বিশ্বের ইতিহাসে জনসংখ্যার দিক থেকে সবচেয়ে বড় আধুনিকায়ন কর্মসূচির পথে এগোচ্ছে চীন। সদ্য সমাপ্ত জাতীয় আইনসভা অধিবেশনে আলোচনাধীন দেশের নতুন পাঁচ বছর মেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা এই লক্ষ্য অর্জনের রূপরেখা নির্ধারণ করেছে।
চীনের খসড়া ১৫তম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী, ২০৩৫ সালের মধ্যে দেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে মৌলিকভাবে আধুনিকায়নের পথে নিয়ে যেতে একটি শক্ত ভিত্তি গড়ে তোলার লক্ষ্য নেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনায় বলা হয়েছে, ২০২০ সালের তুলনায় মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) দ্বিগুণ করে তা ২০ হাজার মার্কিন ডলারের বেশি উন্নীত করার চেষ্টা করা হবে, যা সাধারণত একটি মধ্যম উন্নত দেশের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচিত।
এই দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী ২০৩৫ সালের মধ্যে চীনের অর্থনৈতিক শক্তি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা, জাতীয় প্রতিরক্ষা শক্তি, সামগ্রিক জাতীয় ক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক প্রভাব উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে জনগণের জীবনমান উন্নত হবে এবং তারা আরও সুখী ও সমৃদ্ধ জীবনযাপন করতে পারবে। এর মাধ্যমে সমাজতান্ত্রিক আধুনিকায়ন মূলত বাস্তবায়িত হবে বলে আশা করা হচ্ছে। বিশ্বে এখন পর্যন্ত ৩০টিরও কম দেশ বা অঞ্চল আধুনিকায়নের স্তরে পৌঁছাতে পেরেছে। এসব দেশের মোট জনসংখ্যা এক বিলিয়নেরও কম। উদাহরণ হিসেবে যুক্তরাজ্যের জনসংখ্যা প্রায় ৭ কোটি এবং যুক্তরাষ্ট্রের জনসংখ্যা প্রায় ৩৪ কোটি।
কিন্তু চীনের জনসংখ্যা প্রায় ১৪০ কোটিরও বেশি, যা এই আধুনিকায়ন কর্মসূচিকে মানব ইতিহাসে অভূতপূর্ব করে তুলেছে। বিশাল এই জনসংখ্যা একদিকে যেমন বড় সুযোগ, অন্যদিকে তেমনি বড় চ্যালেঞ্জও। তবুও চীন প্রতিশ্রুতিবদ্ধ যে উন্নয়নের সুফল যেন দেশের প্রতিটি নাগরিকের কাছে পৌঁছায়। আগামী পাঁচ বছরে অর্থাৎ যা ২০২৬ থেকে ২০৩০ পর্যন্ত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে গড় আয়ু ৮০ বছরে উন্নীত করা, প্রতি এক হাজার মানুষের জন্য চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়িয়ে ৩ দশমিক ৭ জনে উন্নীত করা এবং স্থায়ী নগরায়নের হার ৭১ শতাংশে উন্নীত করা। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব লক্ষ্য অর্জন সহজ হবে না। কারণ চীনের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় মাথাপিছু আবাদযোগ্য জমি, পানিসম্পদ এবং অপরিশোধিত তেলের মজুত বৈশ্বিক গড়ের তুলনায় অনেক কম। এর পাশাপাশি দেশটি এখন জন্মহার কমে যাওয়া এবং দ্রুত জনসংখ্যা বৃদ্ধির বার্ধক্যজনিত সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে, যা আধুনিকায়নের পথে অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করছে।
চীনা সমাজবিজ্ঞান একাডেমির গবেষক ফু চেং (Fu Zheng) বলেন, চীনের বাস্তবতা ও পরিস্থিতি অন্য অনেক দেশের থেকে আলাদা। তাই পশ্চিমা অর্থনীতির তৈরি আধুনিকায়ন মডেল সরাসরি অনুসরণ করা সম্ভব নয়। বরং চীনকে নিজস্ব বাস্তবতা অনুযায়ী নীতি ও কৌশল তৈরি করে নিজস্ব পথেই আধুনিকায়নের লক্ষ্য অর্জন করতে হবে। বিশ্লেষকদের মতে, যদি এই পরিকল্পনা সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়, তবে তা শুধু চীনের উন্নয়ন নয়, বরং বিশ্বের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় জনসংখ্যাভিত্তিক আধুনিকায়নের এক নতুন অধ্যায় রচনা করবে।
আজাদ/ তথ্য ও ছবি: সিনহুয়া