২,৫০০ শিশুর জন্মে সহায়তা করেছেন ধাত্রী দেবলা মণ্ডল

২,৫০০ শিশুর জন্মে সহায়তা করেছেন ধাত্রী দেবলা মণ্ডল
২,৫০০ শিশুর জন্মে সহায়তা করেছেন ধাত্রী দেবলা মণ্ডল

সুন্দরবনে দূরত্ব মাপা হয় জলপথে। আর এখানে দেরি মানেই কখনও কখনও মৃত্যু। এমন জায়গায় হাসপাতালের ঠিকানার চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে একজন ধাত্রীর পৌঁছে যাওয়ার ক্ষমতা।

আমি যখন পৌঁছাই, দেবলা মণ্ডল তখন তাঁর ছোট গোয়ালঘরে মশারির চারপাশে ইট সাজাচ্ছিলেন। কোদালের চ্যাপ্টা দিক দিয়ে ইটগুলো চেপে দিচ্ছিলেন, যাতে রাতে মশারির কোণ উঠে না যায়। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে নরম আর হলুদ হয়ে আসছে—সুন্দরবনের সেই আলো, যা এখানে তাড়াতাড়িই নামে। সকালবেলার তুলনায় নদী তখন আরও চওড়া মনে হয়, আর বন যেন আরও কাছে এসে দাঁড়ায়।

তিনি ধীরে কাজ করছিলেন, কিন্তু বিন্দুমাত্র দ্বিধা ছাড়াই। হাতের নড়াচড়া দেখে মনে হচ্ছিল, এই কাজ তাঁর হাতে বহুদিন আগেই মুখস্থ হয়ে গেছে। এই একই হাত—পরে তিনি আমাকে বলেছিলেন—দুই হাজারেরও বেশি শিশুকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছে।

“আমি বসে থাকতে পারি না,” কাজ থামানো ছাড়াই বললেন তিনি। “কাজ না করলে শরীরটা অস্থির হয়ে ওঠে।”

দেবলার বয়স সত্তরের গোড়ায়—ঠিক কত, তা তিনি আর গুনে রাখেন না। তবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে সময় মনে রাখতে পারেন। স্বাধীনতা। বিয়ে। দেশছাড়া।

দাই হিসেবে তাঁর পথচলা শুরু যুদ্ধের কয়েক বছর পর, যখন দেশ ধীরে ধীরে আবার নিঃশ্বাস নিতে শিখছিল। “যুদ্ধের সময় না,” আমি জিজ্ঞেস করতেই তিনি শুধরে দিলেন। “যুদ্ধের পরে। সবকিছু শুরু হয় তারপর।”

আনুমানিক ৫৪ বছর ধরে তিনি সন্তান প্রসব করাচ্ছেন। মোট কতটি জন্ম—সে হিসাব ধরা কঠিন। “দুই হাজার? আড়াই হাজার?” কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন তিনি। “সব জায়গায়। এই গ্রাম, পাশের ইউনিয়ন, নদীর ওপারেও।”
গ্রামগুলোর নাম বলছিলেন যেন হাঁটার পথের বর্ণনা দিচ্ছেন—চুনকুড়ি, হারিনতানা, ঘোলখালি, বাজুয়া, ধোপাডি। এখানে গ্রামগুলোর দূরত্ব স্থলপথে নয়, জলপথে মাপা হয়। এই উপকূলীয় এলাকায় রাস্তা সহজেই হার মানে। নৌকা নয়।

সুন্দরবনের জলবায়ু—ছয় মাসের বর্ষা আর তারপর লবণাক্ত শুষ্ক মৌসুম—এখানে পানি যেমন জীবনধারণের উৎস, তেমনই বড় বিপদের কারণ। বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলীয় বাংলাদেশের পানির উৎসে লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ার ফলে উচ্চ রক্তচাপ, প্রি-এক্ল্যাম্পসিয়া, গর্ভপাতসহ নানা জটিলতায় ভুগছেন গর্ভবতী নারীরা। দূরবর্তী গ্রামগুলোতে স্বাস্থ্যসেবার পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায়, দেবলার মতো অভিজ্ঞ দাইদের উপস্থিতি হয়ে ওঠে জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন।

“আগে গর্ভাবস্থা শক্ত ছিল,” দেবলা বললেন। “এখন এই পানির কারণে মেয়েরা তাড়াতাড়ি ক্লান্ত হয়ে যায়, প্রেসার বাড়ে, অনেক সময় বাচ্চা টিকে থাকে না। পানি এমনই করে।”

রাতে ফোন এলে বিপদের কথা ভাবার সময় থাকে না। “ভয় থাকলে,” তিনি বললেন, “তখন সেটা টের পাওয়া যায় না।” কখনও ট্রলারে, কখনও এমন বৃষ্টির মধ্যে নদী পার হয়েছেন যেখানে তীররেখাই মিলিয়ে যায়। একবার ঝড়ের রাতে চালনার কাছে এক আত্মীয়ের বাড়ি গিয়েছিলেন কাঁপতে থাকা চোয়ালা ভ্যানে, যার লোহার ফ্রেম ঢিলা দাঁতের মতো কাঁপছিল। “বিপদ আসে,” বললেন তিনি। “সেটা পার হতে হয়।”

এখন দেবলা সঙ্গে খুব কম জিনিসই রাখেন। একসময় সরকার ব্লেড, সুতো, জীবাণুনাশক, নখ কাটার মতো ছোটখাটো প্রয়োজনীয় জিনিস দিত। নীতিগতভাবে হাসপাতালভিত্তিক প্রসবকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পর সেই সহায়তা বন্ধ হয়ে গেছে।

“এখন সবকিছু হাসপাতালেই,” তিনি বললেন। “তাই আর কিছু দেয় না।” যা রয়ে গেছে, তা হলো অভিজ্ঞতা—প্রসব যন্ত্রণার শরীর পড়তে পারার ক্ষমতা, কখন অপেক্ষা জীবন বাঁচাবে আর কখন দেরি প্রাণ নেবে, তা বোঝার দক্ষতা।

“যদি দেখি আমি সামলাতে পারছি না,” তিনি বললেন, “তাহলে হাসপাতালে নিয়ে যাই।”

সবচেয়ে কাছের ভালো হাসপাতাল মংলা বা খুলনায়। ভোর তিনটায় সেই যাত্রা ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাগতে পারে। অনেক সময় শিশু অপেক্ষা করে না। হারিনতানার এক নারীর কথা বললেন দেবলা—ব্যক্তিগত গাড়িতে ঝাঁঝনিয়া ক্লিনিকের দিকে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ তীব্র ব্যথা উঠল।

“আমি বললাম, কিছু বলবেন না,” দেবলা স্মৃতিচারণ করলেন। “যা হওয়ার হবে। আমি ধরে আছি।”
হাসপাতাল চোখের সামনেই, কিন্তু রাস্তার ধারে তিন ব্যাটারির টর্চের আলোয় জন্ম নেয় একটি ছেলে। গেটে গিয়ে দেবলা মিথ্যে বলেছিলেন—খুলনার পথে সন্তান হয়েছে। সেটাই সহজ ছিল।

নৌকাতেও সন্তান জন্মেছে। একবার পশুর নদীর মাঝখানে, জোয়ার-ভাটার ফাঁকে, জন্ম নেয় এক কন্যাশিশু। পরিবার ছেলের আশা করছিল। হাসপাতালে যেতে তারা রাজি হয়নি। “খরচ খুব বেশি,” তারা বলেছিল। ফিরে গিয়েছিল।

লিঙ্গ নিয়ে সামাজিক প্রত্যাশা দেবলার কাজকে আজও প্রভাবিত করে। তিনি এক নারীর কথা বললেন, যিনি দুইবার আল্ট্রাসাউন্ডে শুনেছিলেন যে গর্ভে কন্যাসন্তান। রেগে গিয়ে বলেছিলেন, জন্ম হলে শিশুটিকে ফেলে দেবেন। গভীর রাতে দেবলাকে ডাকা হয়। জন্ম হয়—একটি ছেলে। দেবলা শিশুটিকে লুকিয়ে রাখেন, মাকে বলেন এটি মেয়ে। বাইরে গিয়ে ফোনে তিনি শিশুটির পক্ষাঘাতগ্রস্ত দাদাকে সত্যি জানান। “মিষ্টি আনবেন,” বলেছিলেন তিনি। “আর এখনই মাকে কিছু বলবেন না।”

এই দীর্ঘ কাজের জন্য পারিশ্রমিক খুবই কম। এখন সাধারণত পাঁচশ টাকা দেওয়া হয়, কখনও একটু বেশি। আগে কাপড়, থালা, গ্লাস দেওয়া হতো। আজ তিনি যে কমলা রঙের শাড়িটি পরেছেন, সেটিও এমনই একটি উপহার। “এখন কেউ বাড়তি কিছু দেয় না,” নির্লিপ্তভাবে বললেন তিনি। আত্মীয়স্বজন অনেক সময় কিছুই দেয় না।

তার প্রথম প্রসব ছিল জোগাই মাথায় অজিত পাখির ছেলের। সেই শিশু এখন মধ্যবয়সী, থাকে ভারতে। “তার দাঁত পড়ে গেছে,” হেসে বললেন দেবলা। তাঁর সর্বশেষ প্রসব হয়েছিল মাত্র কয়েক দিন আগে, চালনার কাছে বুলুকের বাড়িতে। ডাক থামে না, যদিও এখন তাঁর গতি কিছুটা কমেছে।

দেবলার বিয়ে হয়েছিল এগারো বছর বয়সে। ১৯৭৮ সালে তিনি ভারতে চলে যান, স্বাধীনতার পর মাঘ মাসে ফিরে আসেন। তাঁর স্বামী নিরোদ মণ্ডল ছিলেন পোস্টমাস্টার—চুপচাপ, তীক্ষ্ণ বুদ্ধির মানুষ, যিনি তাঁর কাজকে সমর্থন করতেন। “খুবই ভদ্র মানুষ,” দেবলা বললেন। তাঁদের চার সন্তান—দুই ছেলে, দুই মেয়ে। প্রত্যেকের দুইটি করে সন্তান। আটজনই জন্মেছে দেবলার নিজের হাতে। তিনি নামগুলো এমন যত্নে বললেন, যেন জপমালার দানা গুনছেন।

তিনি কখনও ঢাকায় যাননি। আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পেয়েছিলেন অনেক পরে, বনিশান্তায়, যখন রেজিনা নামে এক নারী স্থানীয় কয়েকজন মহিলাকে ধাত্রীবিদ্যা শেখাতে আসেন। থানার সহায়তায় আয়োজন হয়েছিল। সরকারি এক চিকিৎসক বক্তব্য দিয়েছিলেন। পনেরো জন প্রশিক্ষণার্থী এসেছিলেন। “আমি তো তার অনেক আগেই শুরু করে দিয়েছি,” বললেন দেবলা। “অনেক আগেই।”

এখন এই প্রথা ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। তরুণীরা হাসপাতাল চায়; হাসপাতাল চায় সিজার। দেবলা স্পষ্টভাষী। “ওরা কাটে,” তিনি বললেন। “মেরুদণ্ডে ইনজেকশন দেয়। সেই ব্যথা সারা জীবন থাকে।” গ্রামে, উল্টোভাবে, নতুন মা এক সপ্তাহ শুয়ে থাকে—পরিবার তাকে খাওয়ায়, আগলে রাখে। এটি যত্নের এক ভিন্ন অর্থনীতি, যা নীতিমালায় সহজে ধরা পড়ে না।

আমি জানতে চেয়েছিলাম, পথে হাঁটতে হাঁটতে যখন কেউ বারবার বলে—এই মানুষটি আপনার হাতে জন্মেছিল—তখন কেমন লাগে। তিনি কাঁধ ঝাঁকালেন। “অনেকে বলে। সবাইকে তো মনে রাখা যায় না।” তবু তিনি লক্ষ করেন, মানুষ তাঁকে কীভাবে সম্মান করে। দিদি, খালা, দাদি বলে ডাকে। বসতে বলে। খেতে দেয়।

সন্ধ্যা নামলে দেবলা আবার ইটগুলো ঠিক করে দেখলেন—মশারির কোথাও ফাঁক রইল কি না।

“মানুষের বিপদের মধ্যে ঢুকতে হয়,” তিনি বললেন। “বিপদে বন্ধু হতে হলে, যেতেই হয়।”

আমি পরে বলেছিলাম, “এত জন্মের গল্প। এত অলৌকিক ঘটনা।”
তিনি হালকা হাসলেন—সম্মতিতে নয়, বরং একটু বিভ্রান্তির মতো। যেন ‘অলৌকিক’ শব্দটি ঠিক মানানসই নয়। আমি যখন জিজ্ঞেস করলাম, কেন তিনি রাতে নদী পেরিয়ে বেরিয়ে পড়েন, তখন তাঁর চোখে এমন এক সহজ প্রশ্নের ছায়া দেখলাম—বিপদে মানুষকে সাহায্য করা কি ঠিক কাজ নয়?

পঞ্চাশ বছরের বেশি সময় ধরে দেবলা মণ্ডল এমন ডাকের উত্তর দিয়ে চলেছেন। গ্রামের পথে হাঁটতে গেলে প্রায়ই কোনো নারী থামিয়ে পাশের বড় হয়ে যাওয়া শিশুটির দিকে দেখিয়ে বলেন,
“দেখেন, দিদি—আপনার হাতের বাচ্চা। কত বড় হয়ে গেছে দেখছেন?”

দেবলা শোনেন, মাথা নেড়ে দেন, কখনও হাসেন। এখন আর সব মুখ মনে থাকে না। কত যে জীবন একসময় অল্প সময়ের জন্য তাঁর দুই তালুর মধ্যে ধরা দিয়েছিল—তার হিসাব নেই।


(দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড থেকে ভাষান্তর)

Rate This Article

How would you rate this article?

ED Desk

ED Desk

Staff Reporter

Experience in write about 5 years.

Our Editorial Standards

We are committed to providing accurate, well-researched, and trustworthy content.

Fact-Checked

This article has been thoroughly fact-checked by our editorial team.

Expert Review

Reviewed by subject matter experts for accuracy and completeness.

Regularly Updated

We regularly update our content to ensure it remains current.

Unbiased Coverage

We strive to present balanced information.