সাকিব সিকান্দার
বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, চীনের প্রস্তাবিত বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) শক্তিশালী প্রাণশক্তির পরিচয় দিচ্ছে। মধ্য এশিয়ার সঙ্গে পশ্চিমমুখী সহযোগিতা আরও গভীর হওয়া এবং দক্ষিণমুখী নতুন আন্তর্জাতিক স্থল-সমুদ্র বাণিজ্য করিডোরে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ দ্রুত বৃদ্ধির ফলে একটি অত্যন্ত সমন্বিত বাণিজ্যিক নেটওয়ার্ক গড়ে উঠছে।
পশ্চিমমুখী এই অগ্রযাত্রার ভিত্তি হলো চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে উচ্চমানের বিআরআই সহযোগিতা বাস্তবায়নের জন্য গৃহীত কর্মপরিকল্পনা। ২০২৫ সালের জুনে কাজাখস্তানের রাজধানী আস্তানায় অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় চীন-মধ্য এশিয়া শীর্ষ সম্মেলনে এই সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর করা হয়। এটি ছিল প্রথমবারের মতো কোনো প্রতিবেশী অঞ্চলের সব দেশের সঙ্গে চীনের একটি সমন্বিত বিআরআই সহযোগিতা দলিলে স্বাক্ষর।
ধারাবাহিক সমন্বয়ের মাধ্যমে চীন এবং মধ্য এশিয়ার পাঁচটি দেশ—কাজাখস্তান, কিরগিজস্তান, তাজিকিস্তান, উজবেকিস্তান ও তুর্কমেনিস্তান সম্মিলিতভাবে এই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার নতুন দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করছে।
চীন-মধ্য এশিয়া প্রক্রিয়ার সচিবালয়ের মহাসচিব সুন ওয়েইতোং বলেন, ‘চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলো মুক্ত বাণিজ্য এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে (ডব্লিউটিও) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে এবং উচ্চমানের বেল্ট অ্যান্ড রোড সহযোগিতা আরও গভীর করছে।‘
তিনি বলেন, ২০২৫ ও ২০২৬ সালকে ‘চীন-মধ্য এশিয়া সহযোগিতার উচ্চমানের উন্নয়নের বছর’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। এ সময়ে বাস্তবভিত্তিক সহযোগিতায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি দেখা গেছে। বাণিজ্য দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে, বিনিয়োগ বাড়ছে, বড় প্রকল্পগুলো স্থিরগতিতে এগিয়ে চলছে এবং কর্মপরিকল্পনায় নির্ধারিত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো সম্পূর্ণভাবে বাস্তবায়িত হয়েছে।
গত বছর চীন ও মধ্য এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যকার বাণিজ্যের মূল্য প্রথমবারের মতো ১০০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার অতিক্রম করে। দুই পক্ষের মধ্যে চলাচলকারী মালবাহী ট্রেনের সংখ্যা নতুন রেকর্ড গড়ে, চীন-মধ্য এশিয়া প্রাকৃতিক গ্যাস পাইপলাইন নির্বিঘ্নে পরিচালিত হয় এবং চীন-কিরগিজস্তান-উজবেকিস্তান রেলপথসহ আন্তঃসীমান্ত রেলপথ নির্মাণকাজ দ্রুত এগিয়ে যায়।
এই পশ্চিমমুখী সংযোগকে কার্যকরভাবে সম্পূরক করেছে দক্ষিণমুখী নতুন আন্তর্জাতিক স্থল-সমুদ্র বাণিজ্য করিডোরের সম্প্রসারণ। উভয় উদ্যোগ মিলিতভাবে ইউরেশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের (আসিয়ান) মধ্যে একটি সমন্বিত লজিস্টিক নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছে, যেখানে চীনের মধ্য ও পশ্চিমাঞ্চল গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকেন্দ্র হিসেবে কাজ করছে।
এই সমন্বয়ের ফলে দক্ষিণমুখী করিডোরে উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। চায়না রেলওয়ে নাননিং গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথমার্ধে এই করিডোর দিয়ে ৬ লাখ ৬০ হাজার টিইইউ (২০ ফুট সমমানের কনটেইনার) পণ্য পরিবহন করা হয়েছে, যা মাসে গড়ে ১ লাখ ১০ হাজার টিইইউ।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, দ্বিতীয় প্রান্তিকে পণ্য পরিবহনের পরিমাণ আগের প্রান্তিকের তুলনায় ৩ দশমিক ৬ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে, যা বাজারে ধারাবাহিক উচ্চ চাহিদার প্রতিফলন।
দক্ষিণ-পশ্চিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলবিজ্ঞান স্কুলের ডিন থাং ছিয়াং বলেন, বহুমাত্রিক পরিবহনব্যবস্থার উদ্ভাবনী ব্যবহার এই করিডোরে পণ্য পরিবহনের দক্ষতা বৃদ্ধি ও আরও বিস্তৃত পরিসরে পণ্য পরিবহনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে।
এই নিরবচ্ছিন্ন সংযোগ শিল্প সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। চলতি বছরে ছিনচৌ বন্দর পূর্ব স্টেশনের মাধ্যমে ৭২ হাজার টিইইউ কাঁচামাল আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোতে পাঠানো হয়েছে, যা আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৪৯ দশমিক ৪ শতাংশ বেশি। এর ফলে ছোংছিং এবং সিছুয়ান, ইউননান ও কুইচৌ প্রদেশের স্মার্ট উৎপাদনশিল্পের সরবরাহ শৃঙ্খল স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে।
চায়না রেলওয়ে নাননিং গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দক্ষিণমুখী এই করিডোরে পরিবহনযোগ্য পণ্যের ধরন বেড়ে ১ হাজার ৩৬২টিতে পৌঁছেছে। এটি চীনের ১৮টি প্রাদেশিক পর্যায়ের অঞ্চলের ৭৬টি শহরকে বিশ্বের ১২৮টি দেশ ও অঞ্চলের ৫৯৩টি বন্দরের সঙ্গে যুক্ত করেছে, যা বৈশ্বিক পরিসরে বিআরআইয়ের বিস্তারকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
সূত্র: সিএমজি