Tuesday, June 16, 2026
Live

(মতামত বিভাগের জন্য)

সিএমজি
সিএমজি বাংলা বিভাগ
Published: Updated:
(মতামত বিভাগের জন্য)

প্রযুক্তির মহাপ্রাচীরে দারিদ্র্য আটকাল চীন, সম্ভাবনা বাংলাদেশেরও

ফয়সল আবদুল্লাহ

রাত গভীর। চীনের কুইচৌ প্রদেশের একটি হাসপাতালের ওয়ার্ডে শুয়ে আছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব ছেন ইউকুও। চোখে ঘুম নেই। হাসপাতালের বেডে শুয়ে কেটেছে কয়েকটি দিন। টেনশনটা নিজের রোগ নিয়ে নয়। মন পড়ে আছে বাড়ির খামারে। গবাদিপশুগুলোকে ফেলে এসেছেন। হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর স্ত্রীও কাছছাড়া হয়নি। প্রাণীগুলোকে খাবার দেওয়ার কেউ আছে?

এদিকে হাসপাতালের বিলটাও বেড়ে চলেছে লাগামহীন। ছেন স্পষ্ট বুঝতে পারছিলেন, তার এমন অসুস্থতা মানেই সংসারটা আবার রাতরাতি চলে যাবে দারিদ্র্যের পাড়ায়। যে দারিদ্র্যটাকে তিনি এর আগে একবার ঝেঁটিয়ে বিদায় জানিয়েছিলেন।

তবে ছেনের কানে তখনও একটা খবর পৌঁছায়নি। তার এই ঘোরতর সংকটের খবর কিন্তু চলে গেছে স্থানীয় প্রশাসনের কানে। হাসপাতালের বিলের খবরটাও তারা জানেন। কীভাবে? ছেনের মতো নিম্নবিত্ত মানুষের হাসপাতাল বিল যখন একটা সীমা অতিক্রম করে, তখনই টনক নড়ে কুইচৌ প্রদেশের একটি এআই পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার। সেটাই সতর্কবার্তা পাঠিয়ে দেয় স্থানীয় প্রশাসনের কাছে। সিস্টেমটি বুঝে নিয়েছিল, এই পরিমাণ বিল পরিশোধ করতে গেলে ছেনের পরিবারকে আবার পথে বসতে হবে এবং সেটা কিছুতেই হতে দেওয়া যাবে না।

কয়েক দিনের মধ্যেই গ্রামের কয়েকজন কর্মকর্তা হাসপাতালে হাজির। তারা ছেনের পরিবারের আর্থিক সঙ্গতি যাচাই করলেন। দেওয়া হলো চিকিৎসা সহায়তা। খামারে অবহেলায় পড়ে থাকা প্রাণীগুলোর জন্য অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ক্রেতাও খুঁজে বের করা হলো। এতেও মিলল নগদ অর্থ। পরিবারটি যাতে ভবিষ্যতে কাজ করে চলতে পারে, সেটা নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থানের একটা পরিকল্পনাও তৈরি করে দিলেন ওই কর্মকর্তারা।

দারিদ্র্য প্রতিরোধে চীন যে মহাপ্রাচীর গড়ে তুলছে, ছেনের ঘটনাটি বলা যায় সেই প্রাচীরের এক টুকরো ইট। নেপথ্যের দর্শন একটাই—দারিদ্র্যের ঝুঁকি দেখা দিলে বসে থাকা চলবে না, দাঁড়াতে হবে পাশে এবং, সেটা হবে সরকারি কাজেরই অংশ।

দারিদ্র্য মানে অর্থের অভাব নয়; অর্থের অভাব তো ধনীদেরও হয়। কোনো হতদরিদ্র মানুষ তো মোটা অঙ্কের ব্যাংক ঋণ নেন না। দারিদ্র্য হলো মূলত অনিশ্চয়তা। আর অনিশ্চয়তা দূর করতে পারে যথাযথ তথ্য।

বাংলাদেশে গত কয়েক দশকে দারিদ্র্য কমেছে সত্য। কিন্তু গ্রামীণ ও শহরের নিম্নবিত্ত জনগোষ্ঠীর অনেকে এমন এক সূক্ষ্ম সীমারেখায় বাস করছেন, যেখানে সামান্য ধাক্কা লাগলেই একটা পরিবার বিপর্যস্ত হয়ে যাবে। এই বাস্তবতায় চীনের সাম্প্রতিক দারিদ্র্যবিরোধী মিশনে তথ্য-প্রযুক্তির অভিজ্ঞতাটা শিক্ষণীয় হতে পারে বাংলাদেশের জন্য।

চীন ২০২১ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চরম দারিদ্র্য নির্মূলের ঘোষণা দেয়। এর মাত্র আট বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৩ সাল থেকে চীনজুড়ে দারিদ্র্য হটাও আন্দোলন শুরু হয় এবং গ্রামাঞ্চলের ১০ কোটি দরিদ্র লোককে তুলে আনা হয় খাদের কিনারা থেকে।

এরপর চীনের প্রশাসন কিন্তু নাকে তেল দিয়ে ঘুমায়নি। মানুষ যাতে আবার দারিদ্র্যে ফিরে না যায়, সেটা নিশ্চিত করতে গত পাঁচ বছরে রাখতে হয়েছে কড়া নজর। চালু করতে হয়েছে এমন সব ব্যবস্থা, যা আগে কেউ ভাবেনি।

এ কাজে চীন যে প্রশ্নটা সবার আগে করেছে সেটা হলো—কারা আগামী ছয় মাস বা এক বছরের মধ্যে আবার দরিদ্র হয়ে পড়তে পারে? ঝুঁকির তালিকায় আছে কারা?

কুইচৌ প্রদেশের ছেন ইউকুওর বেলায় কাজটা যেভাবে হয়েছে তা হলো—সেখানকার জন-নিরাপত্তা দপ্তর, স্বাস্থ্যসেবা ও কৃষি কর্তৃপক্ষের যাবতীয় তথ্যভান্ডারকে বিগ ডেটার (অতিকায় ডেটাবেজ) অধীনে আনা হয়েছিল আগেই। কোনো মানুষকে বসে বসে নজরদারি করতে হয়নি। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিজেই গ্রামীণ বাসিন্দার তথ্যে চোখ বুলিয়েই বুঝে নিয়েছে ছেনের পরিবারের কোথায় কী সমস্যা হচ্ছে, এবং ভবিষ্যতে তার অবস্থা কোন দিকে গড়াতে পারে।

বাংলাদেশে এমন ব্যবস্থা নেই। ট্রাফিক সিগনালের মতো এআই ক্যামেরা বসিয়ে দিলেই যে দারিদ্র্য কেটে যাবে, ব্যাপারটা এমনও নয়। তবে দেশে ডিজিটাল জাতীয় পরিচয়পত্র আছে। আছে মোবাইল ব্যাংকিং ও বেশকিছু সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি। সঙ্গে দরকার এক চিলতে এআই আর প্রশাসনের সদিচ্ছা। ট্রাফিক সিগনালে গাড়ির ওপর রিয়েলটাইম নজরদারি যেখানে সম্ভব হচ্ছে, সেখানে ডিজিটাল তথ্য থাকলে তো কথাই নেই। চীনের কৌশলগত সহায়তায় অতিদ্রুত ‘দারিদ্র্য ঝুঁকি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা’ গড়ে তোলা খুব সম্ভব। সফটওয়্যার তৈরি বা ডেটা বিশ্লেষণের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়ার মতো বাংলাদেশে মেধাবীরও কমতি নেই। বরং, গ্রামীণ দারিদ্র্যে নজরদারি কিংবা দ্রুত পরিবারভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের কল্যাণে তাদের অনেকের কর্মসংস্থানও হতে পারে।

এটাও সত্য যে চীনের অভূতপূর্ব দারিদ্র্য দূরীকরণে সরকারের সদিচ্ছাটাই ছিল সবচেয়ে বড়। এর প্রতিফলন টের পাওয়া যায় ‘এক পরিবার, এক পরিকল্পনা’ নীতির মাঝে। চীন সরকার দারিদ্র্য ঠেকাতে এতটাই উঠেপড়ে লেগেছিল যে একটি একটি করে পরিবার ধরে, সেটার সমস্যা বুঝে সমাধানের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল।

চীনের স্থানীয় প্রশাসনের মতো বাংলাদেশেরও প্রতিটি ইউনিয়ন, ওয়ার্ড এবং গ্রামভিত্তিক সামাজিক কাঠামোগুলো তৎপর। স্থানীয় বাস্তবতা সম্পর্কে তারাই সবচেয়ে ভালো জানে। দরকার শুধু স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা, সমাজসেবা অধিদপ্তর এবং এনজিওগুলোর সঙ্গে প্রযুক্তি দপ্তরের সমন্বিত কাজ। এতে কোন প্রযুক্তি বা কৌশল সবচেয়ে ভালো কাজ করতে পারে সে পথ দেখাতে চীন তো আছেই। সামাজিক নিরাপত্তা ভাতা, কৃষি ভর্তুকি, উপবৃত্তি এবং মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের তথ্য এআই-এর মাধ্যমে একজোট হলেই দেখা যাবে হু হু করে বেরিয়ে আসবে কোন পরিবার কীসের ঝুঁকিতে আছে, কার পাশে সবার আগে দাঁড়ানো দরকার ইত্যাদি বিস্তর তথ্য।

ধরা যাক, কোনো কৃষক পরপর দুই মৌসুমে ক্ষতির মুখে পড়েছেন; কোনো শিক্ষার্থী বিদ্যালয় ছেড়ে দেওয়ার ঝুঁকিতে আছে; কিংবা কোনো পরিবার নিয়মিত স্বাস্থ্যসেবা ব্যয় বহন করতে পারছে না। এই তথ্যগুলো দ্রুত শনাক্ত করা গেলে সংকট গভীর হওয়ার আগেই ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব। সমাজকল্যাণ বা সহায়তাভিত্তিক উদ্যোগগুলোও তখন উপযুক্ত সাহায্যগ্রহীতাকে দ্রুত খুঁজে বের করতে পারবে।

চীনের অভিজ্ঞতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, তারা দারিদ্র্য বিমোচনকে শুধু ভাতা বা অনুদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এর সঙ্গে যুক্ত করেছে গ্রামীণ শিল্প, কৃষি আধুনিকায়ন, ই-কমার্স, অবকাঠামো এবং কর্মসংস্থান। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও দীর্ঘমেয়াদে দারিদ্র্য কমানোর কার্যকর উপায় হলো গ্রামীণ অর্থনীতিকে শক্তিশালী করা। গ্রামে কৃষিভিত্তিক ক্ষুদ্র শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, মৎস্য খাত, দুগ্ধশিল্প, অনলাইন বাজারব্যবস্থা এবং যুব উদ্যোক্তা উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, নগদ সহায়তা কিছুদিনের আরাম দিতে পারে, স্থায়ীভাবে দারিদ্র্যমুক্তি ঘটায় না।

চীনের দারিদ্র্যবিরোধী অভিযানের বড় শক্তিটা ছিল মাঠপর্যায়ের নিবেদিত কর্মকর্তারা। তারাই গ্রামে গ্রামে গিয়ে মানুষের সমস্যা শনাক্ত করেছেন, তথ্য সংগ্রহ করেছেন, সমাধানটা বাস্তবায়ন করেছেন। আবার এ কাজে তাদের নিষ্ঠার পরিচয়ও দিতে হয়েছে ঢের। কুইচৌতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা যখনই কোনো দারিদ্র্য সংক্রান্ত সতর্কবার্তা দেয়, সেটার জন্য কার্যকর সহায়তা প্রদানের সময় বেঁধে দেওয়া হয় ১৫ দিন। এর ফলে ২০২৫ সালের জুন নাগাদ, প্রদেশটি আট লাখ ৫৩ হাজার মানুষকে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে থাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। আর দ্রুত সুনির্দিষ্ট সহায়তার মাধ্যমে, তাদের মধ্যে প্রায় ৭৩ শতাংশই জীবনযাত্রা স্থিতিশীল করতে পেরেছে। এভাবে চীনজুড়ে গত পাঁচ বছরে দারিদ্র্যে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকা ৭০ লাখেরও বেশি মানুষকে চিহ্নিত করে সহায়তা দেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশের ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা প্রশাসন, কৃষি কর্মকর্তা, সমাজকর্মী ও স্থানীয় উন্নয়ন কর্মীদের এমন ভূমিকা নিশ্চিত করতে পারলে কেমন হতো? এ জন্য চীনে ঠিক কী ধরনের জবাবদিহি কৌশল প্রয়োগ হচ্ছে? কর্মকর্তারা তাদের কাজটুকু ঠিকঠাক করছেন কিনা সেখানেও কি এআই ক্যামেরা নজর রাখতে পারে? এর উত্তরটাও নিশ্চয়ই চীনে পাওয়া যাবে।

চীনের অভিজ্ঞতা হুবহু অনুকরণের প্রয়োজন নেই। বরং শিক্ষাটা নেওয়া যায় আগে। বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা আলাদা। তবে চীনের দেখানো কয়েকটি নীতি কাজে লাগানোই যায়। যেমন—দারিদ্র্য প্রতিরোধকে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা যায় এবং দারিদ্র্যের আশঙ্কাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগের পূর্বাভাসের মতো গুরুত্ব দেওয়া যায়। আবার চীনের দেখাদেখি বাংলাদেশেও প্রতিটি ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারের জন্য পৃথক সহায়তা পরিকল্পনা তৈরি করা যায়। সেই সঙ্গে এআই ও ডিজিটাল প্রযুক্তিকে সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে সংযুক্ত করেও পুরনো সমস্যার নতুন সমাধান বের করা যায়। যেমন, কোনো এলাকায় কোনো পরিবারের কাউকে জরুরি ভিত্তিতে সাময়িক একটা কাজ জুটিয়ে দেওয়া যায়। আবার ঘোর সংকটে পড়া কৃষকের জন্য প্রশাসনের উদ্যোগে দ্রুত ক্রেতার ব্যবস্থা করা যায়। এমনকি এ পদ্ধতিতে ভিক্ষাবৃত্তিতে জড়ানো কর্মক্ষম একটি জনগোষ্ঠীকেও ডাটাবেজের অধীনে আনা সম্ভব। তাদেরকে প্রশাসনের উদ্যোগে কাজের বিনিময়ে খাদ্য কর্মসূচিতে যুক্ত করা যাবে খুব সহজে। দাতারাও বুঝতে পারবেন, কোনো একগুচ্ছ দরিদ্র পরিবারকে এক বেলা মাছ-ভাত খাওয়ানোই সমাধান নয়। চীনের মতো এআই নজরদারির ব্যবস্থা থাকলে মুহূর্তেই জানা যাবে, কাকে মাছ ধরা শেখাতে হবে আর কাকে দিতে হবে খামার গড়ে তোলার পুঁজি।

Rate This Article

How would you rate this article?

সিএমজি

সিএমজি

বাংলা বিভাগ

চায়না মিডিয়া গ্রুপ (CMG) চীনের রাষ্ট্রীয় রেডিও ও টেলিভিশন সম্প্রচারকারী প্রধান কোম্পানি।

Our Editorial Standards

We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.

Fact-Checked

Every claim is verified by our editorial team before publication.

Expert Review

Content reviewed by subject matter experts for accuracy.

Regularly Updated

We update content to reflect the latest developments.

Unbiased Coverage

We present balanced perspectives and multiple viewpoints.