বিশ্বকাপের সবচেয়ে বড় সৌন্দর্যগুলোর একটি হলো—এখানে প্রায়ই জন্ম নেয় অসম্ভবকে সম্ভব করার গল্প। এবার ৪৮ দলের বিশ্বকাপ সেই সম্ভাবনাকে আরও বিস্তৃত করেছে। আর সেই মঞ্চেই নিজেদের নাম বিশ্ববাসীর কাছে নতুন করে পরিচিত করিয়ে দিল ক্যারিবীয় দ্বীপদেশ কুরাসাও।
২০২৩ সালের মার্চে আর্জেন্টিনার বিপক্ষে একটি প্রীতি ম্যাচ খেলেছিল কুরাসাও। তখনও অনেক ফুটবলপ্রেমী দেশটির নাম শুনেননি। মাত্র ১ লাখ ৫৮ হাজার জনসংখ্যার দেশটি এবার বিশ্বকাপে জায়গা করে নিয়ে ইতিহাস গড়েছে। আর হিউস্টনের রাত তাদের সেই ইতিহাসে যোগ করল আরও এক স্মরণীয় অধ্যায়।
হ্যাঁ, বিশ্বকাপ অভিষেকে জার্মানির কাছে ৭-১ গোলে হারতে হয়েছে কুরাসাওকে। কিন্তু স্কোরলাইনই এই ম্যাচের পুরো গল্প নয়।
চারবারের বিশ্বচ্যাম্পিয়ন জার্মানির বিপক্ষে একটি গোল—কুরাসাওয়ের জন্য সেটাই যেন ট্রফি জয়ের সমান। লিভানো কোমেনেনসিয়ার সেই গোল হয়তো শত বছর পরও স্মরণ করা হবে। কারণ বিশ্বকাপের মঞ্চে কুরাসাওয়ের প্রথম গোলের ইতিহাসে তাঁর নামই লেখা থাকবে সবার আগে।
অনেকের চোখে এটি ছিল বিশ্বকাপের অন্যতম অসম লড়াই। ফিফা র্যাঙ্কিংয়ে নবম স্থানে থাকা জার্মানির বিপক্ষে কুরাসাও পিছিয়ে ৭২ ধাপ। শক্তির পার্থক্য মাঠেও স্পষ্ট হয়েছে। তবে ম্যাচের ২১ মিনিটে যখন কোমেনেনসিয়ার শট জার্মান গোলরক্ষক ম্যানুয়েল নয়্যারকে পরাস্ত করে জালে জড়ায়, তখন মুহূর্তের জন্য থমকে যায় পুরো স্টেডিয়াম।
কুরাসাও সমতায় ফিরেছিল।
সেই আনন্দ অবশ্য বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। যেন ঘুম ভেঙে যায় জার্মানদের। এরপর একের পর এক আক্রমণে কুরাসাওয়ের রক্ষণভাগকে বিধ্বস্ত করে ইউলিয়ান নাগলসমানের দল।
ম্যাচের মাত্র ৬ মিনিটে ফেলিক্স এনমেচার গোলে এগিয়ে যায় জার্মানি। কুরাসাওয়ের সমতাসূচক গোলের পর নিকো শ্লটারবেক ও কাই হাভার্টজের গোলে বিরতিতে ৩-১ ব্যবধানে এগিয়ে যায় তারা। দ্বিতীয়ার্ধে জামাল মুসিয়ালা, নাথানিয়েল ব্রাউন, ডেনিজ উনদাভ এবং হাভার্টজের আরেক গোলে ব্যবধান দাঁড়ায় ৭-১।
স্কোরলাইনটি অনেকের মনে করিয়ে দিয়েছে ২০১৪ বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে ব্রাজিলের বিপক্ষে জার্মানির সেই ঐতিহাসিক ৭-১ জয়কে। বাংলাদেশি ফুটবলপ্রেমীদের ভাষায়—‘সেভেন আপ’।
তবে এই জয়ের গুরুত্ব জার্মানির জন্যও কম নয়। ২০১৪ সালে বিশ্বকাপ জয়ের পর টানা দুই আসরে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায় নিতে হয়েছে তাদের। তাই এবারের বিশ্বকাপ শুরুতেই এমন দাপুটে জয় দলটির আত্মবিশ্বাস বাড়াবে নিঃসন্দেহে। একই সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বীদের জন্যও এটি একটি সতর্কবার্তা—জার্মানি আবার নিজেদের খুঁজে পেতে শুরু করেছে।
অন্যদিকে, কুরাসাওয়ের জন্য এই ম্যাচ ছিল স্বপ্নপূরণের আরেক নাম। বিশ্বকাপে অংশগ্রহণই যেখানে জাতীয় উৎসব, সেখানে প্রথম ম্যাচেই জার্মানির জালে গোল করার আনন্দের মূল্য কোনো স্কোরলাইনে মাপা যায় না।
ম্যাচটি আরেকটি রেকর্ডের সাক্ষীও হয়েছে। কুরাসাও কোচ ডিক অ্যাডভোকাটের বয়স ৭৮ বছর, আর জার্মান কোচ ইউলিয়ান নাগলসমানের বয়স ৩৮। বিশ্বকাপের ইতিহাসে দুই প্রতিপক্ষ কোচের বয়সের ব্যবধান এত বেশি আগে কখনও ছিল না।
তবে শেষ বাঁশি বাজার পর বয়স, র্যাঙ্কিং কিংবা স্কোর—সব ব্যবধান যেন মিলিয়ে যায়। দুই দলের খেলোয়াড়দের একসঙ্গে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায় মাঠের মাঝখানে। তখন ফুটবলই হয়ে ওঠে সবচেয়ে বড় পরিচয়।
ইতিহাস হয়তো বলবে, জার্মানি ৭-১ গোলে জিতেছিল। পরিসংখ্যান বলবে, কুরাসাও সাত গোল হজম করেছিল। কিন্তু কুরাসাওবাসীরা হয়তো অন্য গল্পটাই মনে রাখবে—বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে, প্রথমবারের মতো, তারা গোল করেছিল।
আর সেই আনন্দ কেবল তারাই বুঝবে, যারা কোনো দিন এমন স্বপ্নের স্পর্শ পেয়েছে।