ইয়ুননানের পাহাড়ি গা–ছোঁয়া ছোট্ট গ্রাম মাংবা। ভোরের আলো ফুটতেই এখানে বাজে এক অদ্ভুত অ্যালার্ম—কেউ যেন উঁচু স্বরে ঘোষণা করে, ‘জেগে ওঠো!’ ৫৪ বছর ধরে এ প্রতিবেশীর সঙ্গে দিন কাটাচ্ছেন গ্রামের বাসিন্দা ওয়াং ছেং।
এরা আর কেউ নয়, রঙিন পালকের ডার্বিয়ান প্যারাকিট—মাঝারি আকারের তোতা। হেসে–খেলে ওরা নিজেদের ঘর বানিয়েছে ওয়াংয়ের বাড়ির সামনের বিশাল বটগাছে। ডিসেম্বর থেকে জানুয়ারি এদের মিলনের মৌসুম। এ সময় দিনভর চেঁচামেচি, যেন গ্রামজুড়ে চলে তোতাদের সংগীত উৎসব। মানুষেরা প্রথমে বিরক্ত হলেও এখন সবাই অভ্যস্ত। বরং এসব ডানাওয়ালা বাসিন্দারাই এ গ্রামে এনে দিয়েছে সৌভাগ্য।
মাত্র ২৫০ মানুষের ব্লাং জাতিগোষ্ঠীর গ্রামটিতে থাকে প্রায় ৩০০ ডার্বিয়ান প্যারাকিট। পাখিগুলো আন্তর্জাতিক সংস্থার তালিকায় সঙ্কটাপন্ন প্রজাতি। পাখিপ্রেমী, ফটোগ্রাফার আর প্রকৃতিবিদেরা তাদের দেখা পেতে ছুটে আসে দূর–দূরান্ত থেকে।
গ্রামজুড়ে ছড়িয়ে–ছিটিয়ে থাকা ৩৬টি বিশাল বটগাছ—তোতাদের পাকা ঠিকানা। দিনভর তারা নুওচাতু প্রাকৃতিক সংরক্ষণ এলাকায় খাবার খুঁজে বেড়ায়, আর সন্ধ্যায় দলে দলে ফিরে আসে গ্রামে।
ওয়াং বলেন, ‘এ তোতাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক আত্মীয়তার চেয়েও ঘন। বটগাছ আর পাখি দুটোই আমাদের কাছে পবিত্র।’ তোতারা মানুষের ক্ষতি করে না। ভুট্টা খায় না, মাঠ নষ্ট করে না। ক্ষুধা পেলে খায় পাইন–বীজ, বনফুল আর বটের ফল। তৃষ্ণা পেলে উড়ে যায় লানচাং নদীতে।
প্রজনন মৌসুমে মাঝেমধ্যে গাছ থেকে পড়ে যায় শিশু তোতা। ওয়াং নিজের সন্তানদের মতো লালন করেন—ভাত চিবিয়ে খাওয়ানো, দেখাশোনা—সবই করেন তিনি আর তার স্ত্রী। বড় হলে আবার ছেড়ে দেন বনে। ওয়াং বলেন, ‘ওরা যখন ঘাড় ঘুরিয়ে ডাকে, তখন মনে হয় ওরা আমাকে ধন্যবাদ জানাচ্ছে।’
কর্তৃপক্ষও গ্রামবাসীদের পাশে দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ইউয়ানের প্রকল্প নিয়ে। নতুন করে লাগানো হচ্ছে ৫০০ গাছ। তোতাদের জন্য তৈরি করা হচ্ছে ১৪ মিটার উঁচু কৃত্রিম বাসাস্থান।
২০০৮ সালে দুই ছাত্রের মাধ্যমে গ্রামটির খবর ছড়ায়। ওয়াং নির্মাণ করেন প্রথম বার্ড হাইড—ছদ্মবেশি পর্যবেক্ষণকুটির। এখন গ্রামে মোট ১৫টি হাইড, আর ভিড় লেগে থাকে।
ওয়াংয়ের নিজের হাইডেই দিনে দেখা মেলে ৩০ প্রজাতির পাখির।
তিনি বানিয়েছেন তিনতলা অতিথিশালা—২৩ জনের থাকার ব্যবস্থা। সেখানে দাঁড়িয়েই চোখের সামনে ২০ মিটার দূরে তোতাদের উড়ে বেড়ানো দেখা যায়।
একদিনের থাকার খরচ ১৫০ ইউয়ান। কৃষিকাজে বছরে ২০ হাজার ইউয়ান আয় হলেও পাখিদর্শনে আসে ১ লাখ ইউয়ান—আয় বেড়েছে পাঁচগুণ।
এখন বছরে ১২ হাজার দর্শনার্থী আসে মাংবায়; আয় ৪০ লাখ ইউয়ান ছুঁয়েছে। ওয়াং বললেন, ‘একসময় তোতাদের ডাকেই ঘুম ভাঙত আর কাজ শেষ হতো। ভাবিনি, সেই ডাকই একদিন আমাদের রুজির ডাক হয়ে উঠবে!’
ফয়সল আবদুল্লাহ
সূত্র: সিএমজি