাঁদ" গল্প শোনা যায়। কিন্তু বাস্তবতা আরও জটিল। ২০২৫ সালের শেষ নাগাদ বিআরআইয়ের ক্রমপুঞ্জিত বিনিয়োগ দাঁড়িয়েছে ১.৩৯ লাখ কোটি ডলারে, যা সৌদি আরবের পুরো অর্থনীতির সমান। শুধু ২০২৫ সালেই চুক্তি ও বিনিয়োগের মূল্য রেকর্ড ২১৩.৫ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। বিআরআই অংশীদারদের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য গত এক দশকে ২৪০ শতাংশ বেড়ে ৩.৪ লাখ কোটি ডলারে পৌঁছেছে। বাংলাদেশের জন্যও বিআরআই গুরুত্বপূর্ণ, পদ্মা সেতুতে চীনা কোম্পানির সম্পৃক্ততা, কর্ণফুলী টানেল, পাওয়ার প্ল্যান্ট, সবই চীন-বাংলাদেশ সহযোগিতার উদাহরণ। বন্ধুত্বের এই সেতুগুলো যেন আরেকটি সিল্ক রোড, শুধু ইট-পাথরের নয়, আস্থা আর ভবিষ্যতের।
তবে শুধু সাফল্যের গল্প বললে বাস্তবতার প্রতি অবিচার করা হবে। চীনের সামনেও চ্যালেঞ্জ কম নয়। রিয়েল এস্টেট খাত এখনো সংকটে, ২০২৫ সালে রিয়েল এস্টেট বিনিয়োগ কমেছে ১৭.২ শতাংশ। জনসংখ্যার বার্ধক্য, পরিবেশ দূষণের পুরনো ক্ষত, আর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্য উত্তেজনা, এই সবই চীনের নীতিনির্ধারকদের মাথাব্যথার কারণ। ২০২৬ সালের এপ্রিলে প্রকাশিত বিশ্বব্যাংকের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি কমে ৪.৪ শতাংশে নামতে পারে।
বাংলাদেশের জন্য শিক্ষা
এই সব দেখেশুনে যে উপলব্ধিটা সবচেয়ে বেশি হয়েছে, তা হলো উন্নয়ন কোনো জাদুকরী ঘটনা নয়। উন্নয়ন হলো ধারাবাহিক পরিকল্পনা, যোগ্য প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো, এবং সবচেয়ে বড় কথা, একটি জাতির সম্মিলিত ইচ্ছাশক্তির ফসল। চীন দেখিয়েছে যে রাষ্ট্র যদি সত্যিকারের জনগণের কল্যাণে কাজ করে, যদি দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, যদি প্রযুক্তি আর অবকাঠামোতে বিনিয়োগ করে , তাহলে এক প্রজন্মের মধ্যেই ইতিহাস বদলানো সম্ভব।
বাংলাদেশও তার নিজের পথে হাঁটছে। কিন্তু চীনের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি শিক্ষা আমাদের জন্য অমূল্য: দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা, প্রযুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবহার, অবকাঠামোকে শুধু প্রকল্প নয় বরং সামাজিক ন্যায়বিচারের হাতিয়ার হিসেবে দেখা, আর সর্বোপরি, দারিদ্র্য দূরীকরণকে শুধু অর্থনৈতিক নয়, মানবিক লক্ষ্য হিসেবে গ্রহণ করা।
শেষ কথা: জানালার বাইরে আর ভেতরে
শেনজেনের এই ডরমিটরির জানালায় দাঁড়িয়ে যখন রাতের আলোয় ঝলমল করা শহরটা দেখি, তখন একটা অদ্ভুত দ্বৈত অনুভূতি হয়। এ শহরটা চল্লিশ বছর আগে ছিল এক ঘুমন্ত মাছধরার গ্রাম, আজ এটি বিশ্বের প্রযুক্তি রাজধানী। এ যে সেই চীন, যেখানে একসময় দুর্ভিক্ষ লেগে থাকত, অথচ এখন গ্রামের কৃষকও ড্রোন দিয়ে জমিতে ফসল ফলায়। এই রূপান্তরের গল্প শুধু চীনের নয়, এ গল্প তাদের সবার জন্য, যারা বিশ্বাস করে যে ইতিহাস কোনো স্থির নদী নয়; ইতিহাস হলো স্রোত, আর সঠিক পরিকল্পনা আর সাহস থাকলে সেই স্রোতের গতিপথ বদলানো যায়।
লেখক: রিয়া সরকার,
শিক্ষার্থী, নানজিং ইউনিভার্সিটি অফ ইনফরমেশন সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজি।