Wednesday, May 20, 2026
Live

ধ্রুব নীল-এর গল্প ধাঁধা: অসমাপ্ত গোধূলি

ধ্রুব নীল-এর গল্প ধাঁধা:  অসমাপ্ত গোধূলি
ধ্রুব নীল-এর গল্প ধাঁধা: অসমাপ্ত গোধূলি
Watch Video

এইমাত্র গোলকধাঁধার সমাধান করেছে যেন কাকটা। ঘাড় বাঁকিয়ে সপাটে ডানা ঝাপটে কাউকে বোঝাতে চাইল, শ্রীমঙ্গলের রাধানগর গ্রামের দত্তবাড়ির চৌহদ্দিতে অবচেতনে যে ঢুকে পড়বে, তাকেও বিষণ্নতা েজঁকে ধরবে। পুলিশের গাড়ি থামল শ্যাওলা-ফটকের সামনে। শরীরটাকে ধনুকের মতো বাঁকিয়ে ছুটে এলো বৃদ্ধ কেয়ারটেকার মেঘু।

দত্তবাড়িতে মৃত্যুসংবাদ। মারা গেছেন বাড়ির মালিক ষাটোর্ধ্ব হিমাংশু দত্ত। মেঘুর বয়সও এমন যে, বাড়ির লোক হিসেবে তার অস্তিত্ব স্বীকার করে নিতে কষ্ট হয়।

কাকভোরে দরজা খুলে ঝুলন্ত হিমাংশুকে দেখে সবার আগে আনারস বাগানের মালী সমির আলিকে খবর দেয় মেঘু। ঝাড়া কয়েক মুহূর্ত মূর্তি হয়ে থেকে আকাশ-পাতাল ভাবে সমির। তারপর চৌকির পাশে চেয়ার হাতড়ে মোবাইল ফোনটা নেয়। বাজারের পরিচিত এক মহাজনের মারফতে খবর যায় থানা পর্যন্ত।

আত্মহত্যাই মানানসই। এত বড় বাড়ি! এ কুলে ও কুলে কেউ নেই! সন্তানাদি আছে কি না কেউ জানেই না। তার ওপর টানা কয়েক দিন ম্যাড়মেড়ে বৃষ্টি, গতরাতে সে কী ঝড়বাদল! এমন ঝোড়ো বাতাসে আধপোড়া মোমবাতিটার মতো হিমাংশুও বোধহয় ঠিক করেছিলেন, এবার মুক্ত করে দেওয়া যাক প্রাণবায়ুটাকে।

কিন্তু বছরখানেক আগে শ্রীমঙ্গলে অশরীরী প্রাণীর মতো জুড়ে বসা ইন্সপেক্টর কালামের মনের রাডারে ধরা পড়তে শুরু করেছে বিচ্যুতি। বহুদিন পর আবার সেই গোয়েন্দাগিরির অ্যাড্রিনালিন স্রোত টের পেতে শুরু করেছে রক্তনালিতে।

জিব বের হয়ে থাকা বীভৎস লাশটা নামানোর ব্যবস্থা করা হচ্ছে। মেঘুর আধো আধো স্টেটমেন্টে কিছু কিছু কথাবার্তা এদিক-ওদিক হলেও মূল ভাবখানা ঠিক পথেই আছে।

মেঘুর সারকথাটা হলো—রাত আটটা-নটার দিকে বৃষ্টি কমলে হিমাংশুর কোনো এক ভাইয়ের ছেলে এসেছিল তার কাছে। বয়স হবে আনুমানিক পঁয়তাল্লিশ। এসেছিল ঢাকা থেকে। পুরনো দিনের অফিস কর্তাদের মতো হাতে একটা বাদামি ব্রিফকেস ছিল লোকটার। দলিল-দস্তাবেজই থাকে ওতে।

লোকটাকে আগে দেখেনি মেঘু। সে এই বাড়িতে থাকেওনি। আশপাশের কোনো এক রিসোর্টে উঠেছে। হিমাংশুর সঙ্গে কোনো বাগবিতণ্ডাও হয়নি। এমনকি রাতের খাবারের পর হিমাংশু তাদের দুজনের জন্য চা আনতে সমিরকে বাজারেও পাঠিয়েছিল। সমিরের আসতে দেরি হচ্ছিল দেখে হাসিমুখেই বেরিয়ে যায় ভাইপো।

রাত ১০টায় রাতের খাবার দিয়ে মেঘু চলে যায় বাড়ির পশ্চিম মাথার ঘরে। তখন চলে যায় বিদ্যুৎ। হিমাংশু ডাক দিতেই দৌড়ে গিয়ে প্যাকেট খুলে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে দিয়ে আসে মেঘু। তারপর ঝুঁকে ঝুঁকে হাজির হয় নিজের ডেরায়। ভেবেছিল স্নান করে শোবে। কিন্তু সাপ্লাইয়ের পানি ছিল না। অগত্যা বাইরের চা বাগানে হাঁটাহাঁটি করেই মন জুড়াল নিজের। প্রকৃতির মাঝেও যে এমন স্নান হয়, জানা ছিল না সাক্ষ্যগ্রহীতাদের।

ভোর ৬টায় হিমাংশুর নাশতা নিয়ে যায় মেঘু। আজ দিতে গিয়ে প্রথমে ঠাহর করতে পারেনি যে হিমাংশুর দেহটা ঝুলছে। মরদেহের পায়ের সঙ্গে গা লাগতেই ভয়ে এমন কেঁপে ওঠে যে হাত থেকে নাশতার ট্রে পড়ে যায়।
হিমাংশুর ভাইপোর খোঁজ পেয়েছে পুলিশ। দত্তবাড়ির পথে রওনা দিয়েছে সেও। পালিয়ে যাওয়ার লক্ষণ নেই।
ভাইপোর আসার ফাঁকে হিমাংশুর মৃত্যুকক্ষে আরেকবার চোখ বোলায় ইন্সপেক্টর কালাম। বনেদি বাড়িটায় পুরনো ধুলার গন্ধ থাকলেও ভারী দরজায় টিপ-লক, জানালায় থাই গ্লাস, ঘন কার্টেইন; আধুনিক বানানোর চেষ্টাগুলো চোখে লাগার মতো। আত্মহত্যা? নাহ, ইন্সপেক্টর ভাবে, এমন নির্ঝঞ্ঝাট শান্তির শহরে কয়েক জীবন তো অনায়াসেই কাটিয়ে দেওয়া যায়।

ছবি তোলার কাজ শেষ। লাশ নামানোর পালা। একসময় স্কাউটে ছিল ইন্সপেক্টর কালাম। ফাঁসের দড়িতে ক্লোভ হিচ নট দেখে এক পশলা ভেজা বাতাসের মতো বয়ে গেল শৈশবের স্মৃতি। তার কৃষক বাবা এভাবেই গিঁট দিয়ে বাগানের টমেটো গাছকে খুঁটিতে বেঁধে দিতেন।

সব পর্দা টানা ছিল। জানালাও ভেতর থেকে লাগানো। সকাল ৮টা বাজলেও তাই ঘুটঘুটে আঁধার। পুলিশই ঘরে ঢুকে সুইচ চাপে। ঝাড়বাতির আলোয় সিলিং ফ্যানে মোটা দড়িতে হিমাংশুর ঝুলন্ত দেহ দেখে দ্বিতীয়বার কেঁপে ওঠে মেঘু।
যে চেয়ারে দাঁড়িয়ে ঝুলে পড়েছিলেন হিমাংশু ওটা একপাশে হেলে পড়ে আছে সাক্ষীর মতো। ঘরে কয়েকটা শেলফ আর একটা নতুন কেনা সোফা। লেখালেখি আর পড়াশোনার টেবিলটা ঘরের আরেক প্রান্তে। তাতে পড়ে আছে আধজ্বলা মোমবাতি, চকচকে চায়ের কাপ, শূন্য ফ্লাস্ক আর খোলা নোটবুক। একপাশে পুরনো দিনের দোয়াত আর ফাউন্টেন পেন। হতে পারে নস্টালজিয়ায় ভুগছিলেন। খোলা নোটবইতে ওটা কি সুইসাইড নোট? বোঝা যায়, এককালে লেখালেখির বাতিকও ছিল তার—

‘পাহাড়ি কাকেরা বলে গেছে, বেলা শেষ হিমাংশু। লাল পাহাড়ের আড়ালে গোধূলি গোনার দিন ফুরলো। এবার যেতে হবে। কারও জন্য অপেক্ষা করিনি। তাই অপেক্ষার পালা শেষ হলো, তা বলতেও পারছি না। মিথ্যে বলব না, একবার নীলিমাকে দেখার...।’

খটকা লাগে ইন্সপেক্টর কালামের। অসমাপ্ত সুইসাইড নোট? এমনটা আগে দেখেনি।
সমির বলল, সে চা নিয়ে এসে দেখে হিমাংশুর ভাইপো নেই। মেঘুকে দেখেনি। উঁকি দিয়েছিল হিমাংশুর ঘরে। মোমের আলোয় টেবিলে বসে কাজ করছিল মনিব। আলগোছে টেবিলে চা রেখে চলে যায় বাগানের খুপরি ঘরে।

‘এটা সুইসাইড নয়, বুঝলে রমেশ?’

এসআই রমেশ মাথা ঝাঁকায়। জিজ্ঞেস করে না, কী করে বুঝলেন স্যার।

‘হয়তো সুইসাইডই করবেন ঠিক করেছিলেন, না হয় ওটা ছিল একটা কবিতা। খুনের মোটিভ থাকতেই পারে। সম্পত্তির মালিকানা, দেনা শোধ না করার চক্কর আবার ধরো গিয়ে এদিক-ওদিক কিছু জমি দখল কিংবা জমানো টাকাপয়সা হাপিস করে দেওয়া।’

বাড়িতে ঢুকল হিমাংশুর ভাইপো। ভাবলেশহীন। গতরাতে কী কথা হয়েছিল জানতে চাইলে গুছিয়ে জবাব দিল, ‘কাকা বলছিলেন সব ছেড়েছুড়ে চলে যাবেন। আমাকে সব সম্পত্তি বুঝিয়ে দিতে চাইলেন। কাগজপত্র সেভাবেই তৈরি করেছিলাম। কিন্তু এখন সব ভজকট পাকিয়ে গেল। কোথায় কী রেখেছেন কিছুই তো জানি না। তিনি মাঝে মাঝে বলতেন, জমিজিরেত কিনে এখানে থিতু হলেও লোকাল হয়ে উঠতে পারেননি। মাঝে মাঝেই ঝামেলার ইঙ্গিত পেতেন।’

হিমাংশুর মরদেহ পরখ করল ইন্সপেক্টর কালাম। গলায় দড়ি আটকে শ্বাসরোধেই মরেছেন। জবরদস্তির চিহ্ন নেই। কপালে কালো কালির দাগ। রেখার মতো লেপ্টে আছে।

উঠে দাঁড়াল ইন্সপেক্টর কালাম।

‘হুম। আর সন্দেহ নয়, এবার নিশ্চিত। রমেশ, হাতকড়ায় তো মরচে ধরে গেছে, একটু সরষের তেল মেখে নেবে নাকি?’

পাঠক,  গল্প পড়ে বলুন, ইন্সপেক্টর কালাম কী করে নিশ্চিত হলেন ঘটনা আত্মহত্যা নয়। সম্ভাব্য খুনি কে? কাকে কেন গ্রেপ্তারের নির্দেশ দিয়েছেন?

সূত্র: আগামীর সময়। দশচক্র (১৯ মে ২০২৬)

Rate This Article

How would you rate this article?

মাহফুজ রহমান

মাহফুজ রহমান

ডেস্ক সম্পাদক

৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করছেন।

Our Editorial Standards

We are committed to providing accurate, well-researched, and trustworthy content.

Fact-Checked

This article has been thoroughly fact-checked by our editorial team.

Expert Review

Reviewed by subject matter experts for accuracy and completeness.

Regularly Updated

We regularly update our content to ensure it remains current.

Unbiased Coverage

We strive to present balanced information.