লুৎফর কবির
এপ্রিল ২৮, ঢাকা: জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে কীভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি শহর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তা নিয়ে বাংলাদেশের মাঠে-ঘাটে ঘাম ঝড়াচ্ছে এক চীনা প্রতিষ্ঠান। চীনের সোলার প্যানেল প্রযুক্তির বদৌলতে ইতোমধ্যে সুফলও পাচ্ছে দেশীয় বড় বড় শিল্প কারখানা। ঢালাই ছাদের বদলে এখন বসছে আধুনিক সোলার প্যানেলের ছাদ। যা দিয়ে এক খরচে দুই কাজের সুফল মিলছে। প্রতিষ্ঠানটির কর্ণধার চীনা গণমাধ্যম সিএমজিকে একান্ত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, বৈদ্যুতিক গ্রিডের ওপর চাপ কমাতে সৌরশক্তির আধুনকি এ প্রযুক্তি ব্যবহারে উপকৃত হচ্ছে বাংলাদেশ। আর এটি আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দেওয়াই এখন তাদের মূল লক্ষ্য।
জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার যেভাবে বাড়ছে, তাতে সেই দিন হয়তো খুব বেশি দূরে নয় যখন এসব প্রাকৃতিক সম্পদ ফুরিয়ে আসবে। এ বিষয়টি মাথায় রেখে চীনের রাজধানী বেইজিং থেকে সর্বত্র নবায়নযোগ্য জ্বালানি অর্থাৎ সৌরশক্তিকে ব্যবহার করে বিশ্বে নজির স্থাপন করে যাচ্ছে দেশটি।
এই আধুনিক প্রযুক্তি বাংলাদেশে কীভাবে ছড়িয়ে দিয়ে বিদ্যুতের গ্রিডে চাপ কমানো যায়, সেই ভাবনা নিয়ে কাজ করছে চীনের একটি প্রতিষ্ঠান। আবাসিক ভবন থেকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং হাসপাতালের ছাদ— অনেক স্থাপনাতেই এখন চীনের সৌরপ্রযুক্তির ব্যবহার হচ্ছে। এর বিশেষত্ব হলো— সনাতন পদ্ধতির কংক্রিটের ছাদ ঢালাইয়ের পরিবর্তে এই সোলার প্যানেলই বিকল্প ছাদ হয়ে উঠতে পারে। ২০২১ সালে গড়ে ওঠা এ চীনা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ছাদের বিকল্প হিসেবে কীভাবে এই প্যানেল স্থাপন করা যায় তা নিয়ে কাজ করছে।
অনেকের ভাবনায় আসতে পারে, সোলারের ছাদ ভেঙে পড়ার পাশাপাশি পানি প্রবেশ করবে কিনা। এ সবকিছুর সমাধান টানা হয়েছে। এর জন্য মেইন ওয়াটার চ্যানেল এবং সাব ওয়াটার চ্যানেল বসানো হয়েছে, ফলে বৃষ্টির পানি প্রবেশের কোনো সুযোগ নেই। এই সোলার প্যানেল ২৫ বছরের বেশি সময় ধরে নিশ্চিন্তে ব্যবহার করা যাবে, এমনটাই জানান প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইভান ইউয়ান। অন্য দেশের তুলনায় এই প্রতিষ্ঠানের প্রযুক্তি ভিন্ন বলেও তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের মানুষ সোলার ব্যবহারের দিকে আরও ঝুঁকতে পারে, এতে তাদের জাতীয় বৈদ্যুতিক গ্রিডে চাপ কম পড়বে বলে আমি মনে করি। বাংলাদেশ জ্বালানির বেশিরভাগই বিপুল অর্থ দিয়ে মধ্যপ্রাচ্য থেকে আমদানি করে। এ ক্ষেত্রে সোলার প্রজেক্ট নবায়নযোগ্য জ্বালানি, এর খরচও কম। জনসংখ্যার তুলনায় বাংলাদেশে জায়গা কম থাকায় আমার মতে বাড়ির ছাদ হয়ে উঠতে পারে দারুণ এক জায়গা। যেকোনো ছাদে এটি ব্যবহার করা সম্ভব। এতে গরমও কম লাগবে।’
এই সোলারের পাশাপাশি তাদের তৈরি লিথিয়াম ব্যাটারিও অনেক শক্তিশালী এবং পরিবেশবান্ধব বলেও জানান তিনি।
‘অন্যান্য প্রযুক্তি যেখানে এক মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারছে, সেখানে আমাদের এই প্রযুক্তিতে দুই মেগাওয়াট করতে পারছে। যা অন্যান্য প্রযুক্তির চেয়ে দ্বিগুণ পরিমাণ বিদ্যুৎ দেবে।’
এদিকে, থ্রি বা ফোর-হুইলার গাড়িতেও চলছে সোলার বসানোর কাজ। রাজধানী ঢাকাসহ বৃহত্তর শহরে যেভাবে যানবাহনের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে সোলারের মাধ্যমে চার্জ হলে সেই শক্তিতেই চলবে গাড়ি। এক চার্জেই চলবে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা। এমনকি চীনের এই প্রতিষ্ঠানের নকশায় তৈরি থ্রি-হুইলারের বুয়েট থেকেও মিলেছে স্বীকৃতি, এমনটাই জানান প্রতিষ্ঠানটির জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক চঞ্চল বাহাদুর।
‘চীনের এ ধরনের উদ্যোগ বড় একটি পরিবর্তন আনবে। জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পুরোপুরি নবায়নযোগ্য চালু করা সম্ভব হবে। জেনারেটরে ব্যবহারের জন্য প্রতি বছর সরকারকে যে পরিমাণ ডিজেল বিদেশ থেকে আনতে হয় তা অনেক ব্যয়বহুল। সেখানে এই প্রযুক্তি দিয়ে গ্রিডের সহায়তা ছাড়াই বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে। আমাদের লক্ষ্য, এটিকে বিকল্প হিসেবে বাংলাদেশে দাঁড় করানো। এর মাধ্যমে চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কটা আরও এগিয়ে যাবে।’
চীনে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি শিল্পে রাষ্ট্রের বিপুল বিনিয়োগ তাদের জ্বালানি নিরাপত্তাকে শক্তিশালী করেছে। নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি ও রপ্তানি চীনকে বিশ্বমঞ্চে তার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বাড়ানোর সুযোগ করে দিয়েছে। চীনের এ প্রযুক্তি জ্বীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে প্রবেশে বড় ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: সিএমজি