জুন ১৩: সম্প্রতি জাপানের লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), সেদেশের সাধারণ পরিষদ সভায়, সরকারের কাছে ‘তিনটি নিরাপত্তা দলিল’ সংশোধনে একটি খসড়া প্রস্তাব পাস করেছে। এটি ২০২২ সালের সংস্করণের ‘প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান’ থেকে ‘আক্রমণাত্মক অবস্থানে’ সরে আসার পর, জাপানের নিরাপত্তা কৌশলের আরেকটি চরম রূপান্তর।
এই খসড়ায় ‘স্বদেশ রক্ষা’-কে অজুহাত হিসেবে কাজে লাগিয়ে, সামরিক সম্প্রসারণকে বৈধতা দেওয়া চেষ্টা করা হয়েছে, যেখানে অস্ত্রশস্ত্র, বাজেট ও কৌশলগত সামরিক মোতায়েনের ওপর থেকে বিধিনিষেধ ব্যাপকভাবে শিথিল করা হয়েছে; সামরিক শক্তি বৃদ্ধির গতিকে দ্রুততর করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, জাপানের যুদ্ধ-পরবর্তী ‘একচেটিয়া প্রতিরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা’ নীতি অকার্যকর হয়ে পড়েছে এবং ‘নব্য সামরিকবাদ’ এই অঞ্চল ও বিশ্বের জন্য বাস্তব হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
জাপানের ‘তিনটি নিরাপত্তা দলিল’ (জাতীয় নিরাপত্তা কৌশল, জাতীয় প্রতিরক্ষা কৌশল, এবং মধ্যমেয়াদী প্রতিরক্ষা শক্তি বৃদ্ধি পরিকল্পনা) ২০২২ সালের শেষ দিকে পাস হয়েছে, যা নিরাপত্তা কৌশলে ‘শুধুমাত্র আত্মরক্ষামূলক প্রতিরক্ষা’ থেকে ‘পাল্টা আক্রমণের সক্ষমতা’ অর্জনে একটি পরিবর্তনকে চিহ্নিত করেছে। এর বিপরীতে, এলডিপি-র সাধারণ পরিষদ সভায় গৃহীত নতুন সংশোধিত খসড়াটি, দীর্ঘমেয়াদী প্রস্তুতি ও সক্রিয় হস্তক্ষেপকে লক্ষ্য করে তৈরি করা হয়েছে। এটি সামরিক সম্প্রসারণ ও প্রস্তুতিকে জাতীয় ব্যবস্থা, অর্থনীতি, শিল্প এবং জনমতে প্রোথিত করার চেষ্টা করছে, যার ফলে জাপানের নিরাপত্তা নীতি আরও আক্রমণাত্মক ও সম্প্রসারণবাদী দিকে ধাবিত হচ্ছে।
উদাহরণস্বরূপ, প্রতিরক্ষা বাজেটের ক্ষেত্রে, যদিও খসড়ায় নির্দিষ্ট পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি, তবে এতে ‘পাঁচ বছরের মধ্যে প্রতিরক্ষা শক্তির রূপান্তরের’ জন্য পর্যাপ্ত তহবিলের প্রয়োজন রয়েছে এবং ন্যাটোর রাষ্ট্র ও অস্ট্রেলিয়ার জন্য জিডিপির শতাংশ হিসাবে প্রতিরক্ষা ব্যয়ের বৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা তালিকাভুক্ত করা হয়েছে। এ থেকে বোঝা যায়, জিডিপির শতাংশ হিসাবে জাপানের প্রতিরক্ষা ব্যয় ৩ থেকে ৩.৫ শতাংশে বাড়তে পারে। ২০২৬ অর্থবর্ষে জাপানের প্রতিরক্ষা বাজেট ৯ ট্রিলিয়ন ইয়েন ছাড়িয়ে গেছে এবং ২০২৩ থেকে ২০২৭ অর্থবর্ষের জন্য মোট প্রতিরক্ষা ব্যয় ৪৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনে পৌঁছাবে।
সামরিক শক্তি উন্নয়নের ক্ষেত্রে, "স্বদেশ রক্ষার সংকল্প পূরণের" আড়ালে, খসড়ায় আক্রমণাত্মক সামরিক বাহিনী মোতায়েন করার উদ্দেশ্যে টেকসই যুদ্ধ সক্ষমতা তৈরির সুস্পষ্ট নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র বহনে সক্ষম নতুন সাবমেরিন আনা, দূরপাল্লার ক্রুজ ক্ষেপণাস্ত্র ও হাইপারসনিক অস্ত্র মোতায়েন করা, এবং একই সাথে ইলেকট্রনিক যুদ্ধ ও সাইবার যুদ্ধের মতো নতুন যুদ্ধ সক্ষমতা তৈরি করা।
আঞ্চলিক সামরিক মোতায়েনের ক্ষেত্রে, জাপান ক্রমাগত সামরিক পরিধি বাইরের দিকে প্রসারিত করছে এবং তার প্রতিরক্ষা পরিধিকে ব্যাপকভাবে পরিবর্তন করছে। খসড়ায় চীনের স্বাভাবিক সামরিক কার্যকলাপকে ভিত্তিহীনভাবে অভিযুক্ত ও কলঙ্কিত করা হয়েছে, যা এই অঞ্চলের উত্তেজনাকে বাড়িয়ে তুলেছে। এর লক্ষ্য হলো, জাপানের জনগণ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধোঁকা দেওয়া এবং "পুনঃসামরিকীকরণ" দ্রুততর করার জন্য অজুহাত তৈরি করা।
পারমাণবিক নীতির ব্যাপারে, যদিও খসড়ায় "তিনটি পারমাণুমুক্ত নীতি" সংশোধনের কথা উল্লেখ করা হয়নি, তবে এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, মার্কিন পারমাণবিক প্রতিরোধ ব্যবস্থার নির্ভরতা আরও নিশ্চিত করা হবে।
ইতিহাসের শিক্ষা এখনও আমাদের মনে তাজা। জাপান যখন ‘শান্তি’ এবং ‘প্রতিরক্ষা’ নিয়ে কথা বলছে, তখন প্রকৃতপক্ষে ‘পুনঃসামরিকীকরণের’ দিকে দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে। এটি শুধু ‘কায়রো ঘোষণা’, ‘পটসডাম ঘোষণা’ এবং ‘জাপানের আত্মসমর্পণ দলিলের’ মতো আন্তর্জাতিক আইনি দলিল লঙ্ঘন করে না, বরং যুদ্ধ-পরবর্তী আন্তর্জাতিক শৃঙ্খলাকে গুরুতরভাবে প্রভাবিত করছে এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলছে। শেষ পর্যন্ত এটি জাপানকেও বিপদে ফেলবে।
এলডিপির সাধারণ পরিষদ সভায় গৃহীত নতুন সংশোধিত খসড়া তাদের "পুনঃসামরিকীকরণের" পথে আরেকটি বিপজ্জনক সংকেত। জাপানি সামরিকবাদের পুনরুত্থান ঠেকাতে আন্তর্জাতিক সমাজকে অবশ্যই হাতে হাত মিলিয়ে পদক্ষেপ নিতে হবে। (সুবর্ণা/আলিম/আকাশ)