আগামী সপ্তাহে প্রকাশিত হতে যাচ্ছে চীনের চলতি বছরের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান। এই পরিসংখ্যানে নজর রাখছে ঢাকাও। প্রশ্ন হলো, বেইজিংয়ের অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্ক কী? উত্তর হলো—সম্পর্কটা অনেক গভীর।
প্রথমে প্রকাশিত কিছু হিসাবে নজর বোলানো যাক। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে চীনের পণ্য আমদানি-রপ্তানির মোট মূল্য দাঁড়িয়েছে ৩৪.৭৮ ট্রিলিয়ন ইউয়ানে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ১৭.৬ শতাংশ বেশি। টানা চার মাস ধরে বৈদেশিক বাণিজ্যে দুই অঙ্কের প্রবৃদ্ধি বজায় রেখেছে দেশটি। এ সময়ে চীনের রপ্তানি বেড়েছে ১৪.৬ শতাংশ, আর আমদানি বেড়েছে ২২ শতাংশ। অর্থাৎ, রপ্তানির তুলনায় আমদানির প্রবৃদ্ধির গতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
কোনো দেশের আমদানি যখন রপ্তানির চেয়ে দ্রুত বাড়ে, তখন তা বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে পণ্য কেনার চাহিদা বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। বাংলাদেশের জন্য এর অর্থ—চীনের বাজারে প্রবেশের নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা।
চীন-বাংলাদেশ বাণিজ্যের পরিসংখ্যানেও আশাব্যঞ্জক ইঙ্গিত রয়েছে। চলতি বছরের প্রথম আট মাসে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৬ দশমিক ৯ বিলিয়ন মার্কিন ডলারে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৮ দশমিক ৮ শতাংশ বেশি। এর মধ্যে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি বেড়েছে ১২ শতাংশ—দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির চেয়েও বেশি হারে। বাংলাদেশের জন্য এটি স্পষ্টই ইতিবাচক সংকেত।
চীনের তৃতীয় প্রান্তিকের মোট দেশজ উৎপাদন বা জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে বাজার বিশ্লেষকদের পূর্বাভাসে অবশ্য কিছুটা মতভেদ রয়েছে। কয়েকটি প্রতিষ্ঠান ৪ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে, আবার কিছু বিশ্লেষকের ধারণা, তা ৪ দশমিক ৫ শতাংশে পৌঁছাতে পারে। সংখ্যাটিকে বিচ্ছিন্নভাবে হয়তো অসাধারণ মনে হবে না। কিন্তু বৈশ্বিক অর্থনীতির অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে ৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি বজায় রাখার সম্ভাবনা যে গুরুত্বপূর্ণ, তা অস্বীকারের উপায় নেই।
এদিকে বাংলাদেশও অর্থনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরে ৪.৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে। তবে একই সঙ্গে দেশের ঋণঝুঁকির মাত্রা ‘নিম্ন’ থেকে ‘মধ্যম’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে।
এদিকে রপ্তানি খাতে চাপ স্পষ্ট। ২০২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক রপ্তানি আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ২.৮২ শতাংশ কমেছে। আর্থিক খাতের চ্যালেঞ্জও কম নয়; খেলাপি ঋণের পরিমাণ এখনো ৫ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি।
তবে বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। নতুন সরকার স্থিতিশীলতা থেকে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধির দিকে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যে পাঁচ বছর মেয়াদি অর্থনৈতিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করছে। পরিকল্পনার একটি লক্ষ্য হলো, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের জিডিপি ৭৪২.৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা।
কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়—এই লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ ও বিনিয়োগ আসবে কোথা থেকে? উত্তরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ খুঁজে পাওয়া যেতে পারে বেইজিংয়ে।
চলতি বছরের জুনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী রহমানের চীন সফরের সময় দুই দেশ একাধিক সহযোগিতার নথিতে স্বাক্ষর করে। চীন জানায়, তারা বাংলাদেশ থেকে আরও বেশি মানসম্পন্ন পণ্য আমদানি করতে আগ্রহী।
পাশাপাশি, বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিনিয়োগে সমর্থন এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি, ডিজিটাল অর্থনীতি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মতো উদীয়মান ক্ষেত্রে সহযোগিতা বাড়ানোর আগ্রহও প্রকাশ করে।
সহযোগিতার সম্ভাবনা শুধু ঘোষণার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। চীন-বাংলাদেশের যৌথ বিবৃতিতে মোংলা বন্দরের আধুনিকায়ন এবং চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্পপার্ক নির্মাণের কাজ সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছে। চলতি বছরের জুলাইয়ে চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্প পার্কের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। বাংলাদেশের কর্মকর্তারাও প্রকল্পটিকে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ ও শিল্পায়ন এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
বাংলাদেশি অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ একটি বাস্তব বিষয় তুলে ধরেছেন। তার মতে, গত দুই বছরে রাজনৈতিক অনিশ্চয়তার কারণে বিনিয়োগ কমেছে। এখন নতুন সরকারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিনিয়োগকে আবারও জাতীয় অর্থনৈতিক কর্মসূচির কেন্দ্রে ফিরিয়ে আনা। তিনি আরও বলেছেন, চীন ও চীনা বিনিয়োগের প্রতি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে জোরালো সমর্থন রয়েছে।
চীনের অর্থনীতির গতিপথ সরাসরি দেশটির বিনিয়োগ সক্ষমতা ও বিদেশে বিনিয়োগের আগ্রহকে প্রভাবিত করতে পারে। চীন যদি ৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে এবং আমদানির প্রবৃদ্ধি রপ্তানির চেয়ে বেশি থাকে, তা হলে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও কৃষিপণ্যের জন্য বিশ্বের বৃহত্তম ভোক্তা বাজারগুলোর একটিতে প্রবেশের সুযোগ আরও বাড়তে পারে।
একইভাবে, চীনা প্রতিষ্ঠানগুলো বিদেশে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ অব্যাহত রাখলে চট্টগ্রাম চীন অর্থনৈতিক শিল্প পার্কের মতো প্রকল্পও নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ পেতে পারে।
এটি নিছক সহায়তার গল্প নয়; বরং ব্যবসা ও পারস্পরিক স্বার্থের হিসাব। বাংলাদেশের প্রয়োজন বিনিয়োগ, রপ্তানির বাজার ও শিল্পায়নের সুযোগ। অন্যদিকে, চীনের প্রয়োজন বৈচিত্র্যময় সরবরাহব্যবস্থা, নতুন বাজার এবং নির্ভরযোগ্য অংশীদার। দুই দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে তাই পারস্পরিকভাবে লাভবান হওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আমার একটি উপলব্ধি আরও দৃঢ় হয়েছে: চীনের অর্থনীতির সমস্যাগুলো নিয়ে আলোচনা অনেক বেশি হলেও দেশটির অর্থনৈতিক সহনশীলতা ও অভিযোজনক্ষমতাকে অনেক সময় যথাযথ গুরুত্ব দেওয়া হয় না।
প্রায় ১৪০ কোটি মানুষের অর্থনীতি—যা আবাসন খাতের সমন্বয়, বৈদেশিক চাপ ও অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত রূপান্তরের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে—সেই অর্থনীতি যদি ৪ শতাংশের বেশি প্রবৃদ্ধি এবং ১৭ শতাংশের বেশি বৈদেশিক বাণিজ্য প্রবৃদ্ধি ধরে রাখতে পারে, তাহলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশের জন্য এর তাৎপর্যও স্পষ্ট। চীন শুধু একটি বড় বাণিজ্য অংশীদার নয়; দেশটি বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান আমদানি উৎস এবং ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ বিনিয়োগের উৎসও। অর্থাৎ, বাংলাদেশের অর্থনীতির সঙ্গে চীনের অর্থনৈতিক গতিপথের যোগসূত্র সরাসরি ও বাস্তব।
চীনের তৃতীয় প্রান্তিকের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান শিগগিরই প্রকাশিত হবে। সেখানে উত্থান-পতন থাকতে পারে, থাকবে নানা বিশ্লেষণ ও বিতর্কও। কিন্তু একটি বিষয় বদলাবে না—বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় চীনের বাজার, বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতিপ্রকৃতি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচ্য বিষয় হয়ে থাকবে।
তাই ঢাকার শুধু চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধির দশমিকের পরের সংখ্যাগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকলে চলবে না। আরও গুরুত্বপূর্ণ হলো, চীন কী ধরনের পণ্য আমদানি করছে, কোন খাতে বিনিয়োগ করছে এবং কী ধরনের অবকাঠামো ও শিল্প গড়ে তুলছে—সেদিকে নজর রাখা।
কারণ, এই প্রবণতাগুলো কেবল অর্থনীতির পরিসংখ্যানের বিষয় নয়; এগুলোর সঙ্গে বাংলাদেশের শিল্প, কর্মসংস্থান, রপ্তানি এবং সাধারণ মানুষের জীবিকা ও ভবিষ্যতের সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
লেখক: সাংবাদিক, চায়না মিডিয়া গ্রুপ