বাংলাদেশে রকমেলন বা Cantaloupe (ফুটি) এখনও নতুন ফল হলেও এর বাজার চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। জাপানের জনপ্রিয় এই ফল এখন কৃষকদের মধ্যে উচ্চ ফলন ও লাভজনকতার জন্য বিশেষ আগ্রহ তৈরি করেছে। কিন্তু সঠিক চাষপদ্ধতি না জানার কারণে অনেকেই রকমেলন চাষ শুরু করতে পারেন না। এই গাইডে রকমেলন চাষের জমি প্রস্তুতি থেকে সার প্রয়োগ, চারা রোপণ, সেচ, রোগ–বালাই দমন—সবকিছু ধাপে ধাপে দেওয়া হলো।
Table of Contents
রকমেলন কী? (What is Rockmelon?)
রকমেলনের অন্যান্য নাম—
-
সুইট মেলন
-
মাস্ক মেলন
-
হানিডিউ
-
আরব দেশে “সাম্মাম”
রকমেলনের চাষের সঠিক পদ্ধতি
উপযুক্ত মাটি
-
সুনিষ্কাশিত দো-আঁশ মাটি সবচেয়ে ভালো।
-
লবণাক্ত বা অতিরিক্ত ক্ষারীয় মাটি উপযোগী নয়।
চাষের সময় (Season for Cultivation)
রকমেলনের হানি জুস জাত সাধারণত বছরে দুইবার চাষ করা যায়:
1️⃣ মধ্য ফেব্রুয়ারি – মধ্য মার্চ (ফালগুন)
2️⃣ মধ্য জুন – মধ্য সেপ্টেম্বর (আষাঢ়–ভাদ্র)
গ্রিনহাউসে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করে সারা বছর চাষ করা সম্ভব।
জমি প্রস্তুতি
-
জমি ৪–৫ বার চাষ দিয়ে ভালোভাবে ঝুরঝুরে করতে হবে।
-
প্রথম চাষের পর বিঘা প্রতি:
-
গোবর সার: ৫ টন
-
জিপসাম: ২৫০ কেজি
-
-
সার মেশানোর পর জমি ২ সপ্তাহ ফেলে রাখা উত্তম।
বেড তৈরি ও মালচিং
বেড তৈরি
-
চারপাশে ১ ফুট নালা
-
বেডের প্রস্থ: ৩.৫ ফুট, উচ্চতা: ০.৫ – ১ ফুট
-
বেডের মাঝের নালা: ২ ফুট
মালচিং পদ্ধতি
-
বিঘা প্রতি ২টি মালচিং শিট (৪ ফুট × ১৩০০ ফুট)
-
কাটা গুনা দিয়ে দুই পাশে মালচিং শক্ত করে বাঁধতে হবে
-
বাতাসে যাতে উড়ে না যায়, মাঝে মাঝে সামান্য মাটি দিতে হবে
-
শাটার কাটার দিয়ে ছিদ্র তৈরি
-
চারা থেকে চারা দূরত্ব: ২ ফুট
-
সারি থেকে সারি দূরত্ব: ২ ফুট
সার প্রয়োগ (Fertilizer Management)
প্রাথমিক সার
-
গোবর সার: বিঘায় ৫ টন
-
জিপসাম/চুন: বিঘায় ২৪০ কেজি
-
ইউরিয়া: ১০ কেজি
-
টিএসপি: ৩০–৩৫ কেজি
-
এমওপি/পটাশ: ৫০ কেজি
-
জিংক: ২ কেজি
-
বোরন: ১.৫ কেজি
-
ম্যাগনেসিয়াম সালফেট: ১২০ কেজি
-
সালফার: ২ কেজি
-
রিজেন্ট/রাগবি: ১.৫ কেজি
📌 নোট:
-
মাটির pH যদি ৬–এর নিচে হয়, প্রতি শতকে ৪ কেজি চুন দিতে হবে।
-
চুন দিলে ম্যাগসার আলাদা করে দিতে হবে না।
চারা তৈরি ও রোপণ পদ্ধতি
-
বীজ কয়েক ঘণ্টা রোদে শুকিয়ে নিন
-
পরে ছায়ায় রেখে ঠান্ডা করে নিন
-
পানি + ছত্রাকনাশকে ২০ মিনিট ভিজিয়ে নিন
-
আবার ৩–৪ ঘণ্টা শুধু পানিতে ভিজিয়ে রাখুন
-
সিড ট্রেতে বপন করুন
-
পানি স্প্রে করে ১–২ দিন ট্রে ঢেকে রাখুন
-
১০–১২ দিনের চারা (২–২.৫ পাতা) জমিতে রোপণ করুন
-
ছিদ্র করা মালচিং বেডে চারা বসান
-
প্রতি গর্তে ৬ ফুট লম্বা কঞ্চি ক্রস করে সাপোর্ট দিন
টব/বাড়ির ছাদে চাষ
-
১০–১২ ইঞ্চি টবে ২টি বীজ ০.৫ ইঞ্চি মাটির নিচে বপন করুন
-
জৈবসার সমৃদ্ধ মাটি ব্যবহার করুন
পোকামাকড় ও রোগবালাই দমন
১. এফিড ও থ্রিপস
ক্ষতি: পাতা হলুদ, কুঁকড়ে যায়।
দমন: থায়ামেথক্সাম স্প্রে।
২. লিফ মাইনার
ক্ষতি: পাতায় সর্পিল সুড়ঙ্গ তৈরি করে।
দমন: অ্যাবামেকটিন স্প্রে।
৩. ফল মাছি
ক্ষতি: ফলের ভেতর পচন ধরায়।
দমন: ম্যালাথিয়ন ৩–৪ বার স্প্রে।
৪. পাউডারি মিলডিউ
দমন: পানিতে দ্রবণীয় সালফার ১০ দিন পর পর ২–৩ বার স্প্রে।
৫. সাডেন উইল্ট
দমন:
-
জলাবদ্ধতা দূর করুন
-
আক্রান্ত গাছ ধ্বংস
-
কার্বেনডাজিম/থিওফ্যানেট-মিথাইল স্প্রে
সেচ ও পরিচর্যা
-
বপনের পর ২–৩ দিন অন্তর হালকা সেচ
-
ফুল আসার পর ১ দিন পর পর সেচ
-
ফসল তোলার ৩–৬ দিন আগে সেচ বন্ধ
লতা ব্যবস্থাপনা
-
মাচা বা খড় বিছিয়ে লতা ধারণ
-
নিয়মিত আগাছা পরিষ্কার
-
১৫–২০ দিন পর পর আগাছা দমন
কাটিং খুব গুরুত্বপূর্ণ
-
নিচের সব ডাল ফেলে দিয়ে মাত্র ১টি ডাল রাখতে হবে
-
৭–৮ পাতা হলে শীর্ষ কেটে দিন
-
৮ম–১২তম পাতার গোড়ায় ফল ধরার পরাগায়ন করুন
-
প্রতি গাছে ২টি ফলের বেশি রাখা যাবে না
ফলন ও ফসল সংগ্রহ
-
সঠিক চাষে প্রতি গাছে ৮–১২টি ফল পাওয়া যায়
-
ফল হলুদ হলে সংগ্রহের সময়
-
ফল ১৫০–২০০ গ্রাম হলে বাছাই করে রাখুন