প্রাইমারি স্কুলের চাকরির বাস্তব চিত্র সম্পর্কে অনেকের ধারণা নেই। আড়াই বছর ধরে প্রাইমারিতে চাকরি করছি। নিজ অভিজ্ঞতা থেকে নতুনদের জন্য কিছু কথা লিখছি।
১. যাদের খুঁতখুঁতে স্বভাব, অল্পতেই রাগ ওঠে, চাপ নিতে পারেন না, তারা এই পেশায় আসবেন না।
২. যাদের প্রচণ্ড ইগো, তারাও এই পেশায় আসবেন না।
৩. যারা খুব বেশি মেধাবী, তাদেরও নিরুৎসাহিত করছি।
৪. যারা ভাবছেন, আপাতত ঢুকি, তারা আসবেন না। প্রাইমারির চেয়ারে এমন এক অদৃশ্য আঠা আছে, একবার বসলে ছেড়ে যাওয়া কঠিন। হ্যাঁ, অনেককেই দেখবেন অন্য চাকরিতে চলে গেছেন, তবে তার শতাংশ অনেক কম।
প্রাইমারির চাকরিটা হচ্ছে মন্দের ভালো। এটা কথিত সম্মানের, ক্ষমতাহীন, নিরীহ পেশা। আমার পরিচিত একজন আছেন, যিনি বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার। প্রথমে চাকরি করতেন বিদ্যুৎ বিভাগে, পরে গেলেন ব্যাংকে, শেষে এখন প্রাইমারির শিক্ষক। তিনি পেশাটাকে ভালোবাসেন।
আমার পরিচিত এক বড় ভাই/কলিগ ঢাবির দুটি বিষয়ে মাস্টার্স করেছেন, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট ও পোস্টগ্র্যাজুয়েট। পলিটিক্যাল সায়েন্স, আইআর, সোশ্যাল সায়েন্সে মাস্টার্স। শখ করে প্রাইমারিতে যোগ দিয়েছিলেন। অসম্ভব মেধাবী, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার যোগ্যতা রাখেন, অথচ আর বের হয়ে যেতে পারেননি।
প্রাইমারিতে আপনার পোস্টিং হবে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যন্ত অঞ্চলে। অধিকাংশ স্কুলেই পিয়ন নেই। ভাগ্য খারাপ থাকলে পতাকা উত্তোলন, স্কুল খোলা-বন্ধের দায়িত্ব, এমনকি টয়লেটও আপনাকেই পরিষ্কার করতে হবে।
প্রধান শিক্ষক ক্লাস নেবেন না, এসে সাইন করে চলে যাবেন। আপনার টানা ৭-৮টি ক্লাস নিতে হবে। আফসোস করবেন, লাভ নেই।
বাচ্চাদের ওপর প্রচণ্ড রাগ উঠবে, কিন্তু কিছুই বলতে পারবেন না। স্কুলে বাচ্চা কমে গেলে বাড়ি বাড়ি গিয়ে বাচ্চা আপনাকেই সংগ্রহ করতে হবে। প্রতি মাসে হোম ভিজিট, উপবৃত্তির কাজ, অনলাইন তথ্য হালনাগাদ, ভোট গ্রহণ, আদমশুমারি, খেলাধুলা পরিচালনা, পরীক্ষায় গার্ড, অফিসারদের প্রটোকল— এমনকি অতিথি এলে তাকে চা বানিয়ে, পান এনে আপনাকেই আপ্যায়ন করতে হবে।
পান থেকে চুন খসলে এলাকার পাতি নেতা আপনাকে লুঙ্গি তুলে দেখিয়ে যেতেও দ্বিধাবোধ করবে না। স্কুলের সামনের চায়ের দোকানদার, ভ্যানচালক, অটোরিকশাচালক— সবাই আপনার কাছ থেকে সালামের আশা করবে।
অফিসের চাপের কথা আর নাই-বা বললাম। আপনার বস প্রধান শিক্ষক, সহকারী শিক্ষা অফিসার, শিক্ষা অফিসার, স্কুলের সভাপতি, সকল সদস্য, এলাকার মাতব্বর, পাতি নেতা, অন্য অফিসের অফিসারসহ প্রায় সবাই। 

যত ধরনের ঝামেলা, জুনিয়র হিসেবে সব আপনার কাঁধে। আর যত ধরনের ট্রেনিং ও আর্থিক সুবিধা, সব ভোগ করবেন সিনিয়ররা। এভাবে পাঁচ বছর কাটিয়ে দিলে এসব আর আপনার পথে বাধা হবে না। আপনার সয়ে যাবে।
যা বললাম, একটি কথাও মিথ্যা নয়। মান-সম্মানের ভয়ে এসব কেউ আপনাকে বলবে না।
তারপরও দিন শেষে একটা চাকরি করতে হবে। একদমই যাদের অন্য কোনো আশা নেই, তারা আসতে পারেন।
শুভকামনা নিরন্তর।
— নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন শিক্ষক।