আফরিন মিম চীনা নববর্ষ বা ‘বসন্ত উৎসব’ মানেই পুনর্মিলন আর আনন্দের জোয়ার। কিন্তু সেই আনন্দের রঙ যখন বাংলাদেশের এতিম শিশু আর নিঃসঙ্গ প্রবীণদের জীবনে ছোঁয়া দিয়ে যায়, তখন তা হয়ে ওঠে সীমানা ছাড়ানো এক মানবিক মহাকাব্য। বৃহস্পতিবার রাজধানীর শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি এতিমখানা স্কুলে এমনই এক উৎসবমুখর দিন পার করলেন শতাধিক শিশু ও প্রবীণ।
চীনের ‘ঘোড়া বর্ষ’ (অশ্ব বর্ষ) উপলক্ষে ‘স্প্রিং ফেস্টিভ্যাল অ্যান্ড লাভ টুগেদার’ প্রতিপাদ্যে বিশেষ এই আয়োজনটি করে শান্ত-মারিয়াম হোংহ্য কনফুসিয়াস ক্লাসরুম। সকাল থেকেই এতিমখানা প্রাঙ্গণে ছিল সাজ সাজ রব; চীনা ঐতিহ্যের ছোঁয়ায় রঙিন হয়ে ওঠে চারপাশ। এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য ছিল চীনা সংস্কৃতির সঙ্গে বাংলাদেশি শিশুদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এবং দুই দেশের মানুষের মধ্যে আত্মার বন্ধন আরও দৃঢ় করা।
দিনভর চলে বর্ণিল সাংস্কৃতিক পরিবেশনা, ঐতিহ্যবাহী পেপার কাটিং, মুখোশ রঙ করা এবং মজার সব উপহার বিতরণের উৎসব। অনুষ্ঠানে কনফুসিয়াস ক্লাসরুমের চীনা পরিচালক প্রফেসর ওয়াং লিছিয়ং গভীর মমতার সঙ্গে সবাইকে অশ্ব বর্ষের শুভেচ্ছা জানান। তিনি বলেন, চীনা সংস্কৃতিতে বসন্ত উৎসব কেবল একটি ছুটি নয়, এটি ভালোবাসা আর একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর এক প্রাচীন ঐতিহ্য। আজ আমরা এখানে শুধু উপহার দিতে আসিনি, এসেছি এমন এক ভালোবাসার বন্ধন গড়তে যা জাতি ও সীমানার ঊর্ধ্বে। এদিন শিশুদের জন্য সবচেয়ে বড় চমক ছিল চীনের জাতীয় খেলা টেবিল টেনিসের সরঞ্জাম।
উপহার হিসেবে একটি আধুনিক টেবিল টেনিস টেবিল ও ব্যাট তুলে দেওয়া হয় তাদের হাতে। প্রফেসর লিছিয়ং আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, এই টেবিলটি যেন শিশুদের জন্য এক ‘আনন্দ নিকুঞ্জ’ হয়। টেবিল টেনিস যেমন শরীর সুস্থ রাখে, তেমনি বাড়ায় একাগ্রতা ও ধৈর্য। তিনি শিশুদের অশ্বের মতো অদম্য সাহস আর গতি নিয়ে বড় হওয়ার প্রেরণা দেন। কেবল শিশুরাই নয়, এদিন বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয় প্রবীণদেরও। তাদের একাকীত্ব কাটাতে উপহার দেওয়া হয়েছে রেডিও, যাতে সুর আর খবরের মাঝে কাটে তাদের অবসর। এছাড়া শিশুদের জন্য নতুন শিক্ষাসামগ্রী, শুভানুধ্যায়ীদের দান করা বই এবং এতিমখানার জন্য একটি রেফ্রিজারেটরও প্রদান করা হয়।
চীনা শুভানুধ্যায়ীদের পক্ষ থেকে এই উপহার এবং বসন্ত উৎসব পালনের সুযোগ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন শান্ত নিবাসের প্রজেক্ট ডিরেক্টর অবসরপ্রাপ্ত মেজর নাসির উদ্দিন। তিনি বলেন, আমাদের শিশুরা চীনের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে সরাসরি জানার সুযোগ পেয়েছে।পাশাপাশি আজকে পাওয়া এসব প্রয়োজনীয় উপহার তাদের দৈনন্দিন জীবনে খুব কাজে আসবে। প্রতিটি উপহারের সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল চীনা ও বাংলাদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অকৃত্রিম আন্তরিকতা। দিনশেষে একপাশে যখন শিশুরা টেবিল টেনিস ব্যাটে বলের টোকা দিচ্ছিল, আর অন্যপাশে প্রবীণরা রেডিওর নব ঘুরিয়ে গান শুনছিলেন—সেই দৃশ্যটিই যেন হয়ে ওঠে চীন-বাংলাদেশ বন্ধুত্বের সবচেয়ে সুন্দর প্রতিচ্ছবি। এই আয়োজন কেবল একটি উৎসব হয়ে থাকেনি, বরং এতিম শিশুদের জন্য এটি ছিল একরাশ স্বপ্নের সূচনা আর প্রবীণদের জন্য এক টুকরো অমলিন হাসি।
সূত্র: সিএমজি