খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ব্যতিক্রমধর্মী পরিবেশ ছিল। এটি আওয়ামীলীগের সময়ে হওয়ার কারণে এখানকার অনেক শিক্ষক-কর্মকর্তা-কর্মচারী আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে জড়িত ছিল অথবা সমর্থক ছিল। ফলে অধিকাংশ শিক্ষার্থীরাই আওয়ামীলীগ বা তার অঙ্গ সংগঠন ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে জড়িয়ে পড়ে, সমর্থন জানাতে বাধ্য হয়।
জুলাইয়ে যখন কোটা বিরোধী আন্দোলন শুরু হয় তখন এরা ক্যাম্পাসের বাহিরে থাকলেও বিভিন্ন সময়ে অনলাইনের মাধ্যমে কোটা বিরোধী আন্দোলনের প্রতি সমর্থন জানায়। পাশাপাশি ক্যাম্পাসে অবস্থানরত অন্যান্য সহপাঠী ও জুনিয়রদেরকে কোটাবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতে মেসেজ দিয়ে, ফোন দিয়ে আহ্বান জানায়, উদ্বুদ্ধ করে, অরগানাইজড করে।
এমতাবস্থায় বিগত ১৪ই জুলাই যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর বিশেষ করে মেয়েদের উপর নিষিদ্ধ ঘোষিত ছাত্রলীগের সন্ত্রাসীরা বর্বর ও জঘন্য হামলা চালায় তখন সারা বাংলাদেশ প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের ফেটে পড়ে। ঐদিন রাতেই খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগের কয়েকজন হিতাকাঙ্খী তারাও এর প্রতিবাদ জানায়।
ফারজানা তরফদার নিশি সর্বপ্রথম ওই গ্রুপ থেকে লিভ নিয়ে সেটার স্কিনশর্ট নিয়ে ফেসবুকে ছড়িয়ে দেয়। এরপর দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী ছাত্রলীগের গ্রুপ থেকে লিভ নিয়ে তা প্রকাশ্য ফেসবুকে পোস্ট করে।
এরপর ১৫ই জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন খুলনার ব্যানারে তারা রাজপথের আন্দোলনে যোগদান করে। এদিন তারা দৌলতপুর বাসস্ট্যান্ড ও শিববাড়ি পর্যন্ত মিছিল নিয়ে আসে। এর মধ্যেই এরা শুনতে পায় যে ২-৩ জন শিক্ষক মিলে ছাত্রদেরকে ডেকে মিছিল ও আন্দোলনে যেতে নিষেধ করে। এমনকি আন্দোলনে গেলে তারা গুম হয়েও যেতে পারে। এজন্য নাকি অনেকের নাম লিস্টও করা হয়েছে। এত ভয়ভীতি প্রদর্শন করার পরও এরা দমে না গিয়ে জীবনবাজি রেখে আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়ে। পরের দিন ১৬ই জুলাই মিছিল নিয়ে দৌলতপুর থেকে পায়ে হেঁটে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে আসে। এসময় তারা নানা ধরনের স্লোগান দিতে থাকে। যেমন:
"তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার। কে বলেছে কে বলেছে, স্বৈরাচার স্বৈরাচার।"
"আমার সোনার বাংলায়, বৈষম্যের ঠাঁই নাই।"
খুলনা জিরো পয়েন্ট থেকে মিছিল নিয়ে সাচিবুনিয়া হয়ে গল্লামারি হয়ে আবার দৌলতপুর অস্থায়ী হলে চলে যায়। মিছিল থেকে ফিরে আবু সাঈদের শহীদ হওয়ার খবর জানতে পারে। সবার মধ্যে শোকের ছায়া নেমে আসে। ঐদিন রাতেই খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কোন প্রকার সিন্ডিকেট করা ব্যতীত সাবেক ভিসি এবং রেজিস্ট্রার সবাইকে হল ত্যাগের নোটিশ জারি করে। এতে শিক্ষার্থীরা ভীত এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। তারা কি করবে কিছু বুঝে ওঠার আগেই পরদিন সকাল বেলায় তাদেরকে জোর করে হল থেকে বের করে দেওয়া হয়।
হলের শিক্ষার্থীরা যখন প্রচন্ড গোলাগুলি ও অস্থিরতার মধ্যে তারা নিজ নিজ বাসায় পৌঁছায় তখন খুলনায় অবস্থানরত শিক্ষার্থীরা আন্দোলন চালিয়ে যায়। মাহদী হাসান সীন, আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী, সুমাইয়া আনসারী জোহানা, আসিফ শান্ত, সাইমা আক্তার সহ কয়েকজন কারফিউ ভেঙে নগরীর শিববাড়ি মোড়, ময়লাপোতা, মোড়, শহীদ হাদীস পার্কের সামনে, নিরালা মোড়, গল্লামারী মোড়, জিরো পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে ছোট বড় মিছিল, অবস্থান কর্মসূচি, স্লোগান ইত্যাদি চালিয়ে যায়। আর অন্যান্যরা নিজ নিজ এলাকায় কম বেশি আন্দোলনে করে।
১৮ই জুলাই মীর মুগ্ধ বুলেটের আঘাতে শহীদ হওয়ার পর খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ে অনুষ্ঠিত গায়েবানা জানাজায় অংশগ্রহণ করে। ২৮ জুলাই সন্ধ্যায় খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের খাজা গেট সংলগ্ন দেয়াল গ্রাফিতি অঙ্কন, মোমবাতি প্রজ্বলন, "শিকল-পরা ছল" নামক প্রতিবাদি গানে অংশগ্রহণ করে।
এভাবে অনলাইন অফলাইনে সবাই প্রতিবাদ চালিয়ে যায়। ৩০ শে জুলাই সবাই ফেসবুকে প্রোফাইল লাল করে দেয়।
খুলনায় সবথেকে ভয়াবহ দিন ছিল ২রা আগস্ট, রোজ শুক্রবার। এদিন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ্যালামনাই (১৯ ব্যাচের) ঘোষিত পূর্ব নির্ধারিত কর্মসূচি বাস্তবায়নের লক্ষ্যে নগরীর নিউমার্কেট বাইতুন নূর শপিং কমপ্লেক্সের সামনে বিকাল ৩ টায় অবস্থান কর্মসূচি এবং সেখান থেকে বিকাল ৪ টায় মিছিল নিয়ে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটে পৌঁছানো হয়।
মিছিল যখন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেট পৌঁছায় তখন বিনা উস্কানিতে ছাত্রদেরকে লক্ষ্য করে পুলিশ টিয়ারশেল, রাবার বুলেট, ছররা গুলি ইত্যাদি নিক্ষেপ করতে থাকে।
আন্দোলনের এক পর্যায়ে মাহদী হাসান সীন ও আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী আরো কয়েকজনকে নিয়ে দুই স্থানে (আবহাওয়া অফিসের সামনে ও গল্লামারী বধ্যভুমির সামনে) বড় বড় মেহগনি গাছ ফেলিয়ে রাস্তা ব্লকড করে দেয়। বৃষ্টির মধ্যে খুবির মেইন গেট পার্শ্ববর্তী ওভার ব্রিজের নীচে আসরের নামাজ জামাতে আদায় করে। সেখানে অবস্থান করে দেশাত্মবোধক নানা ধরনের গান গাইতে থাকে, প্রতিবাদ মূলক স্লোগান, ইত্যাদি দিতে থাকে।
এরপর যখন মিছিল গল্লামারি ব্রিজ হয়ে নগরীর ময়লা পাতার দিকে রওনা দেয় তখন মিছিলের দুই-তৃতীয়াংশ ব্রিজ পার হলে গল্লামারী মোড়ে পুলিশের টিয়ারশেল ও গুলি বর্ষণ শুরু হয়। এসময় মাহদী হাসান সীন পুলিশের গুলিতে আহত হলে পিছনে থাকা আহনাফ দ্রুতই তাকে ওখানে থেকে সড়িয়ে ব্রিজের ওপারে নিরাপদে নিয়ে যায়। সন্ধ্যার পর তারা বাসায় ফিরে যায়।
পরদিন আবারও সকাল ১০ টা থেকে বিকাল ৪ টা পর্যন্ত এরা দুজন একসাথে শিববাড়ি মোড় অবস্থান কর্মসূচি পানল করে।
৪ই আগস্টও সকাল থেকেই শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পানল করে। ৫ই আগস্টও একইভাবে কারফিউ ভেঙে সকাল থেকেই শিববাড়ি মোড়ে অবস্থান কর্মসূচি পানল করে। এসময় বিভিন্ন দেশাত্মবোধক গান গাইতে থাকে ও স্লোগানে মুখরিত রাখে চত্বর। স্বৈরাচার হাসিনা পলায়নের পর তারা বিজয় নিয়ে ঘরে ফিরে। এই ধারাবাহিকতায় ৬ আগস্ট শুরু হয় "খুকৃবি সংস্কার আন্দোলন-২৪"।
শিক্ষার্থীদের মধ্যে যারা সরাসরি খুলনার আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল : মাহদী হাসান সীন (শিক্ষার্থী প্রতিনিধি), আহনাফ তাহমিদ চৌধুরী (শিক্ষার্থী প্রতিনিধি), মাহমুদুল হাসান (ফেইসবুকে প্রাইভেট গ্রুপ খুলে আন্দোলনের বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কে সবাইকে আপডেট জানাতো এবং পরবর্তী কার্যক্রমের পরিকল্পনা সাজাতো), ইমন ইবনে তারিক, ফারাজানা তরফদার নিশি, আকবার আলী, আসিফ শান্ত, সাইমা আক্তার, ইসরাত জাহান, সুমাইয়া আনসারী জোহানা, মনিরুল ইসলাম সাকিব, স্বরন কুমার দাস, রাফিদুল ইসলাম, নাজমুস সাকিব, মনিশা আক্তার, গাজী তানভির, সুমাইয়া শিমু, সাফিউজ্জামান তোয়াশিন, আবরার মেসবাহ, আ'রাফ, ফুয়াদ, তানভীর সপ্নিল, জিহাদ, অতনু বিশ্বাস সহ আরো কয়েকজন।
- খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি