যা রয়েছে এবারের পর্বে
১. আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত চীনের দুই হাজার বছরের প্রাচীন পথ
২. ইয়ুননানের পাহাড়ে বিরল অর্কিড ‘হাবেনারিয়া প্লুরিফোলিয়া’র সন্ধান
নিবিড় সবুজ অরণ্য। পাখির ডানা মেলার শব্দ। নীল আকাশ। দূষণহীন সমুদ্র। আমাদের নীল গ্রহকে আমরা এমনভাবেই দেখতে চাই।পরিবেশ ও প্রতিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব সেই নির্মল প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য।
সুপ্রিয় শ্রোতা মানুষ ও প্রকৃতি অনুষ্ঠান থেকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি হোসনে মোবারক সৌরভ। বিশাল দেশ চীনের রয়েছে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় নিরলস প্রচেষ্টার ফলে চীনে জীববৈচিত্র্য যেমন বাড়ছে তেমনি উন্নত হচ্ছে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র। আমাদের অনুষ্ঠানে আমরা চীনসহ পুরো বিশ্বের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্র নিয়ে কথা বলবো।
১. আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত চীনের দুই হাজার বছরের প্রাচীন পথ
২০০০ বছরের প্রাচীন এক সড়ক, যাকে ঘিরে টিকে এখনো টিকে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন ও সু সংরক্ষিত সাইপ্রাস বন। সম্প্রতি চীনের সিচুয়ান প্রদেশের কুয়াং ইউয়ানের এই 'চিয়ানমেন শু রোড' লাভ করেছে অনন্য এক আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি । পরিবেশ ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষায় অসামান্য অবদানের জন্য এই প্রকল্পটি জিতেছে ২০২৫ গ্লোবাল সাস্টেইনেবল "আর্থ হোম" মডেল অ্যাওয়ার্ড। বিশেষ এই প্রাপ্তি নিয়ে বিস্তারিত চলুন শুনে আসি……
চীনের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় সিচুয়ান প্রদেশে অবস্থিত 'চিয়ানমেন শু রোড' কেবল একটি রাস্তা নয়, বরং এটি মানব সভ্যতা ও প্রকৃতির এক অনবদ্য মেলবন্ধন। গেল বছরের ২৮ ডিসেম্বর ওয়ার্ল্ড হারমোনি ফাউন্ডেশন এবং জাতিসংঘ পরিবেশ কর্মসূচির বিশেষ উদ্যোগে এই ঐতিহ্যবাহী স্থানটিকে আন্তর্জাতিক সম্মানে ভূষিত করা হয়।
এই সড়কের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো এর দুই পাশে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন সাইপ্রাস বা দেবদারু গাছ। এখানে প্রায় ২০,০০০-এর বেশি গাছ রয়েছে যাদের বয়স একশ বছর বা তারও বেশি। বিজ্ঞানীরা এটিকে বিশ্বের সেরা সংরক্ষিত প্রাচীন সাইপ্রাস বনের একটি বলে মনে করেন। কয়েক হাজার বছর ধরে এই বন রক্ষা করার স্থানীয় যে ঐতিহ্য, তার কারনেই মূলত 'আর্থ হোম' পুরস্কারের মাধ্যমে সম্মানিত করা হয়েছে এই রাস্তা কে।
'শুতাও' বা প্রাচীন শু রাজ্যের এই সড়ক ব্যবস্থা ১,০০০ কিলোমিটারেরও বেশি বিস্তৃত। প্রায় দুই হাজার বছর আগে পাহাড় আর বন্ধুর জলপথ পাড়ি দিয়ে এই রাস্তা তৈরি করা হয়েছিল। এটি আধুনিক সিচুয়ানের সাথে উত্তর চীনের কুয়াংচোংয়ের সমতলকে যুক্ত করেছিল, যা একসময় ছিল প্রাচীন চীনের হৃৎপিণ্ড।
বিশ্বের ডজনখানেক শহরের বিভিন্ন প্রকল্পকে পেছনে ফেলে চিয়ানমেন শু রোডের এই অনন্য বিজয়ের পেছনে মূলত তিনটি প্রধান কারণ কাজ করেছে। প্রথমত, প্রকল্পটিতে অত্যন্ত উদ্ভাবনী উপায়ে পরিবেশ সংরক্ষণ করা হয়েছে, যেখানে পুরনো ইকোসিস্টেমকে সম্পূর্ণ অক্ষুণ্ণ রেখে আধুনিক প্রযুক্তিতে বন রক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, হাজার বছরের পুরনো স্থাপত্য ও পথকে তার আদি রূপে টিকিয়ে রাখার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের যথাযথ সুরক্ষা নিশ্চিত করা হয়েছে। এবং তৃতীয়ত পর্যটন ও স্থানীয় উন্নয়নের সাথে প্রকৃতির নিবিড় ভারসাম্য বজায় রেখে এর টেকসই ব্যবহার নিশ্চিত করার বিষয়টি আন্তর্জাতিক বিচারকদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করেছে।
উন্নয়ন আর ঐতিহ্যকে পাশাপাশি রেখে নতুন একটি মডেল তৈরি করেছে চিয়ানমেন শু রোড। বিশেষজ্ঞদের মতে, পৃথিবীর টেকসই ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি আদর্শ মডেল হিসেবে পরিচিতি লাভ করলো।
প্রতিবেদন: হোসনে মোবারক সৌরভ
সম্পাদনা: আলআমিন আজাদ
তথ্য ও ছবি: সিসিটিভি
২. ইয়ুননানের পাহাড়ে বিরল অর্কিড ‘হাবেনারিয়া প্লুরিফোলিয়া’র সন্ধান
চীনের ইয়ুননান প্রদেশের সিয়াওহেইশান প্রকৃতি সংরক্ষনাগারে সম্প্রতি বিলুপ্তপ্রায় ও বিরল প্রজাতির অর্কিড ‘হাবেনারিয়া প্লুরিফোলিয়েটা’-র সন্ধান পাওয়া গেছে। মাত্র ৪০টিরও কম সংখ্যায় পাওয়া এই গাছগুলো উচ্চতায় ৭০ সেন্টিমিটারের বেশি এবং এদের প্রতিটি গাছে ১০ থেকে ২৫টি সবুজ বা সাদাটে ফুল রয়েছে। কাস্তে বা জিহ্বার মতো বাঁকানো পাপড়ি এবং ড্রিল বিটের মতো কুঁড়ি বিশিষ্ট এই উদ্ভিদটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের নির্দিষ্ট কিছু অঞ্চলে দেখা যায়। এই নতুন আবিষ্কারটি প্রজাতিটির সংরক্ষণ, আবাসস্থল নিয়ে গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ জরিপ কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
প্রকৃতির রহস্যময় ভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইয়ুননান প্রদেশ। সম্প্রতি এই অঞ্চলের সিয়াওহেইশান প্রকৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রে দেখা মিলেছে এক বিস্ময়কর উদ্ভিদের। যার নাম ‘হাবেনারিয়া প্লুরিফোলিয়া’। অত্যন্ত বিরল এবং বিপন্ন প্রজাতির এই বহুবর্ষজীবী অর্কিডটি বিজ্ঞানীদের মধ্যে নতুন আশার আলো সঞ্চার করেছে।
লংলিং কাউন্টির এই অভয়ারণ্যে প্রথমবারের মতো এই উদ্ভিদটির দেখা মিলল। পুরো এলাকা জুড়ে মাত্র ৪০টিরও কম নমুনা খুঁজে পেয়েছেন গবেষকরা।একটি হ্রদের আর্দ্র উপত্যকার তৃণভূমিতে দুটি নির্দিষ্ট স্থানে এদের জন্মাতে দেখা গেছে। প্রতিটি উদ্ভিদ লম্বায় ৭০ সেন্টিমিটারেরও বেশি, যা এদের অনন্য উচ্চতার জানান দেয়।
হাবেনারিয়া প্লুরিফোলিয়ার শারীরিক গঠন প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করার মতো, যার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এর একটি মাত্র গাছে ১০ থেকে ২৫টি পর্যন্ত সবুজ বা সবুজাভ-সাদা রঙের ফুল ফোটে। এই ফুলের উপরের দিকের পাপড়িগুলো কিছুটা বাঁকানো হওয়ায় তা দেখতে অনেকটা কাস্তে বা জিবের মতো মনে হয়। এছাড়া এর ফুলের কুঁড়িগুলো ড্রিল বিটের মতো ধারালো এবং ফলগুলো মাকু বা স্পিন্ডল আকৃতির হয়ে থাকে।
এই অর্কিডটি মূলত দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পশ্চিম চীনের ইয়ুননান, কুয়াংসি চুয়াং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল এবং কুইচৌ প্রদেশের একটি নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমায় সীমাবদ্ধ। অত্যন্ত সংকীর্ণ বিস্তৃতি হওয়ার কারণে এই আবিষ্কারটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গবেষকদের মতে, নতুন এই তথ্য ভবিষ্যতে এই প্রজাতির সংখ্যা জরিপ, আবাসস্থল গবেষণা এবং এটি রক্ষায় বিশেষ সংরক্ষণ ব্যবস্থা গ্রহণে সহায়ক হবে।
সিয়াওহেইশান প্রকৃতি সংরক্ষণ কেন্দ্রের এই নতুন অতিথি যেন মনে করিয়ে দিচ্ছে, পৃথিবী আজও তার গহীন অরণ্যে কতোশত দুষ্প্রাপ্য অমূল্য সম্পদ লুকিয়ে রেখেছে।
প্রতিবেদন: হোসনে মোবারক সৌরভ
সম্পাদনা: আল আমিন আজাদ
তথ্য ও ছবি: সিসিটিভি
প্রিয়শ্রোতা,
আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে বাসযোগ্য এবং প্রাণবন্ত করে তুলতে আমাদের প্রত্যেকেরই কিছু না কিছু দায়িত্ব রয়েছে। আসুন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমরা সবাই একসাথেই এগিয়ে আসি।
এখন শীতকাল। চারিদিকে কনকনে ঠাণ্ডা, কুয়াশা ভেজা সকাল আর প্রকৃতির শান্ত, স্নিগ্ধ রূপ। মাঠজুড়ে ফসল ওঠার পরের নীরবতা, আবার কোথাও কোথাও নতুন করে বোরো ধান বা রবিশস্যের বীজ বোনার প্রস্তুতি—এই সময় প্রকৃতি আমাদের মনে করিয়ে দেয় পরিবেশ সুরক্ষার গুরুত্ব।
শীতের প্রধান আকর্ষণ হলো পরিযায়ী পাখিদের আগমন। সুদূর সাইবেরিয়া এবং অন্যান্য ঠাণ্ডা অঞ্চল থেকে আসা এই পাখিরা আমাদের জলাশয়গুলোতে নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে ভিড় করে। তাদের নিরাপদ বাসস্থান নিশ্চিত করা এবং যেকোনো শিকারীর হাত থেকে রক্ষা করা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব।
আমাদের এই ছোট ছোট উদ্যোগগুলোই হতে পারে একটি টেকসই ভবিষ্যতের ভিত্তি।
আজকের মতো এই আহ্বান জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি আমি হোসনে মোবারক সৌরভ। আগামী সপ্তাহে আবারও কথা হবে, সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। চাই চিয়েন।
পরিকল্পনা, গ্রন্থনা, উপস্থাপনা ও অডিও সম্পাদনা: হোসনে মোবারক সৌরভ
সার্বিক সম্পাদনা: ইয়ু কুয়াং ইউয়ে আনন্দী
মানুষ ও প্রকৃতি ৮১
Stay Connected:
Our Editorial Standards
We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.
Fact-Checked
Every claim is verified by our editorial team before publication.
Expert Review
Content reviewed by subject matter experts for accuracy.
Regularly Updated
We update content to reflect the latest developments.
Unbiased Coverage
We present balanced perspectives and multiple viewpoints.