জুন ৩০: জুনের শেষে, চীন বিদ্যুৎ নির্মাণ গ্রুপের (পাওয়ার চায়না) প্রধান দরজায় পা রাখলেন বাংলাদেশের একদল তরুণ মুখ। সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ও গণমাধ্যমসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রের ২২জন মেধাবী তরুণের সমন্বয়ে গঠিত এই প্রতিনিধি দল খুনমিং ও শাংহাই সফর শেষে বেইজিংয়ে এসেছেন। পাওয়ার চায়নার প্রদর্শনী কেন্দ্রে তাঁরা বাংলাদেশের দাশেরকান্দি স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও পাবনা সোলার প্ল্যান্টের বাস্তব ছবি দেখেছেন—চীনা উদ্যোগে নির্মিত এসব প্রকল্প তাঁদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত ও স্বজনসম।
"ঢাকায় থাকাকালীন আমি পাওয়ার চায়নার প্রকল্পগুলোর কথা শুনেছি, কিন্তু আজ জানতে পারলাম যে বাংলাদেশ ছাড়াও তারা বিশ্বের ছয়টি অঞ্চলে নিজেদের ব্যবসা বিস্তার করেছে, যা থেকে তাদের আন্তর্জাতিক সক্ষমতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে," বলেছেন প্রতিনিধি দলের সদস্য ও বাংলাদেশের সর্বাধিক প্রচারিত পত্রিকা দৈনিক প্রথম আলো-এর সাংবাদিক সানাউল্লাহ সাজিব।
পাওয়ার চায়না বাংলাদেশে ৩০ বছর ধরে কাজ করছে। তাঁরা নির্মিত দাশেরকান্দি স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট বাংলাদেশের প্রথম আধুনিক বৃহদাকার স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট এবং দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ একক স্যুয়ারেজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, যার দৈনিক পরিশোধন ক্ষমতা ৫ লাখ টন এবং প্রায় ৫০ লাখ স্থানীয় বাসিন্দা এর সুবিধাভোগী। ২০২২ সালে চালু হওয়ার পর থেকে এটি ৩৫ কোটি টনের বেশি বর্জ্য জল পরিশোধন করেছে। ২০২৪ সালে বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ের আন্দোলন চলাকালীন, চীনা ও বাংলাদেশি কর্মীরা যৌথভাবে "মূল কর্মী ধরে রাখা + স্থানীয় ব্যবস্থাপনা + দূরবর্তী সহায়তা" মডেল অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করেন, যা ঢাকাকে জনস্বাস্থ্য দুর্যোগ থেকে রক্ষা করে। এই অটল অবস্থানই ঢাকা ওয়াটার সাপ্লাই অ্যান্ড স্যুয়ারেজ অথরিটি (ওয়াসা)-কে পাওয়ার চায়নার সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি নবায়ন করতে উদ্বুদ্ধ করে—এটিই "বাংলাদেশের মাটিতে শিকড় গেথেঁ থাকা"-এর সবচেয়ে জীবন্ত প্রতীক।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও পাওয়ার চায়না সুদৃঢ় পদক্ষেপ নিয়েছে। কক্সবাজার ৬৬ মেগাওয়াট উইন্ড ফার্ম—বাংলাদেশের প্রথম বৃহদাকার কেন্দ্রীভূত উইন্ড ফার্ম—থেকে পাবনা ৬৪ মেগাওয়াট সোলার প্ল্যান্ট পর্যন্ত, পাওয়ার চায়না বাংলাদেশে মোট সোলার ইনস্টলেশন ক্ষমতা ১৬৪.৪ মেগাওয়াট-পিক অতিক্রম করেছে। পাবনা প্রকল্প চালু হওয়ার পর বার্ষিক প্রায় ১১ কোটি কিলোওয়াট-ঘণ্টা পরিচ্ছন্ন বিদ্যুৎ উৎপন্ন করবে, যা ৪৩ হাজার টন কয়লার সমতুল্য সাশ্রয় করবে এবং প্রায় ১.১ লাখ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড নির্গমন হ্রাস করবে।
বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফর দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে "নতুন যুগের চীন-বাংলাদেশ অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটিতে" উন্নীত করেছে এবং যৌথ ঘোষণায় স্পষ্টভাবে সবুজ জ্বালানি, সোলার ও পানিসম্পদ সমন্বিত ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা জোরদারে সম্মত হয়েছে। এটি উভয়পক্ষের সবুজ সহযোগিতার জন্য আরও বিস্তৃত সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
প্রথমত, নবায়নযোগ্য জ্বালানির পদ্ধতিগত গতি বৃদ্ধি। বাংলাদেশ ২০৩০ সালের মধ্যে নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের ২০%-এ উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। একটি সোলার প্ল্যান্ট থেকে ৫০০ মেগাওয়াটের নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প ক্লাস্টার পর্যন্ত, চীনা উদ্যোগগুলোর প্রযুক্তিগত সুবিধা বাংলাদেশের জ্বালানি রূপান্তর চাহিদার সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত হবে।
দ্বিতীয়ত, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার সম্পূর্ণ শৃঙ্খল গভীরতর করা। যৌথ ঘোষণায় উভয়পক্ষ পানিসম্পদ সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ ও নদী খননসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা গভীর করতে সম্মত হয়েছে। বর্জ্য জল পরিশোধন থেকে নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা পর্যন্ত, সহযোগিতা "বিন্দু" থেকে "ব্যাপ্তি"-তে সম্প্রসারিত হচ্ছে।
তৃতীয়ত, নির্মাণ থেকে রক্ষণাবেক্ষণ পর্যন্ত পূর্ণ জীবনচক্রে গভীরতম। দাশেরকান্দি স্যুয়েজ ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি নবায়ন ইঙ্গিত দেয় যে চীনা উদ্যোগগুলি "নির্মাণ শেষে চলে যাওয়া" থেকে "দীর্ঘমেয়াদি অবস্থান"-এ রূপান্তরিত হচ্ছে। পাওয়ার চায়না ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশে প্রবেশ করে, এখন পর্যন্ত ৪১টি প্রকল্প সম্পন্ন করেছে এবং ১৮টি নির্মাণাধীন রয়েছে—এই চক্র ও অস্থিরতা পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানই "ভাগ্যবদ্ধ সম্প্রদায়"-এর সবচেয়ে শক্ত ভিত্তি।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রভাবশালী থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সিনিয়র গবেষক ফখরুদ্দিন আল কবীর বলেন, "এই খাতে (নবায়নযোগ্য জ্বালানি) আমরা প্রচুর প্রযুক্তিগত সহায়তা ও বিদেশি বিনিয়োগ আশা করছি। তাই আমরা আশা করি চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং আরও শক্তিশালী হবে। এছাড়া, পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনা বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, যা আমাদের খাদ্য নিরাপত্তা ও কৃষি উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। এই ক্ষেত্রেও আমরা এখানকার উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের অত্যন্ত ইতিবাচক দেখছি। আমাদের সরকারের পক্ষ থেকেও ইতিবাচক মতামত পেয়েছি। আশা করি এই দুই ক্ষেত্রে আমাদের সহযোগিতা আরও জোরদার হবে।"
"পানি" থেকে "আলো" পর্যন্ত—চীনা উদ্যোগগুলি একের পর এক আদর্শ প্রকল্পের মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে সবুজ সহযোগিতা শুধু ফাঁপা স্লোগান নয়, বরং লক্ষাধিক মানুষের জীবন বদলে দেওয়া বাস্তব কাজ; এবং সুদৃঢ় অবস্থান স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য নয়, বরং চক্র ও অস্থিরতা পেরিয়ে দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। যখন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উচ্চগতি ট্রেন বেইজিংয়ে প্রবেশ করল, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্ক "অভিন্ন ভবিষ্যতের কমিউনিটি "-এর নতুন যুগে পা রেখেছে—এবং এই সবুজ সহযোগিতার পথটি সেই ট্রেনের মতোই স্থির, দ্রুত এবং দিকনির্দেশিত।
সূত্র: সিএমজি বাংলা