বিজ্ঞানবিশ্ব ১৫৯ পর্ব: ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তে ব্লাড টেস্টের বিপ্লব: চীনের গবেষকদের বড় সাফল্য।

বিজ্ঞানবিশ্ব ১৫৯ পর্ব: ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তে ব্লাড টেস্টের বিপ্লব: চীনের গবেষকদের বড় সাফল্য।
১। ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তে ব্লাড টেস্টের বিপ্লব: চীনের গবেষকদের বড় সাফল্য ২। শরীরে ওষুধের সাইড এফেক্ট রুখতে ‘স্মার্ট প্যাচ’ ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্তে ব্লাড টেস্টের বিপ্লব: চীনের গবেষকদের বড় সাফল্য বিশ্বজুড়ে ক্যানসারজনিত মৃত্যুর একটি বড় কারণ হলো ফুসফুসের ক্যানসার। এর সবচেয়ে ভয়ংকর দিক হলো, প্রাথমিক অবস্থায় এর কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না বললেই চলে। যখন ধরা পড়ে, তখন চিকিৎসার সময় প্রায় শেষ হয়ে আসে। কিন্তু সেই পরিস্থিতির আমূল পরিবর্তন ঘটাতে চলেছেন চীনের একদল বিজ্ঞানী। তারা তৈরি করেছেন বিশ্বের প্রথম রক্তভিত্তিক ডায়াগনস্টিক কিট, যা অত্যন্ত নিখুঁতভাবে ফুসফুসের ক্যানসার শনাক্ত করতে সক্ষম। বর্তমানে ফুসফুসের সমস্যা বা ক্যানসার ঝুঁকি বুঝতে 'লো-ডোজ সিটি স্ক্যান' ব্যবহার করা হয়। এটি ফুসফুসে ছোট ছোট 'নোডুল' বা গুটি শনাক্ত করতে পারলেও, সেই গুটিটি আসলে ক্যানসার নাকি সাধারণ মাংসপিণ্ড, তা নিশ্চিত করে বলতে পারে না। ফলে রোগীদের বারবার স্ক্যান করাতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ এবং ব্যয়বহুল। অনেক রোগীই মাঝপথে এই নিয়মিত পরীক্ষা বন্ধ করে দেন। পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ৩০ শতাংশের কম রোগী নিয়মিত এই দীর্ঘমেয়াদী পর্যবেক্ষণে থাকেন। এই সমস্যার সমাধান দিতেই ১০ বছর ধরে গবেষণা চালিয়েছেন চাইনিজ একাডেমি অফ সায়েন্সেসের অধ্যাপক হু হাই এবং তার দল। তারা নজর দিয়েছেন টিউমার অটোঅ্যান্টিবডির ওপর। ক্যানসার কোষের সংখ্যা যখন খুব কম থাকে, তখনই শরীরের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা এক ধরনের সংকেত দেয়, যা রক্তে শনাক্ত করা সম্ভব। গবেষকরা সিন্থেটিক বায়োলজি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে রক্তে থাকা ৪০০টিরও বেশি প্রোটিন বিশ্লেষণ করেছেন। সেখান থেকে সবচেয়ে কার্যকর ১৩টি 'বায়োমার্কার' বেছে নেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তিটি আগের যেকোনো পদ্ধতির চেয়ে অনেক বেশি নির্ভুল। চীনের শীর্ষস্থানীয় হাসপাতালগুলোতে ১ হাজার ৪৬৩ জন রোগীর ওপর এই কিটটির কার্যকারিতা যাচাই করা হয়েছে, যার ফলাফল ছিল অত্যন্ত চমকপ্রদ। এই ট্রায়ালে দেখা গেছে, কিটটি ৬৫ শতাংশেরও বেশি ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ের ফুসফুসের ক্যানসার নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে সক্ষম। বিশেষ করে, যেসব ছোট নোডুল বা গুটি সাধারণ সিটি স্ক্যানে অস্পষ্ট থেকে যায় এবং নির্ণয় করা কঠিন হয়ে পড়ে, সেগুলোর ক্ষেত্রে এই রক্ত পরীক্ষাটি ৮৫ শতাংশের বেশি নির্ভুল ফলাফল দিয়েছে। এই পরিসংখ্যান প্রমাণ করে যে, প্রচলিত ইমেজিং পদ্ধতির সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার শনাক্তে এটি এক নতুন দিনের সূচনা করলো এই নতুন ব্লাড টেস্ট কিটটি কেবল আধুনিকই নয়, বরং সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত সাশ্রয়ী ও সহজতর। যেখানে ক্যানসার নির্ণয়ের প্রচলিত পরীক্ষাগুলো বেশ ব্যয়বহুল, সেখানে এই পরীক্ষার খরচ মাত্র ১ হাজার ইউয়ান। পরীক্ষাটি সম্পন্ন করতে রোগীদের কোনো জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় না; মাত্র ২ মিলিলিটার রক্ত সংগ্রহের মাধ্যমেই এটি করা সম্ভব। যেহেতু এতে বায়োপসির মতো কোনো অস্ত্রোপচার বা কাটাছেঁড়ার প্রয়োজন নেই, তাই বয়স্ক কিংবা শারীরিকভাবে দুর্বল রোগীদের জন্য এটি সম্পূর্ণ ঝুঁকিহীন ও নিরাপদ একটি পদ্ধতি। এছাড়া, উন্নত 'ফ্রিজ-ড্রাইং' প্রযুক্তি ব্যবহারের ফলে এই কিটগুলো সাধারণ রেফ্রিজারেটরে এক বছর পর্যন্ত সংরক্ষণ করা যায়, যা এর দীর্ঘস্থায়িত্ব ও সহজলভ্যতাকে আরও নিশ্চিত করেছে। এ গবেষণার প্রধান গবেষক অধ্যাপক হু হাই জানান, এটি চীনের ফুসফুস ক্যানসার নির্ণয় পদ্ধতিতে একটি বড় মাইলফলক। এখন আমরা কেবল ইমেজিং বা ছবির ওপর নির্ভর না করে রক্তের আণবিক সংকেত দেখে ক্যানসার শনাক্ত করতে পারব। যদি সাধারণ চেকআপের মাধ্যমেই এই পরীক্ষাটি করা যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে ফুসফুসের ক্যানসার আর 'মরণব্যাধি' হয়ে থাকবে না। বরং প্রাথমিক পর্যায়ে শনাক্ত হওয়ার ফলে হাজার হাজার প্রাণ বাঁচানো সম্ভব হবে। গবেষকদের লক্ষ্য এই প্রযুক্তিকে সাধারণ কমিউনিটি ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্য পরীক্ষা কেন্দ্রগুলোতে পৌঁছে দেওয়া। যদি এটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তবে ফুসফুসের ক্যানসার জনিত মৃত্যুর হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে বলে আশা করা হচ্ছে। || প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার || সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ শরীরে ওষুধের সাইড এফেক্ট রুখতে ‘স্মার্ট প্যাচ’ শরীরের কোনো একটি বিশেষ অঙ্গে সমস্যা হলে আমরা সাধারণত যে ওষুধ খাই, তা রক্তের মাধ্যমে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। এর ফলে আক্রান্ত কোষের পাশাপাশি সুস্থ কোষগুলোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যাকে আমরা ‘পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া’ বা সাইড এফেক্ট বলে জানি। কিন্তু বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় এবার সেই পুরোনো ধারণা বদলে যেতে বসেছে। চিনের বেইহাং ইউনিভার্সিটির একদল গবেষক তৈরি করেছেন ‘পকেট’ নামক একটি আল্ট্রা-ফ্লেক্সিবল বায়োইলেক্ট্রনিক প্যাচ, যা অনেকটা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের জন্য তৈরি ‘স্মার্ট পোশাক’-এর মতো। অঙ্গের আদলে বসবে ‘সেকেন্ড স্কিন’ আমাদের শরীরের অনেক অঙ্গ, যেমন—ডিম্বাশয় বা কিডনি, দেখতে বেশ আঁকাবাঁকা ও অসম আকৃতির। প্রচলিত চিকিৎসা সরঞ্জামগুলো এসব অঙ্গে নিখুঁতভাবে বসানো কঠিন। গবেষকদের দাবি, এই নতুন প্যাচটি এতটাই নমনীয় যে এটি অঙ্গের প্রতিটি ভাঁজে ‘দ্বিতীয় চামড়া’র মতো সেঁটে থাকতে পারে। এটি কেবল একটি নির্দিষ্ট স্থানে ওষুধ পৌঁছে দেয় না, বরং কোষের দরজায় আলতো করে কড়া নাড়ে এবং সরাসরি ভেতরে ওষুধ বা জিন থেরাপি প্রবেশ করিয়ে দেয়। এই প্রযুক্তির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এর ‘টার্গেটেড ডেলিভারি’ ক্ষমতা। এটি পুরো শরীরে ওষুধের প্রভাব না ফেলে শুধুমাত্র অসুস্থ কোষগুলোকে লক্ষ্য করে কাজ করে। গবেষকরা জানান, সাধারণ ওষুধের তুলনায় এই পদ্ধতিতে সুস্থ কোষ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি নেই বললেই চলে। বিশেষ করে সংবেদনশীল অঙ্গগুলোর চিকিৎসায় এটি হতে পারে এক যুগান্তকারী সমাধান। এই গবেষণার অনুপ্রেরণা এসেছে এক কঠিন বাস্তব থেকে। যেসব নারীর শরীরে ‘BRCA1’ নামক জিন মিউটেশন থাকে, ক্যানসার প্রতিরোধে তাদের ডিম্বাশয় ও ফ্যালোপিয়ান টিউব কেটে ফেলে দিতে হয়। এর ফলে তারা চিরতরে মাতৃত্বের ক্ষমতা হারান। রোগীরা যখন অশ্রুসিক্ত চোখে জানতে চান, "অন্য কোনো উপায় কি নেই?", সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই বিজ্ঞানীরা এই বিকল্প পথের সন্ধান পান। সাধারণত রিপ্রোডাক্টিভ বা প্রজনন অঙ্গগুলোতে প্রচলিত জিন থেরাপি ব্যবহার করা নিষিদ্ধ, কারণ এতে ডিএনএ-র স্থায়ী পরিবর্তনের ঝুঁকি থাকে। কিন্তু এই নতুন ‘পকেট’ প্যাচটি কেবল অঙ্গের উপরিভাগের কোষে কাজ করে, ভেতরের প্রজনন কোষগুলোকে সম্পূর্ণ অক্ষত রাখে। ডিম্বাশয় বা কিডনির মতো অঙ্গগুলোর উপরিভাগ বেশ আঁকাবাঁকা ও অসম হওয়ায় সাধারণ কোনো চিকিৎসা সরঞ্জাম সেখানে নিখুঁতভাবে বসানো অসম্ভব হয়ে পড়ে। এই কঠিন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বিজ্ঞানীরা অনুপ্রেরণা নিয়েছেন প্রাচীন কাগজ কাটার শিল্প (Paper cutting art) থেকে। এই শৈল্পিক কৌশলে তৈরি প্যাচটি মূলত চারটি স্তরের একটি পাতলা আবরনী, যাতে রয়েছে সিলভার ন্যানো-ওয়্যার ইলেকট্রোড এবং ওষুধের আধার হিসেবে বিশেষ ধরনের হাইড্রোজেল। যখন এই প্যাচে সামান্য ভোল্টেজ প্রয়োগ করা হয়, তখন এটি একটি মৃদু বিদ্যুৎ ক্ষেত্র তৈরি করে কোষের দেওয়ালে অস্থায়ীভাবে অতি ক্ষুদ্র ছিদ্র তৈরি করে। এই প্রক্রিয়ায় ওষুধ বা জিন সরাসরি কোষের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে ইঁদুরের ওপর চালানো পরীক্ষায় দেখা গেছে, এই প্যাচটি ডিম্বাশয়ের প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট না করেই সফলভাবে ক্যানসার ঝুঁকি কমাতে পেরেছে। এছাড়া কিডনি প্রতিস্থাপনের পর প্রদাহ কমানোর ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রেও এটি দারুণ সফল। সাধারণত কিডনি রোগীদের স্টেরয়েড খেতে হয়, যার ফলে হাড় ক্ষয় বা রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়ার মতো সমস্যা হয়। কিন্তু এই প্যাচটি সরাসরি কিডনিতে ওষুধ পৌঁছে দেওয়ায় শরীরে কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেয়নি। বেইহাং ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ছাং লিংছিয়ান বলেন, এই প্রযুক্তিটি সংবেদনশীল অঙ্গগুলোর চিকিৎসায় এক নতুন দিগন্ত খুলে দিয়েছে। শুধু ক্যানসার বা কিডনি নয়, ভবিষ্যতে ডায়াবেটিস, চোখের রেটিনা বা রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের চিকিৎসায়ও এই ‘স্মার্ট পোশাক’ ব্যবহার করা যাবে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের এই জয়যাত্রা যদি মানবদেহে সফলভাবে প্রয়োগ করা যায়, তবে অদূর ভবিষ্যতে অনেক মরণব্যাধির চিকিৎসা হবে অনেক সহজ, নিরাপদ এবং পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াহীন। || প্রতিবেদন: শুভ আনোয়ার || সম্পাদনা: ফয়সল আবদুল্লাহ নতুন আরও তথ্যবহুল ও অজানা বিষয় নিয়ে প্রতি সপ্তাহের সোমবার হাজির হবো আপনাদের সামনে। আগামী সপ্তাহে আবারো কথা হবে। সে পর্যন্ত ভালো থাকুন, সুস্থ্য থাকুন। প্রযোজনা ও উপস্থাপনা- শুভ আনোয়ার অডিও সম্পাদনা- রফিক বিপুল সার্বিক তত্ত্বাবধান- ইউ কুয়াং ইউয়ে আনন্দী

Rate This Article

How would you rate this article?

ED Desk

ED Desk

Staff Reporter

Experience in write about 5 years.

Our Editorial Standards

We are committed to providing accurate, well-researched, and trustworthy content.

Fact-Checked

This article has been thoroughly fact-checked by our editorial team.

Expert Review

Reviewed by subject matter experts for accuracy and completeness.

Regularly Updated

We regularly update our content to ensure it remains current.

Unbiased Coverage

We strive to present balanced information.