১৪০টিরও বেশি ভাষাকে রিয়েল-টাইমে অনুবাদ করতে সক্ষম এআর চশমা, খাবার তৈরি করতে পারে এমন রোবট, বাদ্যযন্ত্র বাজাতে সক্ষম রোবট—সম্প্রতি অনুষ্ঠিত ২০২৬ চুংকুয়ানছুন ফোরাম বার্ষিক সম্মেলনে দেখা যায় কীভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিভিন্ন শিল্পক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। ইউনেস্কোর পূর্ব এশীয় বহু-সেক্টর আঞ্চলিক কার্যালয়ের পরিচালক শাহবাজ খান বলেন, এই ফোরাম শুধু অত্যাধুনিক প্রযুক্তিই প্রদর্শন করেনি, বরং দেখিয়েছে কীভাবে প্রযুক্তি উচ্চমানের উন্নয়নে সহায়তা করছে—এটি ‘সত্যিই চিত্তাকর্ষক’।
চীনের ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনার’ প্রথম বছর চলছে। চীন সরকার নতুন প্রবৃদ্ধির শক্তি জোরদার করা এবং উচ্চস্তরের প্রযুক্তিগত স্বনির্ভরতা দ্রুত অর্জনকে প্রধান কাজ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সম্প্রতি প্রকাশিত ‘জাতীয় উদ্ভাবন সূচক প্রতিবেদন ২০২৫’ অনুযায়ী, চীনের সামগ্রিক অবস্থান বিশ্বে নবম। ২০১২ সালের তুলনায় এটি ১১ ধাপ উন্নত, যা গত দশ বছরেরও বেশি সময়ে সবচেয়ে দ্রুত অগ্রসর হওয়া দেশ এবং শীর্ষ দশে থাকা একমাত্র মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে চীনকে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এই প্রেক্ষাপটে, বৈশ্বিক প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও বিনিময়ের একটি জাতীয় পর্যায়ের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে, চুংকুয়ানছুন ফোরাম এ বছরের প্রতিপাদ্য নির্ধারণ করেছে: ‘প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও শিল্প উদ্ভাবনের গভীর সংহতি’। এটি শুধু ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনার’ সাথে সংশ্লিষ্ট পরিকল্পনার সঙ্গেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, বরং চীনের ভবিষ্যতের উন্নয়ন সম্পর্কে বৈশ্বিক মহলের কৌতূহলেরও উত্তর দিয়েছে।
কোথায় ঘটছে এই গভীর সংহতি? আর এতে কী কী সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে? ফোরাম চলাকালে ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল। চীনের এআই শিল্পের বিকাশ নতুন ভোগের চাহিদা তৈরি করেছে এবং ভোগের বাজারে নতুন শক্তি যুগিয়ে চলেছে।
ফোরামের সমাপ্তির দিনে প্রকাশিত ২১টি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিতেও এই বিষয়টি প্রতিফলিত হয়েছে। যেমন, রোবটের জন্য একটি সাধারণ ‘সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্র’ হিসেবে কাজ করা ‘সাধারণ জ্ঞান ব্রেইন’—যা মূর্তিমান বুদ্ধিমত্তাকে বড় পরিসরে বাস্তবায়নে সহায়তা করবে। প্রথমবারের মতো পারকিনসন রোগের মূল কার্যকরী নার্ভ সার্কিট আবিষ্কার এবং দেশীয় প্রথম কাঁধের জয়েন্ট রিপ্লেসমেন্ট সার্জারি রোবট সিস্টেম—এগুলো মানুষের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইউনেস্কোর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্ট সেন্টারের উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান হ্যান্স ডারভিলে বলেন, চীনের কাছে অত্যন্ত উন্নত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সরঞ্জাম রয়েছে, যা উচ্চমানের পণ্য উত্পাদন করে বৈশ্বিক বাজারে সরবরাহ করতে সক্ষম, এবং জনগণকে আরও বাছাইয়ের সুযোগ দেয়। ইউনেস্কোর শাহবাজ খান মনে করেন, চীনের ‘পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা’ প্রযুক্তিগত উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দিয়েছে—যেমন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা শিল্প রোবট ব্যবহার করে নতুন মানের পণ্য উত্পাদন। “এটি উত্পাদনশীলতা অনেকাংশে বাড়াবে এবং বৈদ্যুতিক গাড়ি, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে উদ্ভাবনের নতুন সুযোগ তৈরি করবে,” তিনি বললেন।
চীনের ‘উচ্চ-ঘনত্বের’ প্রযুক্তি শুধু ভোগের নতুন উত্তাপই তৈরি করছে না, বরং বৈশ্বিক উন্নয়নেও শক্তি যোগাচ্ছে। সুইস চেম্বার অব কমার্স ইন চায়নার নির্বাহী পরিচালক ইউস্টাফ ভন শেনক বলেন, সুইস কোম্পানিগুলো উচ্চমানের পণ্য উত্পাদনে স্বয়ংক্রিয় প্রক্রিয়ায় সক্ষম, আর চীনের প্রযুক্তি এখন উচ্চমান ও সবুজ রূপান্তরের দিকে যাচ্ছে—ফলে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ভালো সুযোগ রয়েছে। ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর ট্যালেন্ট অর্গানাইজেশনের চেয়ারম্যান ডেনিস সাইমন বলেন, চীন ক্রমবর্ধমান উদ্ভাবন-চালিত দেশ হিসেবে অন্যান্য গ্লোবাল সাউথ দেশগুলোর জন্য মূল্যবান অভিজ্ঞতা তুলে ধরতে পারে। “ডিপসিকের অভিজ্ঞতা দেখে এই দেশগুলো বুঝতে পারে যে, অত্যন্ত ব্যয়বহুল চিপের ওপর নির্ভর না করেও, সাধারণত প্রয়োজনীয় কয়েক বিলিয়ন বা কয়েকশ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ ছাড়াই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জগতে প্রবেশ করা সম্ভব।”
আরও উল্লেখযোগ্য হলো, বিশ্ব অর্থনীতি যখন মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি বাড়ছে এবং সংরক্ষণবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠছে, ঠিক তখন চীন উচ্চস্তরের বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিগত উন্মুক্ততা ও সহযোগিতায় অটল রয়েছে এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি উদ্ভাবনে শক্তি যোগাচ্ছে।
এই ফোরামে চীন ঘোষণা করেছে যে, তারা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাব-অরবিটাল টেলিস্কোপ, উচ্চ-উচ্চতা মহাজাগতিক রশ্মি পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র, সমন্বিত চরম অবস্থার পরীক্ষামূলক সুবিধাসহ দশটি গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক গবেষণা পরিকাঠামো ভাগাভাগি করবে। প্রথমবারের মতো ফোরামে অংশ নেওয়া ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল ফর সায়েন্সের (আইসিইউ) অধীনের আন্তর্জাতিক ডেটা কমিটির (সিওডিএটিএ) সহ-সভাপতি হোসেন শরীফ বলেন, চীন শুধু উচ্চস্তরের উদ্ভাবন সক্ষমতা ও শিল্প দক্ষতাই প্রদর্শন করেনি, বরং বিভিন্ন উদ্ভাবনী ধারণার প্রতি উন্মুক্ত মনোভাব পোষণ করে। “আর উন্মুক্ততাই উদ্ভাবনের একমাত্র পথ।”
চুংকুয়ানছুন ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনের পর্দা নামলেও, উদ্ভাবন ও সহযোগিতার গল্প চলমান থাকবে। “ওপেন সায়েন্স ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন অ্যাকশন প্ল্যান” প্রকাশ করা থেকে শুরু করে, বেইজিং-থিয়ানচিন-হ্যপেই আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উদ্ভাবন কেন্দ্রের বাস্তবায়ন পরিকল্পনা ঘোষণা পর্যন্ত—চীন স্পষ্ট বার্তা দিয়েছে: বৈজ্ঞানিক প্রযুক্তিগত উদ্ভাবন কখনোই বদ্ধ ঘরে চর্চা নয়, বরং দেয়াল ভেঙে উন্মুক্ত সহযোগিতার মাধ্যমে সম্ভব। বিশ্বের জন্য, চীনকে বেছে নেওয়ার অর্থ হলো বৃহত্তম উদ্ভাবন প্রয়োগক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত হওয়া, উচ্চমানের উন্নয়নের সুযোগের সঙ্গে পথচলা এবং আরও উজ্জ্বল ভবিষ্যতের সঙ্গী হওয়া।
সূত্র: সিএমজি