Monday, June 15, 2026
Live
ফিচার
Verified
3 min read

তুষের হারিকেন থেকে দেশের বৃহত্তম হাঁসের বাচ্চার হ্যাচারি গ্রাম

হাঁসের বাচ্চা ফুটিয়ে স্বাবলম্বী সিরাজগঞ্জের মহেশরৌহালী গ্রাম

মাহফুজ রহমান
মাহফুজ রহমান ডেস্ক সম্পাদক
Published: Updated:
তুষের হারিকেন থেকে দেশের বৃহত্তম হাঁসের বাচ্চার হ্যাচারি গ্রাম

একসময় অবহেলিত ও দরিদ্র একটি গ্রাম ছিল সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ ইউনিয়নের মহেশরৌহালী। তবে ১৯৯৭ সালে একজন উদ্যোক্তার সাহসী উদ্যোগ বদলে দেয় পুরো গ্রামের অর্থনীতি। আজ এই গ্রাম পরিচিত দেশের অন্যতম বৃহৎ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন কেন্দ্র এবং হ্যাচারি শিল্পের সফল মডেল হিসেবে।

একটি উদ্ভাবন বদলে দিল পুরো গ্রামের ভাগ্য

১৯৯৭ সালের এক বিদ্যুৎহীন রাতে স্থানীয় বাসিন্দা শাহ আলম কৃত্রিম উপায়ে হাঁসের ডিম ফুটিয়ে বাচ্চা উৎপাদনের একটি নতুন পদ্ধতি নিয়ে পরীক্ষা শুরু করেন। হারিকেনের তাপ ও ধানের তুষ ব্যবহার করে তিনি সফলভাবে হাঁসের ডিম থেকে বাচ্চা ফোটাতে সক্ষম হন।

শাহ আলম জানান, শুরুটা ছিল অত্যন্ত কঠিন। তবে তার হাত ধরেই মহেশরৌহালী গ্রামে প্রথমবারের মতো তুষ পদ্ধতিতে হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে প্রযুক্তির উন্নয়নের সঙ্গে সঙ্গে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির জায়গা দখল করে আধুনিক বৈদ্যুতিক ইনকিউবেটর মেশিন, যা এই শিল্পে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনে দেয়।

প্রতিদিন উৎপাদন হচ্ছে ১২ থেকে ১৫ লাখ হাঁসের বাচ্চা

বর্তমানে মহেশরৌহালী গ্রামের প্রায় প্রতিটি পরিবার কোনো না কোনোভাবে হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন ও হ্যাচারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত। আধুনিক ইনকিউবেটরের মাধ্যমে প্রতিদিন এখানে প্রায় ১২ থেকে ১৫ লাখ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদিত হচ্ছে।

স্থানীয় উদ্যোক্তাদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ ঋণ সুবিধা পেলে উৎপাদন কয়েকগুণ বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে। ফলে দেশের হাঁস খামার খাত আরও সমৃদ্ধ হবে।

হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন ঘিরে বদলে গেছে গ্রামের অর্থনীতি

উপজেলা প্রাণিসম্পদ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হাঁসের বাচ্চা ফোটানোর ব্যবসা মহেশরৌহালীর অর্থনীতিতে নতুন প্রাণ সঞ্চার করেছে। একসময় যেখানে দারিদ্র্য ছিল নিত্যসঙ্গী, সেখানে এখন প্রায় শতভাগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়েছে।

গ্রামের নারী-পুরুষ সবাই ডিম সংগ্রহ, গ্রেডিং, ইনকিউবেটরে সংরক্ষণ, বাচ্চা ফোটানো এবং পরিচর্যার কাজে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। ফলে এই শিল্প গ্রামীণ নারীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুস সালাম জানান, গ্রামের প্রায় সব পরিবারই হাঁস পালন ও হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। বর্তমানে মহেশরৌহালী দেশব্যাপী “হাঁসের গ্রাম” হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এখানকার উৎপাদিত লাখ লাখ হাঁসের বাচ্চা দেশের বিভিন্ন জেলার খামারে সরবরাহ করা হয়।

দেশজুড়ে রয়েছে মহেশরৌহালীর হাঁসের বাচ্চার চাহিদা

হ্যাচারি মালিক জামাল উদ্দিন জানান, এই গ্রামে উৎপাদিত খাকি ক্যাম্পবেল, বেইজিং এবং ইন্ডিয়ান রানার জাতের হাঁসের বাচ্চার মান অত্যন্ত ভালো হওয়ায় দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।

প্রতিদিন কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল, নেত্রকোনা, সুনামগঞ্জ, সিলেট, বরিশাল এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকাররা বাচ্চা সংগ্রহ করতে আসেন। উৎপাদিত বাচ্চাগুলো বিশেষ খাঁচায় সংরক্ষণ করে বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হয়।

হ্যাচারি ব্যবসায় লাখ টাকার আয়

জামাল উদ্দিন প্রথমে মাত্র ৫০ হাজার টাকা বিনিয়োগ করে একটি ছোট ইনকিউবেটর স্থাপন করেন। পরবর্তীতে ব্যবসায় সফলতা পাওয়ার পর ৭ হাজার ও ১২ হাজার বাচ্চা উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বড় ইনকিউবেটর স্থাপন করেন, যার জন্য প্রায় ৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করতে হয়েছে।

বর্তমানে একটি হাঁসের বাচ্চা উৎপাদনে খরচ হয় ৩৫ থেকে ৪০ টাকা এবং বিক্রি হয় ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। প্রতি মাসে প্রায় ৩০ হাজার হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন করে তিনি সাড়ে ৩ লাখ টাকারও বেশি আয় করছেন। তবে ডিমের বাজারমূল্য অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে গেলে মাঝে মাঝে ব্যবসায়ীরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েন।

সরকারি সহায়তা পেলে আরও এগিয়ে যাবে হাঁসের হ্যাচারি শিল্প

জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. একেএম আনোয়ারুল হক জানান, মহেশরৌহালীর অধিকাংশ মানুষ হাঁসের বাচ্চা উৎপাদন শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। প্রাণিসম্পদ বিভাগ নিয়মিত প্রশিক্ষণ, পরামর্শ এবং ভ্যাকসিনসহ বিভিন্ন প্রযুক্তিগত সহায়তা প্রদান করছে।

তার মতে, স্বল্পসুদে ঋণ ও সরকারি সহায়তা নিশ্চিত করা গেলে মহেশরৌহালী দেশের বৃহত্তম হাঁসের হ্যাচারি হাব হিসেবে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করতে পারবে এবং গ্রামীণ অর্থনীতিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে।

Rate This Article

How would you rate this article?

মাহফুজ রহমান

মাহফুজ রহমান

ডেস্ক সম্পাদক

৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করছেন। তিনি মূলত শিক্ষাবিষয়ক এক্সপার্ট। তিনি লেখাপড়া, চাকরি বা ক্যারিয়ার, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত লেখালেকি ও সংবাদ সম্পাদনা করেন।

Our Editorial Standards

We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.

Fact-Checked

Every claim is verified by our editorial team before publication.

Expert Review

Content reviewed by subject matter experts for accuracy.

Regularly Updated

We update content to reflect the latest developments.

Unbiased Coverage

We present balanced perspectives and multiple viewpoints.