১৯৭৮ সালে চীনের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) ছিল মাত্র ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। ২০২৪ সালে এসে সেই সংখ্যাটি দাঁড়িয়েছে ১৮.৭৪ ট্রিলিয়ন ডলারে। মাত্র চার দশকে এই রূপান্তর ইতিহাসের কোনো পাতায় এর তুলনা খুঁজে পাওয়া কঠিন।
"দেং শিয়াওপিং একটা কথা বলতেন 'বিড়াল সাদা হোক বা কালো, ইঁদুর ধরতে পারলেই হলো।' আর চীনা সংস্কারের আরেকটি বিখ্যাত দর্শন ছিল 'পাথরে পা রেখে নদী পার হও' যে নীতির সাথে দেং নিজেও সম্পূর্ণ একমত ছিলেন।" এই দুটো বাক্যের ভেতরেই লুকিয়ে আছে চীনের উন্নয়নের মূল দর্শন। মতাদর্শের চেয়ে ফলাফলকে প্রাধান্য দেয়া, এবং ঝুঁকি নেয়া তবে সতর্কভাবে, পরীক্ষা করে করে। ১৯৭৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর, চীনা কমিউনিস্ট পার্টির একাদশ কেন্দ্রীয় কমিটির তৃতীয় পূর্ণ অধিবেশনে এই দর্শনের ভিত্তিতেই চালু হয়েছিল "সংস্কার ও উন্মুক্তকরণ" নীতি যাকে চীনারা বলে "গাইগে কাইফাং"।
প্রথম পদক্ষেপ: মাঠ থেকে শুরু
সংস্কারের শুরুটা হয়েছিল শহর থেকে নয়, গ্রাম থেকে। সরকার "হাউজহোল্ড রেসপনসিবিলিটি সিস্টেম" চালু করল; কৃষকরা রাষ্ট্রের নির্ধারিত কোটার বাইরে অতিরিক্ত ফসল বাজারে বিক্রি করতে পারবে। এই একটা পরিবর্তনেই সিচুয়ান প্রদেশে কৃষি উৎপাদন মাত্র তিন বছরে ২৪ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল। সফলতা দেখে একই নীতি সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হলো। এটাই ছিল দেং-এর "পাথরে পা রেখে নদী পার" কৌশলের প্রথম বাস্তব প্রয়োগ আগে ছোট পরিসরে পরীক্ষা করা, ফলাফল দেখা, তারপর বড় পরিসরে প্রসারিত করা।
এরপর এলো বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা স্পেশাল ইকোনমিক জোন (এসইজেড)-এর ধারণা। শেনজেন, ঝুহাই, শান্তৌ, ও সিয়ামেন এই চারটি শহরকে বেছে নেওয়া হলো পরীক্ষার মাঠ হিসেবে। বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য কর ছাড়, শিথিল বিধিমালা, এবং রপ্তানিমুখী উৎপাদনের সুযোগ দেওয়া হলো। শেনজেনের কথাই ধরুন ১৯৮০ সালে যেটি ছিল একটি ছোট মাছধরার গ্রাম, আজ সেটি বিশ্বের অন্যতম প্রযুক্তি কেন্দ্র। Huawei, Tencent, DJI এই বৈশ্বিক প্রযুক্তিপণ্য কোম্পানিগুলোর জন্মস্থান শেনজেন।
অর্থনৈতিক অলৌকিকতা: সংখ্যায় যার প্রমাণ
বিশ্বব্যাংকের ভাষায়, চীনের এই প্রবৃদ্ধি হলো "ইতিহাসের কোনো বড় অর্থনীতির সবচেয়ে দ্রুততম টেকসই সম্প্রসারণ।" ১৯৭৮ সাল থেকে গড় জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার ছিল বছরে ৯ শতাংশের বেশি। এই হারে প্রতি আট বছরে মোট অর্থনীতির আকার দ্বিগুণ হয়ে গেছে। ২০০১ সালে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থায় (ডব্লিউটিও) যোগ দেওয়ার পর বেসরকারি খাত আরও গতি পেয়েছে, ২০০৫ সালের মধ্যে বেসরকারি উদ্যোগ চীনের জিডিপির ৭০ শতাংশ উৎপন্ন করতে শুরু করে।
দারিদ্র্যবিমোচনের চিত্রটা আরও চমকপ্রদ। ১৯৭৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে চীনে চরম দারিদ্র্য থেকে মুক্ত হয়েছে প্রায় ৮০ কোটি মানুষ। AMRO (আসিয়ান+৩ ম্যাক্রো ইকোনমিক রিসার্চ অফিস)-এর ২০২৪ সালের প্রতিবেদন বলছে, ১৯৮১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে বিশ্বব্যাপী যে দারিদ্র্যবিমোচন হয়েছে তার ৭৫ শতাংশই অর্জিত হয়েছে শুধু চীনের কারণে। ২০২১ সালে চীন আনুষ্ঠানিকভাবে চরম দারিদ্র্য বিলোপের ঘোষণা দিয়েছে, জাতিসংঘের ২০৩০ টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত সময়ের পুরো এক দশক আগেই।
রাস্তা-রেলপথ-সেতু: অবকাঠামোর ভূমিকা
চীনের উন্নয়নের আরেকটি স্তম্ভ হলো অবকাঠামো। ২০২৪ সালের শেষ নাগাদ চীনের মোট রেলপথের দৈর্ঘ্য দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৬২ হাজার কিলোমিটার, যার মধ্যে ৪৮ হাজার কিলোমিটার শুধু হাইস্পিড রেল, বিশ্বের মোট হাইস্পিড রেলপথের ৭০ শতাংশেরও বেশি একটি দেশের হাতে। চীনের সরকারি রেল কর্তৃপক্ষের (China State Railway Group) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মধ্যে এই হাইস্পিড ট্রেনগুলো মোট ২২৯০ কোটিরও বেশি যাত্রী বহন করেছে। এক বছরেই ৩.৩ বিলিয়ন যাত্রী ভ্রমণ করেছে হাইস্পিড রেলে।
এই অবকাঠামো শুধু যাতায়াতের সুবিধার জন্য নয়। গবেষণা বলছে, একটি পিছিয়ে পড়া অঞ্চলে হাইস্পিড রেল পৌঁছানোর পর সেখানকার জিডিপি গড়ে ৫ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। দূরবর্তী পার্বত্য অঞ্চলে রেলপথ গেছে, যেটা একসময় অসম্ভব বলে মনে করা হতো। ২০২৪ সালে চীন-ইউরোপ মালবাহী ট্রেন সেবা ১৯ হাজার ট্রিপ পরিচালনা করেছে, ২০ লাখ ৭০ হাজার কন্টেইনার পরিবহন করা হয়েছে যা আগের বছরের চেয়ে ৯-১০ শতাংশ বেশি।
বেল্ট অ্যান্ড রোড: বিশ্বকে যুক্ত করার উচ্চাভিলাষ
২০১৩ সালে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ঘোষণা করেন বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) যাকে আধুনিক "সিল্ক রোড"ও বলা হয়। লক্ষ্য হলো সড়ক, রেল, বন্দর, ও ডিজিটাল সংযোগের মাধ্যমে এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে এক সুতায় গেঁথে ফেলা। ২০২১ সালে চীন-লাওস রেলপথ চালু হয়েছে, কুনমিং থেকে ভিয়েনতিয়েনে যাত্রার সময় ফেরি-নৌকার পরিবর্তে এখন লাগে মাত্র কয়েক ঘণ্টা। ২০২৩ সালে ইন্দোনেশিয়ার জাকার্তা-বান্দুং হাইস্পিড রেল চালু হয়েছে চীনা প্রযুক্তিতে, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার প্রথম বুলেট ট্রেন। গ্রিন ফাইন্যান্স ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের ২০২৪ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিআরআই-এর আওতায় শুধু রেল খাতে চীনের বিনিয়োগ ছিল ৯.৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার।
বাংলাদেশ ও চীন: একটি ক্রমবর্ধমান সম্পর্ক
চীনের এই উন্নয়নের ঢেউ বাংলাদেশকেও স্পর্শ করেছে। ২০১৮ সালে চীন, ভারতকে সরিয়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় বাণিজ্য অংশীদার হয়েছে। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে বাংলাদেশ-চীন দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৭.৩৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। বাংলাদেশ রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, বাংলাদেশ এই সময়ে চীনে ৭১৫ মিলিয়ন ডলার রপ্তানি করেছে এবং আমদানি করেছে ১৬.৬৪ বিলিয়ন ডলার।
একটা বড় পরিবর্তন এসেছে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে। চীন বাংলাদেশের সব পণ্যের জন্য শূন্য শুল্কের সুবিধা চালু করেছে এবং প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ২০২৮ পর্যন্ত, অর্থাৎ বাংলাদেশ স্বল্পোন্নত দেশের মর্যাদা হারানোর পরেও এই সুবিধা থাকবে। KRF সেন্টার ফর বাংলাদেশ অ্যান্ড গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্সের বিশ্লেষণ বলছে, ২০০১ থেকে ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত বাংলাদেশে চীনের মোট সঞ্চিত বিনিয়োগ ১.৫৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে গেছে। শক্তি উৎপাদন, টেক্সটাইল, এবং অবকাঠামো এই তিন খাতেই চীনের বিনিয়োগ সবচেয়ে বেশি।
বাংলাদেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরেও চীনের সঙ্গে সম্পর্কের ধারাবাহিকতা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান ৫ থেকে ৭ মে চীন সফর করেছেন, নতুন সরকারের পক্ষে এটাই ছিল প্রথম চীন সফর। বেইজিংয়ের দিয়াওইউতাই স্টেট গেস্ট হাউসে চীনের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ওয়াং ই-র সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, অবকাঠামো এবং বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা আরও গভীর করার বিষয়ে আলোচনা হয়। ওয়াং ই বলেন, চীন বাংলাদেশের নতুন সরকারকে সমর্থন করে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও উচ্চতায় নিয়ে যেতে আগ্রহী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান বলেন, "চীন বাংলাদেশের একটি বিশ্বস্ত ও অপরিহার্য বন্ধু এবং অংশীদার।" এই সফর স্পষ্টভাবে প্রমাণ করে, সরকার বদলালেও বাংলাদেশ-চীন সম্পর্কের মূল ভিত্তি পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও উন্নয়ন সহযোগিতা অটুট থাকে।
শাসনব্যবস্থা: দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গির শক্তি
চীনের উন্নয়নের পেছনে একটি কারণ হলো পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা। পাঁচ বছরের পরিকল্পনা থেকে শুরু করে ত্রিশ বছরের দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি পর্যন্ত সবকিছু একটি সুসংগত কাঠামোয় চলে। "মেড ইন চায়না ২০২৫", "ডিজিটাল চায়না", "কার্বন নিউট্রালিটি ২০৬০" এই লক্ষ্যমাত্রাগুলো কোনো সরকারি পরিবর্তনে বাতিল হয়ে যায় না। ২০২৪ সালে চীনের গবেষণা ও উন্নয়ন (আরঅ্যান্ডডি) ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৬১৩ বিলিয়ন ইউয়ান, যা ২০২৩ সালের তুলনায় ৮.৩ শতাংশ বেশি এবং মোট জিডিপির ২.৬৮ শতাংশ, প্রযুক্তি-নির্ভর ভবিষ্যতের জন্য চীনের প্রস্তুতির স্পষ্ট প্রমাণ।
তবে এই উন্নয়নের গল্পটা শুধু চকচকে নয়। আয়বৈষম্য এখনও একটি বড় সমস্যা। ২০২৫ সালে এখনও চীনের ১৫.২ শতাংশ মানুষ দিনে ৮.৩০ ডলারের কম আয়ে জীবন যাপন করছে বিশ্বব্যাংকের উচ্চতর মানদণ্ড অনুযায়ী। শহর ও গ্রামের মধ্যে আয়ের পার্থক্য রয়েছে, আঞ্চলিক বৈষম্যও স্পষ্ট। রাজনৈতিক স্বাধীনতার প্রশ্নে পশ্চিমা দুনিয়ার সমালোচনাও কম নয়।
উপসংহার
চীনের উন্নয়নের মডেল কোনো অনুলিপি করার বিষয় নয়, কিন্তু এর ভেতর থেকে কিছু সার্বজনীন শিক্ষা আছে। প্রথমত, পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা থাকলে বড় লক্ষ্য অর্জন সম্ভব। দ্বিতীয়ত, অবকাঠামো উন্নয়ন শুধু ইট-পাথরের বিষয় নয় এটি দারিদ্র্যবিমোচনের হাতিয়ার। তৃতীয়ত, বাজার ও রাষ্ট্রের মধ্যে সুষম ভারসাম্য রেখে চলা যায়, চীন অন্তত সেই দাবিই করে। বাংলাদেশের জন্য চীন একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার। দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, এবং ক্রমবর্ধমান কূটনৈতিক সম্পর্ক এই দুই দেশকে কাছে এনেছে। চীনের উন্নয়নের যাত্রা থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে বাংলাদেশ তার নিজস্ব পথ তৈরি করতে পারে কি না সেটাই এখন সবচেয়ে প্রাসঙ্গিক প্রশ্ন।
লেখক: মো: বাদশা,
শিক্ষার্থী, নানজিং ইউনিভার্সিটি অব অ্যারোনটিকস অ্যান্ড অ্যাস্ট্রোনটিকস