ই-রিটার্ন পোর্টালে প্রবেশ করে আগের করবর্ষের রিটার্ন জমা দেওয়ার অপশনে ক্লিক করতেই ৫ হাজার টাকা জরিমানা দেখাচ্ছে—এমন পরিস্থিতিতে পড়ে অনেক করদাতা দুশ্চিন্তায় পড়তে পারেন। বিশেষ করে যাঁদের করযোগ্য আয় নেই, নতুন টিআইএন (TIN) খুলেছেন কিংবা আগে কাগজে রিটার্ন জমা দিয়েছেন, তাঁদের মনে প্রশ্ন জাগছে, এই জরিমানা কি সত্যিই দিতে হবে? আয় না থাকলেও কি আয়কর রিটার্ন জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক?
এ বিষয়ে প্রথমেই মনে রাখা জরুরি, ই-রিটার্ন পোর্টালে জরিমানার অঙ্ক দেখালেই সেটি সবার জন্য প্রযোজ্য—এমন নয়। আবার করযোগ্য আয় না থাকলেই যে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকবে না, সেটিও সব ক্ষেত্রে সঠিক নয়। বিষয়টি নির্ভর করে সংশ্লিষ্ট করবর্ষে করদাতার অবস্থা, রিটার্ন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা এবং প্রযোজ্য আয়কর বিধানের ওপর।
তাই আতঙ্কিত হয়ে কাউকে টাকা দেওয়ার আগে নিজের কর-সংক্রান্ত তথ্য যাচাই করা এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) নির্দেশনা জানা প্রয়োজন।
ই-রিটার্নে ৫,০০০ টাকা জরিমানা কেন দেখাচ্ছে?
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের ই-রিটার্ন ব্যবস্থায় চলতি করবর্ষের পাশাপাশি আগের করবর্ষের রিটার্ন দাখিলের সুবিধাও থাকতে পারে। কোনো করদাতা আগের বছরের রিটার্ন দাখিলের অপশনে প্রবেশ করলে তাঁর ক্ষেত্রে বিলম্বজনিত জরিমানা বা অন্য কোনো প্রযোজ্য অর্থের তথ্য দেখা যেতে পারে।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬৬-এ রিটার্ন দাখিল না করার ক্ষেত্রে জরিমানার বিধান রয়েছে। তবে জরিমানার পরিমাণ ও প্রযোজ্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিস্থিতি এবং আইনের শর্ত বিবেচনা করা প্রয়োজন।
উদাহরণ হিসেবে, কোনো ব্যক্তি ২০২৫ বা ২০২৬ সালে প্রথমবার টিআইএন খুলে থাকলে তাঁর আগের করবর্ষগুলোর অবস্থা একজন পুরোনো টিআইএনধারীর মতো নাও হতে পারে। আবার আগে কাগজে রিটার্ন জমা দেওয়া ব্যক্তির তথ্য অনলাইন পোর্টালে না থাকলে বিষয়টি যাচাইয়ের প্রয়োজন হতে পারে।
সুতরাং, শুধু জরিমানার অঙ্ক দেখে অর্থ পরিশোধ করবেন না। কোন করবর্ষের জন্য জরিমানা দেখানো হচ্ছে, ওই বছরে আপনার রিটার্ন দেওয়ার বাধ্যবাধকতা ছিল কি না এবং পোর্টালে দেখানো তথ্য সঠিক কি না, তা নিশ্চিত হোন।
আয় না থাকলে কি আগের বছরের রিটার্ন দিতে হবে?
এর উত্তর সবার জন্য এক নয়। করযোগ্য আয় না থাকলেও কোনো ব্যক্তির নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে। অন্যদিকে, কোনো করবর্ষে রিটার্ন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল কি না, তা যাচাই না করে শুধু পোর্টালে জরিমানা দেখানোর ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়াও উচিত নয়।
১. নতুন টিআইএনধারীদের ক্ষেত্রে
আপনি যদি সম্প্রতি টিআইএন খুলে থাকেন, তাহলে প্রথমে জানতে হবে কোন করবর্ষ থেকে আপনার রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা শুরু হয়েছে।
টিআইএন খোলার তারিখ, সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আয় এবং রিটার্ন দাখিলের অন্যান্য আইনি শর্ত বিবেচনা না করে আগের বছরগুলোর রিটার্ন বা জরিমানা আপনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য বলে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
২. শিক্ষার্থী, গৃহিণী, বেকার ও কম আয়ের ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে
শিক্ষার্থী, গৃহিণী, বেকার কিংবা কম আয়ের ব্যক্তি হলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থেকে অব্যাহতি পাওয়া যায় না।
কারও আয় করমুক্ত সীমার নিচে থাকলেও নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণ, পেশাগত বা ব্যবসায়িক কার্যক্রম কিংবা আইনে উল্লেখিত অন্য কোনো কারণে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা থাকতে পারে।
তাই আপনার আয় নেই—এই তথ্যের পাশাপাশি টিআইএন খোলার কারণ এবং সংশ্লিষ্ট করবর্ষে আপনার ওপর রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ছিল কি না, সেটিও যাচাই করুন।
৩. আগে কাগজে রিটার্ন জমা দিয়ে থাকলে
আপনি যদি আগের কোনো করবর্ষে সরাসরি কর অফিসে গিয়ে কাগজে রিটার্ন জমা দিয়ে থাকেন, তাহলে সেই রিটার্নের প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বা জমা দেওয়ার অন্যান্য প্রমাণ সংরক্ষণ করুন।
অনলাইন পোর্টালে সংশ্লিষ্ট বছরের তথ্য দেখা না গেলে শুধু সে কারণে ধরে নেবেন না যে আপনার রিটার্ন জমা হয়নি। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট কর অফিস বা এনবিআরের সহায়তায় রেকর্ড যাচাই করুন।
কোন পরিস্থিতিতে পুরোনো রিটার্ন জমা দেওয়া জরুরি হতে পারে?
কোনো করবর্ষে আইন অনুযায়ী রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক থাকা সত্ত্বেও নির্ধারিত সময়ে রিটার্ন জমা না দিলে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি নিষ্পত্তি করতে হতে পারে।
যেমন—
- সংশ্লিষ্ট বছরে করদাতার রিটার্ন দাখিলের আইনি বাধ্যবাধকতা ছিল।
- করযোগ্য আয় থাকা সত্ত্বেও রিটার্ন দাখিল করা হয়নি।
- নির্দিষ্ট আইনগত শর্তে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র প্রয়োজন।
- ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বা অন্য কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে কর-সংক্রান্ত নথি জমা দিতে হবে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে আগের বছরের রিটার্ন জমা দেওয়ার নিয়ম, বিলম্বজনিত জরিমানা এবং অন্যান্য প্রযোজ্য বিধান যাচাই করতে হবে। তবে ব্যাংক লোন, ভিসা বা অন্য কোনো কাজে পুরোনো বছরের সনদ প্রয়োজন হলেই সব ক্ষেত্রে একই পরিমাণ জরিমানা দিতে হবে—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না।
আয় করমুক্ত সীমার নিচে হলে কি চলতি বছরের রিটার্ন দিতে হবে?
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে বুঝতে হবে—আয়কর পরিশোধ এবং আয়কর রিটার্ন দাখিল।
আয়কর পরিশোধের অর্থ হলো প্রযোজ্য বিধান অনুযায়ী সরকারকে কর দেওয়া। অন্যদিকে, রিটার্ন দাখিলের মাধ্যমে করদাতা তাঁর আয়, ব্যয়, সম্পদ, দায় এবং প্রাসঙ্গিক কর-সংক্রান্ত তথ্য জমা দেন।
সাধারণ করদাতার জন্য প্রযোজ্য করমুক্ত আয়সীমার নিচে আয় থাকলে সাধারণত আয়কর প্রদেয় নাও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা নেই—এমনটি নিশ্চিতভাবে বলা যায় না।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ১৬৬-সহ প্রাসঙ্গিক বিধান অনুযায়ী কারা রিটার্ন দাখিল করবেন, তা নির্ধারিত হয়। এ ছাড়া নির্দিষ্ট সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে রিটার্ন জমার প্রমাণপত্র বা পিএসআর (Proof of Submission of Return) প্রয়োজন হতে পারে।
উদাহরণ হিসেবে, নির্দিষ্ট শর্তে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংকিং সেবা, সঞ্চয়পত্র, জমি বা ফ্ল্যাট নিবন্ধন এবং অন্যান্য দাপ্তরিক কাজে রিটার্ন জমার প্রমাণ প্রয়োজন হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট সেবার বর্তমান আইনি শর্ত যাচাই করা জরুরি।
শূন্য আয় হলেও রিটার্ন জমা দেওয়ার সুবিধা কী?
আপনার ক্ষেত্রে রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হলে আয় না থাকলেও প্রকৃত তথ্য দিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। এতে করদাতার আয় ও আর্থিক অবস্থার তথ্য নথিভুক্ত থাকে এবং প্রয়োজনের সময় রিটার্ন জমার প্রমাণ দেখানো সহজ হয়।
শূন্য আয় দেখিয়ে রিটার্ন জমা দেওয়ার আগে অবশ্যই নিশ্চিত হতে হবে যে আয়, সম্পদ, বিনিয়োগ, ব্যয় ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। আয় না থাকলেই সব ঘরে শূন্য বসিয়ে দেওয়া সঠিক পদ্ধতি নয়।
শূন্য আয় বা কম আয় দেখিয়ে রিটার্ন জমা দিলেই ভবিষ্যতে সব ধরনের কর-সংক্রান্ত জটিলতা এড়ানো যাবে—এমন নিশ্চয়তাও নেই। রিটার্নের তথ্য বাস্তব অবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি।
টিআইএন বাতিল করা যায় কি?
যাঁদের আর টিআইএন প্রয়োজন নেই, তাঁরা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে টিআইএন নিবন্ধন বাতিলের জন্য আবেদন করতে পারেন। তবে শুধু কয়েক বছর শূন্য রিটার্ন জমা দিলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে টিআইএন বাতিল হয়ে যায়, এমন নয়।
আয়কর আইন, ২০২৩-এর ধারা ২৬২-সহ প্রাসঙ্গিক বিধান এবং এনবিআরের নির্দেশনা অনুযায়ী আবেদনকারীর যোগ্যতা ও অন্যান্য শর্ত যাচাই করা প্রয়োজন। টিআইএন বাতিলের আগে ভবিষ্যতে ব্যাংকিং, ব্যবসা, সম্পত্তি বা অন্য কোনো কাজে এর প্রয়োজন হতে পারে কি না, সেটিও বিবেচনা করুন।
ই-রিটার্নে জরিমানা দেখালে প্রতারণা থেকে যেভাবে সতর্ক থাকবেন
অনলাইনে কর-সংক্রান্ত তথ্য বুঝতে না পেরে অনেকেই অন্যের সহায়তা নেন। এই সুযোগে কেউ কেউ জরিমানা মওকুফ, পুরোনো রিটার্ন বাতিল বা মামলা থেকে বাঁচানোর নিশ্চয়তা দিয়ে টাকা চাইতে পারে।
এ ধরনের প্রস্তাব গ্রহণের আগে সতর্ক থাকুন।
- শুধু পোর্টালে জরিমানা দেখানোর কারণে আতঙ্কিত হবেন না।
- জরিমানা মওকুফ বা রিটার্নের সমস্যা সমাধানের নিশ্চয়তা দিয়ে কেউ টাকা চাইলে তাঁর দাবি যাচাই করুন।
- নিজের টিআইএন, পাসওয়ার্ড, ওটিপি ও ব্যাংকিং তথ্য অপরিচিত কাউকে দেবেন না।
- কোনো অর্থ পরিশোধের আগে সংশ্লিষ্ট করবর্ষের আইনগত অবস্থান নিশ্চিত করুন।
- প্রয়োজন হলে এনবিআরের অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা সংশ্লিষ্ট কর অফিসের মাধ্যমে তথ্য যাচাই করুন।
মনে রাখবেন, পোর্টালে দেখানো জরিমানার সঠিক কারণ যাচাই না করে সেটিকে সম্পূর্ণ ভুল বলা যেমন ঠিক নয়, তেমনি সেটিকে সবার জন্য বাধ্যতামূলক ধরে নেওয়াও ঠিক নয়।
এখন আপনার করণীয় কী?
ই-রিটার্নে আগের বছরের জন্য ৫ হাজার টাকা জরিমানা দেখালে নিচের পদক্ষেপগুলো অনুসরণ করুন।
প্রথমত, সংশ্লিষ্ট করবর্ষ যাচাই করুন। কোন বছরের জন্য জরিমানা দেখানো হচ্ছে, সেই বছর আপনার টিআইএন ছিল কি না এবং রিটার্ন দাখিলের বাধ্যবাধকতা ছিল কি না, তা নিশ্চিত করুন।
দ্বিতীয়ত, আগের রিটার্নের প্রমাণ খুঁজে দেখুন। কাগজে রিটার্ন জমা দিয়ে থাকলে প্রাপ্তিস্বীকারপত্র বা সংশ্লিষ্ট নথি সংগ্রহ করুন।
তৃতীয়ত, জরিমানার কারণ নিশ্চিত করুন। পোর্টালে দেখানো তথ্য অস্পষ্ট হলে সংশ্লিষ্ট কর অফিস বা এনবিআরের সহায়তা নিন। যাচাইয়ের আগে কোনো অর্থ পরিশোধ করবেন না।
চতুর্থত, চলতি করবর্ষের নিয়ম মেনে রিটার্ন জমা দিন। আপনার রিটার্ন দাখিল বাধ্যতামূলক হলে নির্ধারিত সময়সীমা ও প্রযোজ্য নিয়ম অনুসরণ করুন। জমা দেওয়ার পর প্রাপ্তিস্বীকারপত্র এবং প্রয়োজনীয় কর-সংক্রান্ত নথি সংরক্ষণ করুন।