মানুষ ও প্রকৃতি ৮৭

মানুষ ও প্রকৃতি ৮৭

যা রয়েছে এবারের পর্বে ১. পাখিদের জন্য যিনি কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের আটটি বছর ২. প্রথমবারের মতো ইলি নদীতে বিরল ডালমেশিয়ান পেলিকানের দেখা মিলেছে নিবিড় সবুজ অরণ্য। পাখির ডানা মেলার শব্দ। নীল আকাশ। দূষণহীন সমুদ্র। আমাদের নীল গ্রহকে আমরা এমনভাবেই দেখতে চাই।পরিবেশ ও প্রতিবেশের উন্নয়নের মাধ্যমে নিশ্চিত করা সম্ভব সেই নির্মল প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্য। সুপ্রিয় শ্রোতা মানুষ ও প্রকৃতি অনুষ্ঠান থেকে স্বাগত জানাচ্ছি আমি হোসনে মোবারক সৌরভ। বিশাল দেশ চীনের রয়েছে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য। পরিবেশ, বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্য সুরক্ষায় নিরলস প্রচেষ্টার ফলে চীনে জীববৈচিত্র্য যেমন বাড়ছে তেমনি উন্নত হচ্ছে পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র। আমাদের অনুষ্ঠানে আমরা চীনসহ পুরো বিশ্বের পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্র নিয়ে কথা বলবো। ১. পাখিদের জন্য যিনি কাটিয়ে দিয়েছেন জীবনের আটটি বছর চীনের তংথিং হ্রদে লক্ষাধিক পরিযায়ী পাখির সুরক্ষায় গত আট বছর ধরে নিরলস কাজ করে চলেছেন ৫৯ বছর বয়সী চেন সিনখাই। অসুস্থতা ও প্রতিকূল পরিবেশ উপেক্ষা করে প্রতিদিন ১০০ কিলোমিটার টহল দিয়ে তিনি এই জলাভূমিকে পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়ে পরিণত করেছেন। বাবার এই নিঃস্বার্থ ত্যাগ দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে তাঁর ছেলেও এখন এই সংরক্ষণের কাজে যোগ দিয়েছেন। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আর উত্তরসূরির হাতে দায়িত্ব তুলে দিয়ে চেন সিনখাই এখন নিশ্চিন্তে অবসরের অপেক্ষায়। চেন সিনখাই পুরো গল্পটি চলুন শুনে আসি। ভোরের আলো ফোটার আগেই ৫৯ বছর বয়সী চেন সিনখাই উঠে পড়লেন তাঁর কাদামাখা পিকআপে। শুরু হল তার টহল দেয়ার যাত্রা। তার ইঞ্জিনের গর্জন শুনেই প্রতিদিন জেগে ওঠে তংথিং হ্রদের বিস্তীর্ণ জলাভূমি। চারদিকে কুয়াশা, পায়ের নিচে কাদা আর দিগন্তজুড়ে লাখো পাখির ডানা ঝাপটানোর শব্দের মাঝে কে টে যায় চেন সিনখাইয়ের বেলা। কর্তব্যরত অবস্থায় তাঁর শেষ চীনা নববর্ষ ছিল এবার। ধীরে ধীরে অবসরের দিন এগিয়ে আসলেও, চেনের পায়ে নেই থামার কোনো লক্ষণ। চীনের মধ্যাঞ্চলীয় হুনান প্রদেশের ইউয়ে ইয়াং শহরে অবস্থিত তংথিং হ্রদ। এক লাখ হেক্টরেরও বেশি বিস্তৃত এই জলাভূমিটি পূর্ব এশিয়া ও অস্ট্রেলেশীয় পরিযায়ী পাখির জন্য একটি অপরিহার্য বিশ্রামস্থল। প্রতি শরৎ ও শীতে এখানে আসে দুইশড় বেশি প্রজাতির পাখি পরিযায়ী পাখি। সাইবেরিয়ান সাদা সারস থেকে শুরু করে লেসার হোয়াইট-ফ্রন্টেড গিজ, কি নেই এখানে। এ বছর এখানে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ছাড়িয়েছে সাড়ে চার লাখ। যা এ যাবৎকালের সবচেয়ে বেশি পাখি আগমনের রেকর্ড। এই রেকর্ডের পেছনে রয়েছে চেন সিনখাইয়ের মতো মানুষের নীরব শ্রমের লড়াই। তংথিং হ্রদের পাড়েই বড় হয়েছেন চেন। ছোটবেলায় দেখেছেন মানুষ কীভাবে হ্রদের ওপর নির্ভর করে বেচে থাকে। নলখাগড়া ঘাস কাটা থেকে শুরু করে গবাদি পশু চরানো এমনকি পপলার গাছ লাগানো কত কিছুই না করেছেন তিনি। কিন্তু বয়স বারার সাথে সাথে পরিবেশ রক্ষার গুরুত্ব মনের গভীর থেকে অনুভব করতে থাকেন তিনি। পরবর্তীতে ২০১৮ সালে তিনি পেশা বদলে যোগ দেন সাউথ তং থিং লেক নেচার রিজার্ভে একজন পাখি সংরক্ষক হিসেবে। সেই থেকে শুরু হয় তার প্রতিদিন গড়ে ১০০ কিলোমিটার টহল। গ্রীষ্ম কালে হ্রদে পানি বেড়ে গেলে দিতে হয় স্পিডবোটে টহল। আবার শীতে পানি কমে গেলে কাদা মাটি ভেদ করে পায়ে হেটে হেটে টহল দিতে হয়। যা বেশ কষ্টসাধ্য। গাড়ি বিকল হওয়া, নৌকা আটকে যাওয়া, হাঁটুজল ভেঙে জলাভূমিতে এগিয়ে যাওয়া — এসবই ছিল তাঁর নিত্যসঙ্গী। পেটের পীড়া আর উচ্চ রক্তচাপের ওষুধ পকেটে নিয়েই তিনি প্রতিদিন বেরিয়ে পড়েন টহল দিতে। ২০২১ সালে চেনের ছেলে চেন ইউ দূরের শহর থেকে বাড়ি ফিরে দেখলেন বাবা পকেট ভর্তি ওষুধ আর শরীরে ক্লান্তির ছাপ নিয়ে প্রতিদিন যাচ্ছেন তংথিং হ্রদে। বাবার এই কষ্টের কারন জানতে চেন ইউ একদিন হ্রদের কাছে এসে দেখতে পান আকাশজুড়ে ছড়িয়ে আছে রাজহাঁস, ওরিয়েন্টাল স্টর্ক সহ হাজারো পাখির ঝাঁক। মন্ত্রমুগ্ধের তাকিয়ে থাকেন সে দৃশ্য দেখে। এরপরই সিধান্ত নিলেন বাবার পথ ধরতে। এখন বাবা ছেলে দুজন মিলেই একসঙ্গে টহল দেন। , চেন সিনখাই এর কাছে এখন অবসরের দিন ঘনিয়ে আসলেও তিনি এখন নিশ্চিন্ত। তিনি জানেন এই হ্রদকে দেখাশুনার জন্য মানুষের কখনো অভাব হবে না। বছরের পর বছর ধরে একা পায়ে হেঁটে টহল দেওয়ার দিন এখন বদলে গেছে। এসেছে ড্রোন ও থার্মাল ইমেজিং সিস্টেম। একদিন ড্রোনের ক্যামেরায় ধরা পড়ল জালে আটকে পড়া একটি তরুণ রাজহাঁস। চেন ছুটে গেলেন সেখানে। পানিতে নেমে সাবধানে কেটে দিলেন পাখার চারপাশের জাল। পাখিটিকেও পাঠানো হলো ৮০ কিলোমিটার দূরে চিকিৎসার জন্য। ইয়াংজি নদী অববাহিকায় ১০ বছরের মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার আগে ফেলে যাওয়া এই জালগুলো এখনো কাদার নিচে লুকিয়ে আছে। প্রতিটি টহলেই সেগুলো খুঁজে বের করে সরানো হয়। হুনান একাডেমি অব ফরেস্ট্রির পাখি বিশেষজ্ঞ নিউ ইয়ান তং বলেন, “পাখির সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তারা আরও বেশি ছড়িয়ে পড়ছেন আরও বেশি এলাকায়। ফলে টহলের চাপও বেড়েছে।“ তার মতে, স্থানীয় পর্যায়ের পাখি সংরক্ষকরাই মুলত এই সংরক্ষণ শৃঙ্খলের অপরিহার্য শক্তি। অবসরের আগে চেন সিনখাইয়ের একটাই দাবি ছিল — হ্রদের গুরুত্বপূর্ণ পয়েন্টগুলোতে উচ্চ-উচ্চতার পর্যবেক্ষণ যন্ত্র বসানো । নববর্ষের ঠিক আগেই তার সেই দাবি পূরণ হয়েছে । বসানো হয়েছে নতুন যন্ত্রপাতি। রাতের টহলে ড্রোনের থার্মাল ক্যামেরায় চেন এখন দেখতে পান — হাজারো পাখি নিরাপদে ঘুমাচ্ছে এই জলাভূমিতে। ভালোবাসার জায়গা থেকে একজন পাখি সংরক্ষক হিসেবে যাত্রা শুরু করে চেন তার পুরো জীবনটা কাটিয়ে দিয়েছেন এখানে। এখন তার ছেলে এসে কাঁধে নিয়েছেন তার সে দায়িত্ব। প্রতিবেদন: হোসনে মোবারক সৌরভ সম্পাদনা: আল আমিন আজাদ তথ্য ও ছবি: সিসিটিভি ২. প্রথমবারের মতো ইলি নদীতে বিরল ডালমেশিয়ান পেলিকানের দেখা মিলেছে তুষারশুভ্র সিনচিয়াংয়ের জলাভূমিতে এবার দেখা মিলল এক বিরল অতিথির। উত্তর-পশ্চিম চীনের ইলি কাজাখ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলে প্রথমবারের মতো দেখা গেছে বিলুপ্তপ্রায় ডালমেশিয়ান পেলিকানের।পরিবেশবিদদের মতে এটি পরিবেশ ও প্রকৃতি সংরক্ষণের এক নতুন দিগন্তের সূচনা করছে। উত্তর পশ্চিম চীনের সিনচিয়াং উইগুর স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের ইলি কাজাখ অঞ্চলে হাড়কাঁপানো শীতে এবার যোগ হয়েছে এক নতুন রোমাঞ্চ। প্রথমবারের মতো এই এলাকায় শীত কাটাতে দেখা গেছে দুটি অতি বিপন্ন ডালমেশিয়ান পেলিকানকে। সাধারণত মিঠাপানির এই বিশালকায় পাখিগুলো চীনের প্রথম শ্রেণির সংরক্ষিত প্রাণীর তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। এর আগে এই অঞ্চলে শীতকালে এদের আগে কখনো দেখা যায়নি। ডালমেশিয়ান পেলিকান বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম উড়ন্ত পাখি। এদের ডানার বিস্তার প্রায় তিন মিটারেরও বেশি। যখন এরা আকাশ চিরে উড়ে চলে, তখন ডানা ঝাপটানোর দৃশ্যটি যেকোনো প্রকৃতিপ্রেমীকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।

ইলি নদীর অববাহিকায় এদের রাজকীয় উপস্থিতি স্থানীয় পরিবেশবিদদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহের সৃষ্টি করেছে। পরিবেশবিদদের ধারণা, এই যুগল আগামী মার্চের মাঝামাঝি পর্যন্ত এখানে অবস্থান করবে। এরপরই তারা পাড়ি জমাবে তাদের মূল প্রজনন ক্ষেত্রের দিকে। প্রতিবেদন: হোসনে মোবারক সৌরভ সম্পাদনা: আল আমিন আজাদ তথ্য ও ছবি: সিসিটিভি প্রিয়শ্রোতা, আমাদের এই সুন্দর পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তুলতে আমাদের প্রত্যেকেরই রয়েছে কিছু না কিছু দায়িত্ব। আসুন, জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমরা সবাই একসাথেই এগিয়ে আসি। এখন বসন্তকাল। শীতের রিক্ততা কাটিয়ে প্রকৃতি আজ সেজেছে নতুন সাজে। গাছে গাছে কচি পাতার সমারোহ, শিমুল-পলাশের রক্তিম আভা আর কোকিলের কুহুতানে মুখরিত চারপাশ। মাঠজুড়ে সবুজের ঢেউ আর ফাল্গুনের মৃদুমন্দ বাতাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় এই ধরিত্রীকে ভালোবাসার কথা, পরিবেশ সুরক্ষার গুরুত্ব। বসন্ত হলো প্রাণচাঞ্চল্যের ঋতু। এই সময়ে মৌমাছি ও প্রজাপতিরা ফুলে ফুলে ঘুরে পরাগায়নের মাধ্যমে প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষা করে।

আমাদের চারপাশে বেড়ে ওঠা এই নতুন প্রাণগুলোকে বিকশিত হওয়ার সুযোগ করে দেওয়া এবং নির্বিচারে গাছ কাটা বা পরিবেশ দূষণ থেকে বিরত থাকা আমাদের নৈতিক দায়িত্ব। প্রকৃতির এই নবজাগরণকে টেকসই করতে আমাদের সচেতনতাই হতে পারে একটি সুন্দর আগামীর ভিত্তি। আজকের মতো এই আহ্বান জানিয়ে বিদায় নিচ্ছি আমি হোসনে মোবারক সৌরভ। আগামী সপ্তাহে আবারও কথা হবে, সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ থাকুন। চাই চিয়েন। 

পরিকল্পনা, গ্রন্থনা, উপস্থাপনা ও অডিও সম্পাদনা: হোসনে মোবারক সৌরভ সার্বিক সম্পাদনা: ইয়ু কুয়াং ইউয়ে আনন্দী

Rate This Article

How would you rate this article?

এম রহমান

এম রহমান

বিভিন্ন বিষয়ে লেখালেখি ও সম্পাদনায় ৫ বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

Our Editorial Standards

We are committed to providing accurate, well-researched, and trustworthy content.

Fact-Checked

This article has been thoroughly fact-checked by our editorial team.

Expert Review

Reviewed by subject matter experts for accuracy and completeness.

Regularly Updated

We regularly update our content to ensure it remains current.

Unbiased Coverage

We strive to present balanced information.