১। মঙ্গলের বুকে পানির দীর্ঘস্থায়ী ইতিহাস: চীনা রোভার ‘চুরোং’-এর বিস্ময়কর আবিষ্কার
২। ক্যান্সারের ভেতর থেকে আক্রমণ: ‘ট্রোজান হর্স’ ভ্যাকসিনে খুলে যাচ্ছে চিকিৎসার নতুন দিগন্ত
মঙ্গলের বুকে পানির দীর্ঘস্থায়ী ইতিহাস: চীনা রোভার ‘চুরোং’-এর বিস্ময়কর আবিষ্কার
লাল গ্রহ মঙ্গলের বুকে একসময় পানি প্রবাহিত হতো—এই ধারণা বিজ্ঞানীদের কাছে পুরনো। কিন্তু সেই পানির ধারা ঠিক কত সময় ধরে টিকে ছিল, তা নিয়ে ছিল নানা বিতর্ক। চীনের প্রথম মঙ্গল রোভার ‘চুরোং’ (Zhurong) এবার সেই ইতিহাসের পাতা নতুন করে লিখে দিল। চীনা ভূতত্ত্ববিদদের সাম্প্রতিক এক গবেষণা জানাচ্ছে, মঙ্গলে পানির অস্তিত্ব ছিল আমাদের আগের ধারণার চেয়েও অনেক বেশি সময় ধরে।
চীনা একাডেমি অব সায়েন্সেসের ভূতত্ত্ব ও ভূভৌতিক গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষক দল জানিয়েছে, প্রায় ৭৫ কোটি বছর আগেও মঙ্গলের পৃষ্ঠে উল্লেখযোগ্য জলীয় কার্যকলাপ বিদ্যমান ছিল। ইতিপূর্বে বিজ্ঞানীরা মঙ্গলে পানির সময়কাল নিয়ে যা ভেবেছিলেন, চুরোং-এর সংগৃহীত তথ্য বলছে পানি তার চেয়েও কয়েকশ মিলিয়ন বছর বেশি সময় ধরে সেখানে স্থায়ী ছিল। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান সাময়িকী ‘ন্যাশনাল সায়েন্স রিভিউ’-তে এই গবেষণার ফলাফল প্রকাশিত হয়েছে।
২০২১ সালের মে মাসে মঙ্গলের ‘ইউটোপিয়া প্লানিশিয়া’র দক্ষিণাংশে অবতরণ করে চুরোং। এরপর প্রায় দুই কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে বিপুল বৈজ্ঞানিক তথ্য সংগ্রহ করে এই রোভারটি। চুরোং-এ থাকা শক্তিশালী ‘গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার’, যা অনেকটা চিকিৎসাবিজ্ঞানের ‘সিটি স্ক্যান’-এর মতো কাজ করে, মঙ্গলের মাটির নিচে অদ্ভুত এক স্তরের সন্ধান পেয়েছে।
গবেষণায় দেখা গেছে, অবতরণস্থলের নিচে প্রায় ৪ মিটার পুরু সমান্তরাল অবক্ষেপণের স্তর রয়েছে। চীনা গবেষকদের মতে, এই স্তরের বিন্যাস কোনো আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত বা বাতাসের প্রবাহের ফলে তৈরি হয়নি। বরং এটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দিচ্ছে এক জলঘেরা পরিবেশের। বিজ্ঞানীদের ধারণা, এই স্থানে একসময় ছিল কোনো অগভীর সাগর কিংবা বিশাল এক হ্রদ।
মঙ্গলের জলবায়ু পরিবর্তনের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে এটি এক বিশাল মাইলফলক। চুরোং-এর এই তথ্যের মাধ্যমে জানা যাচ্ছে যে, মঙ্গল গ্রহটি যতটা দ্রুত শুকিয়ে গিয়েছিল বলে ভাবা হয়েছিল, বাস্তবে তা ঘটেনি। দীর্ঘ সময় ধরে জলীয় পরিবেশের উপস্থিতি সেখানে একসময় প্রাণের অনুকূল পরিবেশ ছিল কি না, সেই সম্ভাবনাকে আরও জোরালো করে তুলল।
মঙ্গলের রুক্ষ মাটির নিচে লুকিয়ে থাকা পানির এই দীর্ঘ ইতিহাস এখন বিশ্বজুড়ে জ্যোতির্বিজ্ঞানীদের নতুন করে ভাবিয়ে তুলছে। চীনের এই রোভারটি হয়তো ভবিষ্যতে আমাদের মঙ্গলে মানববসতি স্থাপনের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় আরও নতুন নতুন পথ দেখাবে।
|| প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার
|| সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ
ক্যান্সারের ভেতর থেকে আক্রমণ: ‘ট্রোজান হর্স’ ভ্যাকসিনে খুলে যাচ্ছে চিকিৎসার নতুন দিগন্ত
ক্যান্সার কোষের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো তার ছদ্মবেশ। শরীরের নিজস্ব রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখকে ফাঁকি দিয়ে সে দিনের পর দিন বেড়ে ওঠে এক দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো। কিন্তু কেমন হতো যদি সেই দুর্গের ভেতরেই প্রবেশ করানো যেত এমন এক গুপ্তচরকে, যে ভেতর থেকে ক্যান্সারের মুখোশ টেনে ছিঁড়ে ফেলবে? গ্রিক পুরাণের সেই বিখ্যাত ‘ট্রোজান হর্স’-এর মতো এক চমকপ্রদ কৌশল নিয়ে হাজির হয়েছেন বেইজিং বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক পেং চেন এবং তার দল। তারা তৈরি করেছেন এমন এক বিশেষ ‘ইন্ট্রাটিউমোরাল ভ্যাকসিন’, যা ক্যান্সার কোষের ভেতরে সংগোপনে প্রবেশ করে সেটিকে শরীরের রোগ প্রতিরোধ বাহিনীর কাছে সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করে। যুগান্তকারী এই উদ্ভাবনটি কেবল ক্যান্সারকে আক্রমণই করে না, বরং ক্যান্সার কোষকে বাধ্য করে নিজের পরিচয় প্রকাশ করে আত্মাহুতির পথ বেছে নিতে।
বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ প্রকাশিত তাদের এই গবেষণাটি এখন চিকিৎসাবিজ্ঞানে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
দশক ধরে ক্যান্সারের মূল চিকিৎসা ছিল সার্জারি, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি। সম্প্রতি ‘ইমিউনোথেরাপি’ এক যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছে, যা শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে (ইমিউন সিস্টেম) কাজে লাগিয়ে ক্যান্সার নির্মূল করে। কিন্তু সমস্যা হলো, সব রোগীর ক্ষেত্রে এটি কাজ করে না। কিছু টিউমারকে বলা হয় ‘ইমিউন-কোল্ড টিউমার’। এগুলো নিজেদের এমনভাবে লুকিয়ে রাখে যে শরীরের ইমিউন কোষগুলো তাদের শনাক্তই করতে পারে না। ফলে শরীরের শক্তিশালী রোগ প্রতিরোধ বাহিনী থাকা সত্ত্বেও ক্যান্সার কোষগুলো অগোচরে বেড়ে ওঠে।
অধ্যাপক পেং ছেন এবং তার দল দীর্ঘ চার বছরের গবেষণায় তৈরি করেছেন ‘আই-ভ্যাক’ নামক একটি বিশেষ ভ্যাকসিন। এটি কেবল ক্যান্সার কোষকে আক্রমণ করে না, বরং কোষগুলোকে বাধ্য করে তাদের অভ্যন্তরীণ প্রোটিন ভেঙে নিজেদের পরিচয় প্রকাশ করতে।
সাধারণত ক্যান্সার কোষগুলো তাদের গায়ে পিডি-এল১ নামক এক ধরণের অণু বহন করে, যা শরীরের টি-সেলকে সংকেত পাঠায়। ভ্যাকসিনটি এই সংকেতকে নিষ্ক্রিয় করে দেয়। এটি ক্যান্সারের প্রতিরক্ষা দেওয়াল ভেঙে ফেলে এবং টিউমার কোষের ভেতরে ঢুকে সেগুলোকে রিসাইকেল বা ধ্বংস করতে শুরু করে।
এই গবেষণার সবচেয়ে চমকপ্রদ অংশ হলো শরীরের ‘ইমিউন মেমোরি’ বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার স্মৃতিকে কাজে লাগানো। আমাদের শরীরে আগে হওয়া বিভিন্ন ভাইরাসের (যেমন সাইটোমেগালোভাইরাস) বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য একদল দক্ষ ‘মেমোরি টি-সেল’ সবসময় প্রস্তুত থাকে।
গবেষকরা আই-ভ্যাক ভ্যাকসিনে ক্যান্সারের অ্যান্টিজেন না দিয়ে বরং পরিচিত ভাইরাসের অ্যান্টিজেন যুক্ত করেছেন। ফলে যখন এই ভ্যাকসিন ক্যান্সার কোষে প্রবেশ করে, তখন ইমিউন সিস্টেম মনে করে কোষটি ভাইরাসে আক্রান্ত। এরপর শরীরের ‘এলিট ফোর্স’ বা মেমোরি টি-সেলগুলো বিপুল বিক্রমে ক্যান্সার কোষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে এবং সেগুলোকে পুরোপুরি নির্মূল করে।
ইঁদুর এবং মানুষের টিউমার টিস্যুর ওপর চালানো পরীক্ষায় আই-ভ্যাক প্রচলিত ইমিউনোথেরাপির চেয়ে অনেক গুণ বেশি কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। বিশেষজ্ঞরা একে ‘অত্যন্ত উৎসাহব্যঞ্জক আবিষ্কার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন।
গবেষকরা এখন এই প্রযুক্তিকে ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল বা মানুষের শরীরে প্রয়োগের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। এটি সফল হলে ভবিষ্যতে প্রতিটি রোগীর শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ইতিহাস অনুযায়ী আলাদা আলাদা ‘পার্সোনালাইজড’ ক্যান্সার ভ্যাকসিন তৈরি করা সম্ভব হবে।
যেসব ক্যান্সার এতদিন শরীরের নজর এড়িয়ে প্রাণ কেড়ে নিচ্ছিল, আই-ভ্যাকের কল্যাণে হয়তো অচিরেই তাদের সেই লুকোচুরির দিন শেষ হতে চলেছে।
|| প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার
|| সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ
নতুন আরও তথ্যবহুল ও অজানা বিষয় নিয়ে প্রতি সপ্তাহের সোমবার হাজির হবো আপনাদের সামনে। আগামী সপ্তাহে আবারো কথা হবে। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন।
প্রযোজনা ও উপস্থাপনা- শুভ আনোয়ার
অডিও সম্পাদনা- রফিক বিপুল
সার্বিক তত্ত্বাবধান- ইউ কুয়াং ইউয়ে আনন্দী
বিজ্ঞানবিশ্ব ১৫৭ পর্ব: ক্যান্সারের ভেতর থেকে আক্রমণ: ‘ট্রোজান হর্স’ ভ্যাকসিনে খুলে যাচ্ছে চিকিৎসার নতুন দিগন্ত ।
Stay Connected:
Our Editorial Standards
We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.
Fact-Checked
Every claim is verified by our editorial team before publication.
Expert Review
Content reviewed by subject matter experts for accuracy.
Regularly Updated
We update content to reflect the latest developments.
Unbiased Coverage
We present balanced perspectives and multiple viewpoints.