এপ্রিল ১৮, সিএমজি বাংলা ডেস্ক: গত গ্রীষ্মের কথা। ফুটবল খেলার বেজায় ভক্ত চীনের হুবেই প্রদেশের হুয়াংশি শহরের দমকলকর্মী শি ফেং। তিনি চিয়াংসু প্রদেশে অনুষ্ঠিত এক অপেশাদার ফুটবল লিগের খেলা দেখতে ৫০০ কিলোমিটার পাড়ি দিলেন। ফিরে এসে স্বপ্নবান হয়ে উঠলেন এই ভেবে যে, হয়তো একদিন হুবেই প্রদেশেরও এমন নিজস্ব টুর্নামেন্ট চালু হবে।
সাম্প্রতিক ঘটনায় আসা যাক। হুয়াংশি অলিম্পিক স্পোর্টস সেন্টারে হুবেইয়ের প্রথম সিটি ফুটবল লিগ অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। সেখানে উপস্থিত হয়েছেন ২৭ হাজার ভক্ত। হুয়াংশি দলের কর্মী হিসেবে পিচের এক কোনায় দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই শি, যিনি স্বপ্নটাকে নিজের চোখে সত্যি হতে দেখছেন।
চারদিকে যখন বসন্তের আগমনী বার্তা, তখন চীন যেন নিজস্ব এক ফুটবল মৌসুমে প্রবেশ করতে চলেছে। তৃণমূল পর্যায়ের লিগগুলোতে ভিড় বাড়ছে, স্পন্সর আসছে যা নাগরিকদের জন্য ক্রমেই গর্বের বিষয় হয়ে উঠছে। এসব স্থানীয় টুর্নামেন্ট রীতিমতো এক জাতীয় পর্যায়ের বড় ঘটনায় পরিণত হচ্ছে।
অবসর বিনোদন থেকে জাতীয় উন্মাদনা
চিয়াংসুর অপেশাদার টুর্নামেন্ট ‘সু সুপার লিগ’-এ প্রদেশটির ১৩টি শহরের ফুটবল দল যখন অংশগ্রহণ করলো, তখন তা নিমিষেই জাতীয় সেনসেশনে পরিণত হলো। এই টুর্নামেন্টের বদৌলতেই চীনের তূণমূল ফুটবল গমগমে হয়ে ওঠে। এর উদ্বোধনী মৌসুম ব্যাপক মনোযোগ কাড়ে। মোট ৭৮টি নিয়মিত-মৌসুম ম্যাচ এবং সাতটি নকআউট পর্ব ২০০ কোটি লাইভস্ট্রিম ভিউয়ের মাইলফলক স্পর্শ করে। যেখানে এ সংক্রান্ত ঘটনাগুলো ডিজিটাল প্লাটফর্মে ৮০ বিলিয়ন ভিউ হয়। ‘সু সুপার লিগ’-এর দ্বিতীয় মৌসুম শুরু হয় ১১ এপ্রিল, যা আরেকটি টানটান উত্তেজনাময় ক্যাম্পেইন উপহার দিয়েছ ফুটবলপ্রেমীদের।
এদিকে, ফেব্রুয়ারিতে দক্ষিণ-পূর্ব চীনের ফুচিয়ান প্রদেশ তাদের নিজস্ব ‘মিন সুপার লিগ’-এর ঘোষণা দেয়। প্রদেশের রাজধানী ফুচৌয়ে স্থানীয় সমর্থকদের ৩০০ সদস্যের এক সংগঠন বিগত মাসগুলোতে চার হাজারের বড় অবয়বে পৌঁছে গেছে।
এই উন্মাদনা চীনজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হুয়াংশিতে ১২ এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয় হুবেইয়ের ‘ছু সুপার লিগ’, যার নামকরণ হয় প্রদেশটির প্রাচীন ছু সংস্কৃতি অনুসরণে।
শি বলেন, ‘আমি যখন তরুণ ছিলাম তখন এমন এক ফুটবল আয়োজনের স্বপ্ন দেখতাম যা কিনা সবাই উপভোগ করবে। পিচের পাশে দাঁড়িয়ে থাকাটা স্বপ্ন সত্যি হওয়ার মতোই অনুভূত হয়।‘
ম্যাচের চেয়েও বড় কিছু
‘ছু সুপার লিগ’ চলবে এপ্রিল থেকে নভেম্বর পর্যন্ত। এর ১৪৬টি ম্যাচের সময়সূচি নির্ধারণ হয়েছে সপ্তাহের ছুটির দিনগুলোতে। কোনো খেলা শুরুর বাঁশি বাজার অনেক আগ থেকেই প্রদেশজুড়ে বিভিন্ন শহরের চেহারাই যেন বদলে যেতে থাকে।
গত গ্রীষ্ম থেকেই কয়েকটি পৌরসভা বিভিন্ন স্টেডিয়াম সংস্কারের কাজ সম্পন্ন করেছে। সেখানে বসেছে ফ্লাডলাইট। আবার অনেক স্কুলের মাঠকেও নিয়ন্ত্রণ ভেন্যু হিসেবে রূপান্তর করা হয়েছে। আয়োজকদের কাছে এইসব টুর্নামেন্ট প্রতিযোগিতার চেয়েও বেশিকিছু।
হুবেইয়ের ফুটবল ব্যবস্থাপনা কেন্দ্রের পরিচালক সিয়া চিং বলেন, ‘আমরা আশা করছি এই লিগ বিনিয়োগকে উৎসাহ যোগাবে, আরও বেশি সংখ্যক মানুষকে ফুটবলের মাঠে নিয়ে আসবে এবং মেধাবী খেলোয়াড়রা বেরিয়ে আসবেন।‘
বাজারে এসব আয়োজন প্রত্যাশাকেও ছাপিয়ে গেছে। যেন সবাই উপভোগ করতে পারেন সে কথা বিবেচনা করে উদ্বোধনী ম্যাচে টিকিটের মূল্য ধরা হয়েছিল ৯ দশমিক ৯ ইউয়ান। তিনটি পর্যায়ে ২৭ হাজার টিকিট ছাড়া হয়েছিল। টিকিট ছাড়ার পর ৯ হাজার বিক্রি হয়ে যায় প্রথম ২০ মিনিটে। দ্বিতীয় পর্যায়ের টিকিট বিক্রি হয়ে যায় মাত্র ৫ মিনিটে। আর তৃতীয় পর্যায়ে ছাড়া টিকিট হাওয়া হয়ে যায় ৩ মিনিটের মাথায়।
বৃহৎ পরিসরে উচ্চাকাঙ্ক্ষা
ফুটবলপ্রেমে এই বিস্ফোরণ স্থানীয় বাণিজ্যেও বড় মাপের মুনাফার সন্ধান দিচ্ছে। উদ্বোধনকে সামনে রেখে হুয়াংশি ১০৬ জন আবেদনকারীর মধ্যে থেকে ২০ জন অনুমোদিত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীকে বাছাই করে নেয়। তারা খাবার, খুচরা ও সাংস্কৃতিক বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করবে। সাধারণ স্থানীয় একটি বার-বি-কিউ রেস্তোরাঁর প্রতিদিনের আয় ২০ হাজার ইউয়ানের কিছু বেশি হয়। কিন্তু উদ্বোধনী সপ্তাহে এই আয় দিনে ৩০ হাজার ইউয়ান ছাড়িয়ে যায়।
রেস্টুরেন্টের মালিক শি ওয়েনচুন বলেন, ‘আমি কখনোই এটা আশা করিনি। আমি ভাবিনি এই শু সুপার লিগ আমার ছোট দোকানটাকে এতটা ব্যস্ত করে তুলবে।‘
ফুটবলপ্রেমীদের জন্য ১০ হাজার বাটি মাছের স্যুপ বিনামূল্যে দেওয়ার প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে হুয়াংশি কৃষি উন্নয়ন গ্রুপ। এ গ্রুপের মহা ব্যবস্থাপক লি ছোংইয়ু বলেন, ‘মানুষের এই উপস্থিতি আমার প্রত্যাশাকেও ছাড়িয়ে গেছে। আমাদের স্যুপ প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল।‘
আয়োজকদের তথ্যমতে, কেবল উদ্বোধনকে ঘিরেই সরাসরি দুই দশমিক ২২ মিলিয়ন ইউয়ান নগদ খরচ করা হয়েছে। আর আয়োজক শহর হিসেবে বৃহৎ পরিসরে ২০ মিলিয়ন ইউয়ানের বাণিজ্য হয়েছে।
আরেকটি বিষয় হলো, বিজয়ী দলের ট্রফির পাশাপাশি আয়োজকরা অর্থনৈতিক অবদান এবং ক্রীড়া-পর্যটনের সমন্বয় বিষয়ক পুরস্কারেরও ব্যবস্থা রেখেছেন।
হুবেই প্রদেশের স্পোর্টস ব্যুরোর উপ-পরিচালক লুও চিয়ি বলেন, ‘আমরা ক্রীড়ার মাধ্যমে এমন একটা মঞ্চ তৈরি করতে চাই যেখানে মানুষের আনন্দ উপভোগের সঙ্গে বাণিজ্যও ফুলেফেঁপে উঠবে।
সাকিব/ফয়সল
তথ্য ও ছবি: সিনহুয়া