সাকিব সিকান্দার, শায়ানসি (চীন): চীনের শায়ানসি প্রদেশ সফররত বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতাদের সপ্তম ও অষ্টম দিন কেটেছে ইতিহাস, সংস্কৃতি ও আধুনিক শিল্পের অভিজ্ঞতায়। চীনের ‘ব্রোঞ্জের শহর’ হিসেবে পরিচিত পাওচিতে ব্রোঞ্জ জাদুঘর ও ছিনছিয়াং অপেরা জাদুঘর পরিদর্শনের পাশাপাশি বিশ্বের আধুনিক গাড়ি উৎপাদন প্রযুক্তির অভিজ্ঞতা নেন তারা।
২৩ আগস্ট সকালে পাওচির শি কু উদ্যানে অবস্থিত পাওচি ব্রোঞ্জ জাদুঘর পরিদর্শনের মধ্য দিয়ে দিনের কার্যক্রম শুরু হয়। ব্রোঞ্জ নিদর্শনের বিশাল সংগ্রহের কারণে পাওচিকে বলা হয় ‘চীনের ব্রোঞ্জের শহর’। জাদুঘরটিতে ৪৮ হাজারেরও বেশি প্রত্নবস্তু সংরক্ষিত রয়েছে।
জাদুঘরের অন্যতম আকর্ষণ প্রাচীন ব্রোঞ্জপাত্র ‘হে জুন’। এতে খোদাই করা ‘চাই চি চুংকুও’ বাক্যাংশে ‘চুংকুও’ শব্দটির উল্লেখ পাওয়া যায়, যা ‘চীন’ নামটির প্রাচীনতম লিখিত নিদর্শনগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত।
জাদুঘর পরিদর্শন শেষে ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মহাসচিব মাইনুল হাসান বলেন, চীনের ব্রোঞ্জ শিল্প যে এত পুরোনো, তা দেখে তিনি বিস্মিত। পাশাপাশি হাজার বছরের পুরোনো নিদর্শনগুলো অত্যন্ত যত্নের সঙ্গে সংরক্ষণ করার বিষয়টিও তাকে মুগ্ধ করেছে। বাংলাদেশের প্রাচীন নিদর্শন সংরক্ষণে চীনের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পরে সাংবাদিক নেতারা পরিদর্শন করেন ছিনছিয়াং অপেরা জাদুঘর। উত্তর-পশ্চিম চীনের জাতীয় পর্যায়ের অবৈষয়িক সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য ছিনছিয়াংকে ‘পাংচি অপেরার আদিরূপ’ বলা হয়। জাদুঘরে বিভিন্ন সময়ের হাতে লেখা নাটকের পাণ্ডুলিপি, পোশাক, মুখোশ, পুরোনো রেকর্ড এবং মঞ্চসামগ্রী সংরক্ষিত রয়েছে।
বাংলাদেশ ফটো জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব বাবুল তালুকদার বলেন, ব্রোঞ্জ ও অপেরা জাদুঘরের সংরক্ষণব্যবস্থা তাকে অনুপ্রাণিত করেছে। অপেরার দীর্ঘ ইতিহাস সংরক্ষণের পাশাপাশি এর বিভিন্ন অঙ্গভঙ্গি ও পরিবেশনার ধরনও কাছ থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে বলে জানান তিনি।
পরদিন সাংবাদিক নেতারা পরিদর্শন করেন চিলি অটোমোবাইল পাওচি উৎপাদন কেন্দ্র। চিলি অটোমোবাইল গ্রুপের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের অন্যতম প্রধান স্মার্ট গাড়ি উৎপাদনকেন্দ্র এটি। প্রায় ৭২০ কোটি ইউয়ান বিনিয়োগে গড়ে ওঠা কারখানাটি এক হাজারেরও বেশি একর জমির ওপর স্থাপিত। দুই শিফটে বছরে প্রায় দুই লাখ গাড়ি উৎপাদনের সক্ষমতা রয়েছে কারখানাটির।
স্ট্যাম্পিং, ওয়েল্ডিং, রং করা ও চূড়ান্ত সংযোজন—এই চারটি প্রধান স্বয়ংক্রিয় উৎপাদন কর্মশালায় শিল্প রোবটের মাধ্যমে গাড়ি উৎপাদনের বিভিন্ন ধাপ সম্পন্ন করা হয়। এখানে প্রধানত পো ইউ এসইউভি এবং ইনহে নতুন জ্বালানির গাড়ি তৈরি হয়।
চীনের আধুনিক গাড়ি উৎপাদন প্রযুক্তি দেখে বাংলাদেশ প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কবি হাসান হাফিজ বলেন, অল্পসংখ্যক কর্মী দিয়ে বিশাল কর্মযজ্ঞ পরিচালনার বিষয়টি তাকে মুগ্ধ করেছে। চীনের এই ব্যবস্থাপনা ও প্রযুক্তি থেকে শিক্ষা নিয়ে বাংলাদেশও ভবিষ্যতে গাড়ি উৎপাদনের দিকে এগিয়ে যেতে পারে বলে মনে করেন তিনি।
টেকনোলজি মিডিয়া গিল্ডস বাংলাদেশের সহসভাপতি কাইয়ুম হাসান রিশাদ বলেন, বাজারে আসার আগেই নতুন গাড়িতে চড়ার সুযোগ পাওয়া তার জন্য ছিল দারুণ অভিজ্ঞতা। কারখানায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও রোবটের ব্যাপক ব্যবহার দেখে তিনি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেন। বাংলাদেশের শিল্পোন্নয়নে চীনের এসব প্রযুক্তি কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের নেতারা চীন সরকারের আমন্ত্রণে ১০ দিনের সফরে শায়ানসি প্রদেশে অবস্থান করছেন। প্রতিনিধি দলে রয়েছেন জাতীয় প্রেসক্লাবের সভাপতি ও কবি হাসান হাফিজ, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির মহাসচিব এবং দৈনিক ইনকিলাবের বিশেষ প্রতিবেদক মো. মাইনুল হাসান, বাংলাদেশ স্পোর্টস প্রেস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি ও চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের বিশেষ প্রতিবেদক রেজওয়ান উজ জামান এবং বাংলাদেশ ফটোজার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের মহাসচিব ও দৈনিক দিনকালের প্রধান ফটোসাংবাদিক বাবুল তালুকদারসহ অন্যরা।
সফরে তাদের সঙ্গে রয়েছেন চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)-এর বাংলা বিভাগের পরিচালক ইয়ু কুয়াংইউয়ে আনন্দী, সাংবাদিক আকাশ ও রুবি এবং ক্যামেরাম্যান ছি পেং।
এ সফরে শাংহাই আন্তর্জাতিক বিষয়ক গবেষণা একাডেমির মধ্যপ্রাচ্য গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক চিন লিয়াং সিযাং, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া গবেষণাকেন্দ্রের পরিচালক চৌ শি সিন এবং সমসাময়িক চীন ও বিশ্ব গবেষণা একাডেমির বৈদেশিক ভাষা উদ্ভাবন গবেষণা কেন্দ্রের পরিচালক চাং চিউ আনও সফরসঙ্গী হিসেবে রয়েছেন।
চীন সরকারের আমন্ত্রণে আয়োজিত এ সফরের তত্ত্বাবধানে রয়েছে চায়না মিডিয়া গ্রুপ (সিএমজি)। ‘চীন-বিদেশি প্রতিনিধি যৌথ সাক্ষাৎ আয়োজন’-এর অংশ হিসেবে ‘রোমিং চায়না, শায়ানসি ট্যুর’ শীর্ষক এ সফরের আয়োজন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে জ্ঞান, অভিজ্ঞতা, সংস্কৃতি ও ভাববিনিময় আরও জোরদার করাই এ ধরনের সফরের অন্যতম লক্ষ্য।
সূত্র: সিএমজি