মার্চ ২৫, সিএমজি বাংলা ডেস্ক: বোয়াও ফোরাম ফর এশিয়ার (বিএফএ) মঙ্গলবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদন অনুসারে, বৈশ্বিক জিডিপিতে এই অঞ্চলের অংশ ক্রমাগত বাড়তে থাকায় এশিয়া, বিশ্বের প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবেই থাকছে।
‘এশীয় অর্থনৈতিক পূর্বাভাস ও একীকরণ অগ্রগতি বার্ষিক প্রতিবেদন ২০২৬’ শীর্ষক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, ২০২৬ সালে এশীয় অর্থনীতি ৪.৫ শতাংশ প্রসারিত হবে বলে আশা করা হচ্ছে এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতার ভিত্তিতে বৈশ্বিক জিডিপিতে এর অংশ ২০২৫ সালের ৪৯ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪৯ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছাবে।
বিএফএ’র মহাসচিব চাং চুন এক সংবাদ সম্মেলনে বলেন, অনেকেই বিশ্বাস করেন যে ‘এশীয় শতাব্দী’ ইতোমধ্যেই এসে গেছে। উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও, এশিয়ার অর্থনীতি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে স্থিতিশীল রয়েছে এবং বৈশ্বিক অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও টেকসই উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
২০০১ সালে প্রতিষ্ঠিত বিএফএ একটি বেসরকারি ও অলাভজনক আন্তর্জাতিক সংস্থা, যা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণকে উৎসাহিত করতে এবং এশীয় দেশগুলোকে তাদের উন্নয়ন লক্ষ্যের কাছাকাছি নিয়ে আসতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ।
দক্ষিণ চীনের হাইনান প্রদেশে ২৪ থেকে ২৭ মার্চ পর্যন্ত চলমান এই বছরের সম্মেলনের মূল বিষয়বস্তু হলো ‘একটি অভিন্ন ভবিষ্যৎ গঠন: নতুন গতিশীলতা, নতুন সুযোগ, নতুন সহযোগিতা’।
প্রতিবেদন অনুসারে, এশিয়া প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগের জন্য বিশ্বের প্রধান গন্তব্য হিসেবে তার অবস্থান ধরে রেখেছে, যা তার স্থিতিস্থাপকতা, প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা এবং বিশ্বব্যাপী বিনিয়োগকারীদের কাছে তার দীর্ঘস্থায়ী আকর্ষণের জন্য স্বীকৃত। এক্ষেত্রে চীন এবং আসিয়ান সবচেয়ে আকর্ষণীয় গন্তব্য হিসেবে নেতৃত্ব দিচ্ছে।
প্রযুক্তি ক্ষেত্রে, প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) উন্নয়নের বৈশ্বিক কেন্দ্রবিন্দু ক্রমশ ইউরোপ এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে এশিয়ার দিকে সরে আসছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘বিপুল ডিজিটাল জনগোষ্ঠী, বৈচিত্র্যময় অ্যাপ্লিকেশন ইকোসিস্টেম এবং সুসংহত নীতি কাঠামোর সদ্ব্যবহার করে এশীয় অর্থনীতিগুলো দ্রুত এআই’র অনুসারী থেকে অগ্রগামীতে পরিণত হচ্ছে।’
ডেলয়েট চায়না রিসার্চের অংশীদার লিডিয়া চেন বলেছেন, এআই শিল্প-শৃঙ্খল এখন ব্যাপক এবং জটিল, যেখানে বিভিন্ন এশীয় দেশের নিজস্ব শক্তি রয়েছে। ভবিষ্যতে শিল্প, সফটওয়্যার, ডেটা এবং নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ উপাদানগুলোর আরও সুবিধাজনক ও কার্যকর প্রবাহকে সহজতর করতে সাহায্য করবে।
মঙ্গলবার এশিয়ার টেকসই উন্নয়ন বিষয়ক একটি প্রতিবেদনও উন্মোচন করা হয়েছে, যেখানে তুলে ধরা হয়েছে যে, সবুজ ও স্বল্প-কার্বন শক্তির দিকে বৈশ্বিক পরিবর্তনে এশিয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে এবং 'প্রচলিত শক্তি ব্যবহারের বৃহত্তম কেন্দ্র' থেকে 'পরিচ্ছন্ন শক্তি উন্নয়নে অগ্রণী' হয়ে উঠছে।
এশীয় একীকরণের অগ্রগতির প্রসঙ্গে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এশীয় বাণিজ্য একীকরণের ভিত্তি ক্রমাগত শক্তিশালী হয়েছে। এতে এমন তথ্য উদ্ধৃত করা হয়েছে যে, আন্তঃআঞ্চলিক বাণিজ্য নির্ভরশীলতা ২০২৩ সালের ৫৬.৩ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ৫৭.২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে, কারণ এই অঞ্চলের প্রধান অর্থনীতিগুলো ক্রমবর্ধমানভাবে তাদের বাণিজ্যিক সম্পর্ককে একে অপরের অভিমুখী করছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের অর্থনীতিগুলো স্বতন্ত্র একীকরণ থেকে বৈশ্বিক মূল্য-শৃঙ্খলের দিকে ক্রমশ একটি অংশীদারিত্বমূলক আঞ্চলিক একীকরণের মডেলে রূপান্তরিত হচ্ছে এবং এই অঞ্চলের অভ্যন্তরীণ সমর্থনে অনেকেই মূল্য-শৃঙ্খলের সিঁড়িতে উপরের দিকে উঠছে।
ডিজিটাল অবকাঠামোতে ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ, এশিয়ার বিশাল বাজারের চাহিদাজনিত সুবিধা এবং গভীরতর আঞ্চলিক অর্থনৈতিক একীকরণের ফলে এই অঞ্চলটি ক্রমান্বয়ে বৈশ্বিক পরিষেবা বাণিজ্যের অংশগ্রহণকারী থেকে এর অন্যতম প্রধান প্রবৃদ্ধির চালিকাশক্তিতে রূপান্তরিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এশিয়াকে বৈশ্বিক প্রবৃদ্ধির আলোকবর্তিকা হিসেবে বর্ণনা করে রোলান্ড বার্জারের গ্লোবাল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ডেনিস ডেপো উল্লেখ করেছেন, উল্লেখযোগ্য প্রযুক্তিগত সাফল্যের দ্বারা চালিত হয়ে এই ধারায় চীন একটি শক্তিশালী ভূমিকা পালন করছে।
আন্তর্জাতিক ব্যবসায় ও অর্থনীতি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের ডিন সাং বাইচুয়ান বলেছেন, ‘বিশাল বাজারের সুবিধা নিয়ে চীন বিশ্বের কাছে তার উন্মুক্ততাকে আরও প্রসারিত করছে, বিশেষ করে এমন এক নতুন ধরনের অর্থনৈতিক বিশ্বায়নকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে যা সকলের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক ও উপকারী। এটি চীনের উন্মুক্ত ও বিশাল বাজারকে এশীয় অর্থনীতি এবং বৃহত্তর বিশ্বের জন্য আরও সুযোগ তৈরি করতে সক্ষম করে।’
তিনি আরও যোগ করেন যে, এর ফলে এশিয়ার অর্থনীতির অভ্যন্তরীণ সংহতি আরও শক্তিশালী হবে এবং বাহ্যিক ধাক্কা মোকাবেলায় এর সক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে।
এপিইসি সচিবালয়ের সাবেক নির্বাহী পরিচালক রেবেকা ফাতিমা স্টা মারিয়া বলেন, ‘আঞ্চলিক সহযোগিতা ব্যবস্থাগুলো উন্মুক্ত থাকা এবং নীতিগত নিশ্চয়তা প্রদানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে কাজ করে। এই নিশ্চয়তা বিনিয়োগ আকর্ষণ করতে এবং আরও টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নকে উৎসাহিত করতে পারে।’
এই বছর অ্যাপেক 'চীন বর্ষ' হিসেবে পালিত হচ্ছে, যার মূলভাব হলো 'একসাথে সমৃদ্ধির জন্য একটি এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় সম্প্রদায় গড়ে তোলা'। চীন নভেম্বরে ৩৩তম অ্যাপেক অর্থনৈতিক নেতাদের বৈঠকের আয়োজন করবে।
সূত্র: সিএমজি