Tuesday, June 9, 2026
Live

চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক: ৭৫ বছরের অটুট বন্ধন ও প্রতিবেশীদের জন্য শিক্ষা

মাহফুজ রহমান
মাহফুজ রহমান ডেস্ক সম্পাদক
Published: Updated:
চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক: ৭৫ বছরের অটুট বন্ধন ও প্রতিবেশীদের জন্য শিক্ষা

৭৫ বছর আগে ১৯৫১ সালে যে কূটনৈতিক সম্পর্কের সূচনা হয়েছিল, তা আজ বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে দৃঢ় অংশীদারিত্বে পরিণত হয়েছে। চীন ও পাকিস্তানের এই বন্ধন সময়ের ঝড়েও টিকে আছে—জোট বদলেছে, সংঘাত হয়েছে, অর্থনীতি পাল্টেছে, তবু এই সম্পর্কে কোনো ফাটল ধরেনি। বর্তমান বিশ্বে যেখানে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ক্রমবর্ধমানভাবে স্বল্পমেয়াদী স্বার্থ এবং লেনদেনভিত্তিক হিসাব-নিকাশ দ্বারা পরিচালিত হয়, চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী আস্থা, কৌশলগত ধারাবাহিকতা এবং প্রকৃত বন্ধুত্বের বিরল দৃষ্টান্তগুলোর মধ্যে অন্যতম হয়ে আছে।

বিশ্ব যখন স্বার্থের হিসাবে সম্পর্ক গড়ে, তখন চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্ব আস্থা ও বিশ্বাসের এক বিরল দৃষ্টান্ত। পাকিস্তান ছিল গণচীনকে স্বীকৃতি দেওয়া প্রথম দেশগুলোর একটি। শীতল যুদ্ধের ভয়াবহ বিভাজনের সময় পাকিস্তান বেছে নিয়েছিল স্বাধীন কূটনীতির পথ। সেই সাহসী সিদ্ধান্তই আজকের এই অটুট বন্ধনের ভিত্তি। কয়েক দশক ধরে, উভয় দেশ বারবার প্রমাণ করেছে যে তাদের সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক লাভ বা সাময়িক ভূ-রাজনৈতিক সুবিধার ওপর ভিত্তি করে নয়, বরং একটি গভীর কৌশলগত ও আবেগিক সংযোগের ওপর ভিত্তি করে, যা প্রতিটি চ্যালেঞ্জের সাথে আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে।

ইতিহাসের প্রতিটি মোড়ে দুই দেশ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘ থেকে আন্তর্জাতিক মঞ্চ—সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তার প্রশ্নে চীন সবসময় পাকিস্তানকে সমর্থন দিয়েছে। পাকিস্তানও জাতিসংঘে চীনের ন্যায্য অধিকার ও একচীন নীতির পক্ষে সবসময় সোচ্চার ছিল। শীতল যুদ্ধে ইসলামাবাদই ছিল চীন-যুক্তরাষ্ট্র যোগাযোগের গোপন সেতু—যা প্রমাণ করে বেইজিং পাকিস্তানকে কতটা বিশ্বাস করত। উভয় দেশই গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলোতে ধারাবাহিকভাবে একে অপরকে সমর্থন করে এসেছে। সার্বভৌমত্ব, আঞ্চলিক অখণ্ডতা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা সম্পর্কিত বিষয়ে চীন সর্বদা পাকিস্তানকে কূটনৈতিক সমর্থন দিয়ে এসেছে। জাতিসংঘ বা অন্যান্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে, তীব্র কূটনৈতিক চাপের সময়ে বেইজিং বারবার ইসলামাবাদের পাশে দাঁড়িয়েছে।

যখনই পাকিস্তান তীব্র আর্থিক চাপ, বৈদেশিক মুদ্রা সংকট এবং অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মুখোমুখি হয়েছে, চীন বারবার আর্থিক সহায়তা, মুদ্রা সোয়াপ, বিনিয়োগ সমর্থন এবং অর্থনৈতিক সহযোগিতা নিয়ে এগিয়ে এসেছে—কোনো প্রকাশ্য চাপ বা রাজনৈতিক অপমান ছাড়াই। এটি চীনের পাকিস্তানের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা ও ভবিষ্যতের প্রতি যে আস্থা ও বিশ্বাস রাখে, তারই প্রতিফলন।

সাম্প্রতিক সময়ে চীন-পাকিস্তান অর্থনৈতিক করিডোর বা সিপিইসি এই সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছে। মহাসড়ক, বিদ্যুৎ প্রকল্প, গোয়াদর বন্দর থেকে শিল্প অঞ্চল—চীনা বিনিয়োগ পাকিস্তানের উন্নয়নে বড় ভূমিকা রাখছে। আর্থিক সংকটে যখন পাকিস্তান কঠিন সময় পার করছে, চীন নীরবে আর্থিক সহায়তা ও বিনিয়োগ নিয়ে এগিয়ে এসেছে—কোনো শর্ত বা অপমান ছাড়াই।

পাকিস্তানও চীনা স্বার্থ রক্ষায় জাতীয় দায়িত্ব হিসেবে কাজ করছে। শত্রুপক্ষ যতই দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতায় বাধা দেওয়ার চেষ্টা করুক, ইসলামাবাদ চীনা নাগরিক ও বিনিয়োগের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। সংস্কৃতি, শিক্ষা, প্রযুক্তি ও পর্যটন—দুই দেশের সম্পর্ক এখন শুধু রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

এই সম্পর্কের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর ধারাবাহিকতা। সরকার বদলেছে, বিশ্ব বদলেছে, কিন্তু ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের আস্থা একই আছে। ৭৫ বছর পর আজও এই বন্ধুত্ব প্রমাণ করছে—আস্থা, ধৈর্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা দিয়ে গড়া সম্পর্ক প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে। মেরুকৃত বিশ্বে চীন-পাকিস্তান বন্ধুত্ব এক উজ্জ্বল বার্তা—কিছু সম্পর্ক লাভ-ক্ষতির হিসাবে নয়, বিশ্বাস ও অভিন্ন ভাগ্যের ভিত্তিতে গড়ে ওঠে।

চীন-পাকিস্তান সম্পর্ক প্রমাণ করেছে যে, পারস্পরিক আস্থা ও বিশ্বাসের ভিত্তিতে গড়া সম্পর্ক সময়ের ঝড়েও টিকে থাকে। ৭৫ বছরে সরকার বদলেছে, বিশ্ব ব্যবস্থা পাল্টেছে, কিন্তু ইসলামাবাদ ও বেইজিংয়ের বিশ্বাস অক্ষুণ্ণ। প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য এটি সবচেয়ে বড় শিক্ষা — সম্পর্ককে লেনদেন নয়, বন্ধুত্ব হিসেবে দেখতে হবে। চীনের "প্রতিবেশীদের প্রতি সদয়, আন্তরিক, পারস্পরিক লাভজনক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক" কূটনৈতিক নীতি থেকেই চীন-পাকিস্তান সম্পর্কের এই সাফল্য এসেছে। চীনের অন্যান্য প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় শিক্ষা হলো — বিশ্বাস, ধৈর্য ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা দিয়ে গড়া সম্পর্কই প্রজন্মের পর প্রজন্ম টিকে থাকে।

গ্লোবাল টাইমস অবলম্বনে মোহাম্মদ তৌহিদ, সিএমজি বাংলা, বেইজিং।

Rate This Article

How would you rate this article?

মাহফুজ রহমান

মাহফুজ রহমান

ডেস্ক সম্পাদক

৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করছেন। তিনি মূলত শিক্ষাবিষয়ক এক্সপার্ট। তিনি লেখাপড়া, চাকরি বা ক্যারিয়ার, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত লেখালেকি ও সংবাদ সম্পাদনা করেন।

Our Editorial Standards

We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.

Fact-Checked

Every claim is verified by our editorial team before publication.

Expert Review

Content reviewed by subject matter experts for accuracy.

Regularly Updated

We update content to reflect the latest developments.

Unbiased Coverage

We present balanced perspectives and multiple viewpoints.