বিষণ্নতা চিকিৎসায় প্রথমবারের মতো কার্যকরী ও শক্তিশালী দুটি অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট থেরাপির একই ধরনের জৈব-প্রক্রিয়া উন্মোচন করেছেন চীনের গবেষকরা। তারা দেখিয়েছেন, উভয় চিকিৎসাই অ্যাডেনোসাইন সিগন্যালিং পথকে লক্ষ্য করে কাজ করে। এই আবিষ্কার শুধু দ্রুত-কার্যকর অ্যান্টিডিপ্রেসেন্টগুলোর রহস্য সমাধান করেনি, বরং নিরাপদ নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের পথও খুলে দিয়েছে। এ সংক্রান্ত একটি গবেষণার বিস্তারিত বিজ্ঞান সাময়িকী নেচারে প্রকাশিত হয়েছে।
গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন বেইজিংয়ে চায়নিজ ইনস্টিটিউট ফর ব্রেইন রিসার্চের অধ্যাপক লুও মিনমিন ও তার দল। নতুন ওষুধ তৈরির ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ সহযোগিতা করেছে চীনের বিজ্ঞান একাডেমির অধীনে থাকা ছাংছুন ইনস্টিটিউট অব অ্যাপ্লাইড কেমিস্ট্রির অধ্যাপক ওয়াং শিয়াওহুইয়ের গবেষণা দল। অন্যদিকে, গবেষণার জন্য অত্যাধুনিক 'মলিকুলার প্রোব' নামক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং কারিগরি সহায়তা দিয়েছে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক লি ইউলংয়ের দলসহ আরও কয়েকটি বিশেষায়িত গবেষণা গ্রুপ।
গবেষকদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী, কেটামিন এবং ইসিটি বর্তমানে প্রচলিত চিকিৎসায় গুরুতর বিষণ্ণতা রোগের জন্য সবচেয়ে কার্যকর পদ্ধতি। এই দুটি পদ্ধতিই সাধারণত কয়েক ঘণ্টার মধ্যে দ্রুত এবং শক্তিশালী উপশমমূলক প্রভাব দেখাতে সক্ষম। তবে, এতদিন ধরে এই চিকিৎসাগুলো ঠিক কীভাবে কাজ করে, সেই প্রক্রিয়াটি বিজ্ঞানীদের কাছে স্পষ্ট ছিল না। এর পাশাপাশি, হ্যালুসিনেশন এবং স্মৃতি বা অনুধাবন সংক্রান্ত সমস্যার মতো কিছু সম্ভাব্য পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি থাকায় এই কার্যকর থেরাপিগুলোর ব্যবহারও সীমিত রাখতে হয়।
দীর্ঘদিনের এই বৈজ্ঞানিক রহস্য সমাধানের জন্য অধ্যাপক লুওর নেতৃত্বাধীন গবেষকদল একটি বিশেষ এবং বহুমুখী কৌশল ব্যবহার করেছেন। তারা জেনেটিক্যালি এনকোডেড ফ্লুরোসেন্ট প্রোব নামক অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে প্রথমবার রিয়েল টাইমে পর্যবেক্ষণ করতে সক্ষম হন যে, কেটামিন এবং ইসিটি দুটোই মস্তিষ্কের যে অংশে আবেগ নিয়ন্ত্রিত হয় সেখানে অ্যাডেনোসিন নামক একটি রাসায়নিকের মাত্রা দ্রুত এবং দীর্ঘস্থায়ীভাবে বাড়িয়ে দেয়।
এতে প্রমাণিত হয়—অ্যাডেনোসিন সিগন্যালিং পথই দুই থেরাপির অভিন্ন ও মূল কার্যপ্রক্রিয়া। এই পথের কেন্দ্রীয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে দলটি জেনেটিক ও ওষুধভিত্তিক পরীক্ষা চালায়। তারা দেখান—মস্তিষ্কে অ্যাডেনোসিন সিগন্যালিং বন্ধ করলে কেটামিন এবং ইসিটির অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রভাব পুরোপুরি হারিয়ে যায়, বিপরীতভাবে, এই পথ সক্রিয় করলে শক্তিশালী অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রভাব তৈরি হয়। অধ্যাপক লুও ব্যাখ্যা করেন, ‘কেটামিন ও ইসিটি যেন একই পানির কল, শুধু দু’দিক থেকে ঘোরানো হচ্ছে।’
কোষের শক্তি উৎপাদন কমায় কেটামিন, আর স্নায়ুকোষের শক্তি ব্যয় বাড়ায় ইসিটি। দুটিই মস্তিষ্কে শক্তির ভারসাম্য বিঘ্নিত করে, যার ফলে কোষ থেকে ব্যাপক অ্যাডেনোসিন নিঃসরণ ঘটে এবং বিষণ্নতার লক্ষণ কমে। এ আবিষ্কারের ভিত্তিতে দলটি একটি নতুন কেটামিন ডেরিভেটিভ তৈরি করেছে, যা আরও কার্যকর এবং কম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াযুক্ত। প্রাণীর ওপর পরীক্ষায় দেখা গেছে, কম ডোজেই শক্তিশালী অ্যান্টিডিপ্রেসেন্ট প্রভাব পাওয়া গেছে এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে—যা ভবিষ্যৎ ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের জন্য অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। গবেষক লুও জানান, সংশ্লিষ্ট ক্ষুদ্র-মলিকিউলার ওষুধ এবং হাইপোক্সিয়াভিত্তিক ডিভাইসের জন্য ইতোমধ্যেই পেটেন্ট দাখিল করা হয়েছে।
ফয়সল/শুভ তথ্য ও ছবি: সিজিটিএন