Tuesday, June 9, 2026
Live
খবর
Verified
4 min read

লিচুর রাজধানীখ্যাত দিনাজপুরে লিচুর উৎসব

মাহফুজ রহমান
মাহফুজ রহমান ডেস্ক সম্পাদক
Published: Updated:
লিচুর রাজধানীখ্যাত দিনাজপুরে লিচুর উৎসব

গ্রীষ্মের রোদঝলমলে সকালে দিনাজপুরের লিচুবাগানে পা রাখলেই চোখ জুড়িয়ে যায়। গাছের সবুজ পাতার ফাঁকে ফাঁকে ঝুলে আছে গাঢ় লাল, খয়েরি আর গোলাপি রঙের থোকা থোকা লিচু। বাতাসে ভেসে বেড়ায় পাকা লিচুর মিষ্টি সুবাস। রোদ আর ছায়ার মায়াবী খেলায় ফলগুলো যেন আরও দীপ্ত, আরও আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে। বছরের এই সময়টায় লিচুবাগান শুধু ফলের উৎস নয়; এটি হয়ে ওঠে গ্রামবাংলার সৌন্দর্য, কৃষকের স্বপ্ন এবং প্রকৃতির উদারতার এক জীবন্ত প্রতীক।

‘লিচুর রাজধানী’ নামে পরিচিত দিনাজপুর জেলার প্রায় প্রতিটি এলাকাতেই কমবেশি লিচুর চাষ হয়। তবে সদর উপজেলার মাসিমপুর, ঘুঘুডাঙ্গা ও উলিপুর, বিরল উপজেলার মাধববাটি, করলা, রবিপুর, মহেশপুর ও বটহাট, খানসামার গোলাপগঞ্জ ও কাচিনীয়া, বীরগঞ্জের সনকা এবং চিরিরবন্দরের কারেন্টহাট এলাকায় লিচুর আবাদ সবচেয়ে বেশি। মাদ্রাজি, বেদানা, বোম্বাই, চায়না-থ্রি, মোজাফফরি ও কাঁঠালিসহ নানা জাতের লিচুর চাষ হলেও বোম্বাই ও বেদানা জাতের প্রাধান্যই চোখে পড়ে বেশি।

দিনাজপুরের বেলে-দোআঁশ মাটি লিচু চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। লাভজনক হওয়ায় বছরের পর বছর এই অঞ্চলে লিচুর আবাদ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। গত বছর দিনাজপুরের বেদানা লিচু ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি লাভ করে, যা জেলার কৃষি ঐতিহ্যের জন্য এক বড় অর্জন। সুমিষ্ট স্বাদ, রসাল শাঁস ও অনন্য গুণগত মানের কারণে দিনাজপুরের লিচু এখন দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও পরিচিত। তবে চাষিদের মতে, শুধু স্বীকৃতি পেলেই চলবে না; বিশ্ববাজারে রপ্তানির সুযোগ আরও বাড়াতে হবে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, উনিশ শতকের শেষভাগে দিনাজপুরে লিচুর আবাদ শুরু হয়। তৎকালীন জমিদার ও ব্রিটিশ শাসকেরা ভারতের মাদ্রাজ ও বোম্বাই অঞ্চল থেকে চারা এনে এ অঞ্চলে লিচুর বাগান গড়ে তোলেন। যদিও বেদানা ও চায়না-থ্রি জাতের বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়েছে মাত্র তিন থেকে সাড়ে তিন দশক আগে।

উলিপুর এলাকার লিচুচাষি আব্বাস আলী বলেন, “বাপ-দাদার আমল থেকেই লিচুবাগানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক। পুরোনো গাছ কেটে নতুন বাগান করেছি, তবে স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে দাদার সময়ের একটি মাদ্রাজি লিচুগাছ এখনো রেখে দিয়েছি।”

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, দিনাজপুরে বর্তমানে ৫ হাজার ৪৯০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ রয়েছে। চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৩৭ হাজার ৫৯৩ মেট্রিক টন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩ হাজার ২২৫ হেক্টর জমিতে বোম্বাই জাতের লিচুর চাষ হয়েছে। পাশাপাশি মাদ্রাজি, বেদানা, চায়না-থ্রি, চায়না-টু, কাঁঠালি ও মোজাফফরি জাতের লিচুরও উল্লেখযোগ্য আবাদ রয়েছে। বাগানের বাইরে বসতবাড়ির আঙিনাতেও রয়েছে সাত লাখের বেশি লিচুগাছ।

মৌসুমের শুরুতে বাজারে আসে মাদ্রাজি লিচু। আকারে লম্বাটে, বড় আঁটির এই লিচুর খোসা তুলনামূলক পুরু ও শক্ত হলেও স্বাদে মিষ্টি এবং ঘ্রাণে ভরপুর। এরপর বাজার মাতাতে আসে জনপ্রিয় বেদানা লিচু। গোলাকার আকৃতির লালচে-খয়েরি রঙের এই লিচুর খোসা পাতলা, আঁটি ছোট এবং শাঁস বড় ও রসালো। একই সময়ে পাওয়া যায় বোম্বাই, চায়না-থ্রি ও চায়না-টু জাতের লিচুও। উজ্জ্বল গোলাপি রঙের বোম্বাই লিচু যেমন সুগন্ধি ও রসাল, তেমনি আকারে বড় ও আপেলের মতো দেখতে চায়না-থ্রি লিচু অভিজাত শ্রেণির ফল হিসেবে বিশেষ পরিচিত।

প্রতিবছরের মতো এবারও দিনাজপুর শহরের কালীতলা নিউমার্কেটের ফল বাজারে ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জমে উঠেছে লিচুর বেচাকেনা। ঢাকা, চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, নোয়াখালী ও বরিশালসহ দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে পাইকারেরা ছুটে আসছেন এই বাজারে। ট্রাকভর্তি লিচু দেশের নানা প্রান্তে পৌঁছে যাচ্ছে। কেউ আবার বাঁশের খাঁচা কিংবা ক্রেটে ভরে প্রিয়জনদের কাছে পাঠাচ্ছেন মৌসুমি উপহার হিসেবে।

চাষি ও ব্যবসায়ীদের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে মানভেদে প্রতি হাজার মাদ্রাজি লিচু বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ৫০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। বেদানা লিচুর দাম ছিল ৪ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা এবং চায়না-থ্রি বিক্রি হচ্ছে ৬ হাজার থেকে ১২ হাজার টাকা পর্যন্ত।

দিনাজপুরের লিচু এখন দেশের সীমানা ছাড়িয়ে বিদেশেও পৌঁছাচ্ছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রথমবারের মতো ফ্রান্স ও নেদারল্যান্ডসে লিচু রপ্তানি করা হয়। পরের বছর ইংল্যান্ডেও পাঠানো হয় প্রায় ১২ হাজার পিস লিচু। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে দিনাজপুরের লিচুর সম্ভাবনা ক্রমেই উজ্জ্বল হচ্ছে।

তবে সম্ভাবনার পাশাপাশি রয়েছে কিছু চ্যালেঞ্জও। বাংলাদেশ ফল গবেষণা ইনস্টিটিউট ইতোমধ্যে বারি-১ থেকে বারি-৫ পর্যন্ত পাঁচটি নতুন জাত উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে বারি-৩ ও বারি-৪ দিনাজপুর অঞ্চলের জন্য উপযোগী বলে বিবেচিত হয়েছে। একই সঙ্গে বেদানা লিচুর পুষ্টিগুণ নির্ণয় এবং এর পাল্প দীর্ঘমেয়াদে সংরক্ষণের ওপরও গবেষণা চলছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, বাগানের বয়স বৃদ্ধি এবং রোগবালাইয়ের ঝুঁকি ভবিষ্যতে উৎপাদনের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নতুন জাত উদ্ভাবন, আধুনিক কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার, রোগব্যবস্থাপনা এবং রপ্তানি সম্প্রসারণে আরও গবেষণা ও বিনিয়োগ প্রয়োজন। তবেই দিনাজপুরের রসালো লিচুর ঐতিহ্য শুধু টিকে থাকবে না, বরং বিশ্ববাজারে আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করবে।

দিনাজপুরের লিচু তাই কেবল একটি মৌসুমি ফল নয়; এটি একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি, কৃষি ঐতিহ্য এবং অর্থনৈতিক সম্ভাবনার উজ্জ্বল প্রতীক।

Rate This Article

How would you rate this article?

মাহফুজ রহমান

মাহফুজ রহমান

ডেস্ক সম্পাদক

৫ বছর ধরে সাংবাদিকতা ও লেখালেখি করছেন। তিনি মূলত শিক্ষাবিষয়ক এক্সপার্ট। তিনি লেখাপড়া, চাকরি বা ক্যারিয়ার, বিদেশে উচ্চশিক্ষা, প্রযুক্তি ইত্যাদি বিষয়ে নিয়মিত লেখালেকি ও সংবাদ সম্পাদনা করেন।

Our Editorial Standards

We are committed to accurate, well-researched, and trustworthy journalism.

Fact-Checked

Every claim is verified by our editorial team before publication.

Expert Review

Content reviewed by subject matter experts for accuracy.

Regularly Updated

We update content to reflect the latest developments.

Unbiased Coverage

We present balanced perspectives and multiple viewpoints.