মহাকাশ প্রযুক্তির সংমিশ্রণে চীনের কৃষিতে যুক্ত হলো নতুন এক অধ্যায়। মধ্য চীনের হেনান প্রদেশের নানইয়াং অঞ্চলের গোলাপের বীজ মহাকাশ ঘুরে পৃথিবীতে ফিরে এসেছে।দেশটির স্পেস ব্রিডিং কর্মসূচিতে যা কিনা এক অভূতপূর্ব অগ্রগতি। নানইয়াংয়ের বিখ্যাত একটি গোলাপ প্রজাতির বীজ বহন করা হয় লিহং-১ ওয়াই১ সাব-অরবিটাল যানের রিটার্ন ক্যাপসুলে। এটি একটি বাণিজ্যিক পুনরুদ্ধারযোগ্য মহাকাশযান, যেটাকে ভবিষ্যতে স্পেস ট্যুরিজমের কাজে ব্যবহারের পরিকল্পনা রয়েছে। চীনের বাণিজ্যিক মহাকাশ প্রতিষ্ঠান সিএএস স্পেস নির্মিত যানটি গত ১২ জানুয়ারি উত্তর-পশ্চিম চীনের চিউছুয়ান স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ কেন্দ্র থেকে প্রথম পরীক্ষামূলক উড্ডয়ন সম্পন্ন করে। পরে প্যারাশুটের মাধ্যমে নিরাপদে ক্যাপসুলটি উদ্ধার করা হয় এবং শুক্রবার এর জৈবিক পেলোড আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়।
লিহং-১ ওয়াই১-এর প্রধান নকশাবিদ ও প্রকল্প কমান্ডার শি সিয়াওনিং জানান, গোলাপের বীজগুলো প্রায় ৩০০ সেকেন্ড মহাকাশে অবস্থান করে, যেখানে সেগুলো মহাজাগতিক বিকিরণের সংস্পর্শে আসে—যা জিনগত পরিবর্তন ঘটাতে সক্ষম। নানইয়াং ভোকেশনাল কলেজ অব এগ্রিকালচার, নানইয়াং একাডেমি অব ফরেস্ট্রি এবং হেনান এগ্রিকালচারাল ইউনিভার্সিটির যৌথ উদ্যোগে এসব বীজ সতর্কতার সঙ্গে নির্বাচন ও কৃত্রিম সংকরায়নের মাধ্যমে প্রস্তুত করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, এগুলো উচ্চমানের জিনগত বৈশিষ্ট্যের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভান্ডার। ভূপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার উচ্চতায় মাইক্রোগ্র্যাভিটি ও তীব্র মহাজাগতিক বিকিরণের পরিবেশে স্বল্প সময়ের এই অবস্থান বীজগুলোর মধ্যে জিনগত মিউটেশন সৃষ্টির উদ্দেশ্যে করা হয়। গবেষকদের লক্ষ্য হলো বেশি রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন দীর্ঘ সময় ফুল টিকে থাকে এমন নতুন ও আকর্ষণীয় গোলাপের জাত উদ্ভাবন করা। মহাকাশ মিউটাজেনেসিস ব্রিডিংকে মহাকাশ প্রযুক্তি ও আধুনিক কৃষির মধ্যে এক সেতুবন্ধন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এতে তুলনামূলকভাবে বেশি হারে মিউটেশন ঘটানো সম্ভব এবং প্রজনন চক্রও ছোট হতে পারে।
নানইয়াংয়ের গোলাপ বীজ সফলভাবে ফিরে আসায় ফুল, শস্য ও সবজিসহ বিভিন্ন ফসলে একই ধরনের পরীক্ষা করা এখন আরও সহজ হবে। মহাকাশ ঘুরে আসা বীজগুলো নানইয়াংয়ের জাতীয় গোলাপ জার্মপ্লাজম ব্যাংকে পাঠানো হয়েছে। সেখানে সেগুলোর নিয়মিত চাষ, বাছাই ও পর্যবেক্ষণ করা হবে, যাতে মহাকাশে সৃষ্ট জিনগত সম্ভাবনা উন্মোচিত করা যায়। লিহং-১ ওয়াই১ যানটি কম খরচে ও নমনীয় উপকক্ষীয় গবেষণাগার হিসেবে নকশা করা হয়েছে, যা বৈজ্ঞানিক পেলোডের জন্য ৩০০ সেকেন্ডের বেশি উচ্চমানের মাইক্রোগ্র্যাভিটি পরিবেশ দিতে পারে। গোলাপ বীজের পাশাপাশি এতে চাইনিজ একাডেমি অব সায়েন্সেসের ইনস্টিটিউট অব মেকানিক্স উদ্ভাবিত মাইক্রোগ্র্যাভিটি লেজার অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং সরঞ্জামও বহন করা হয়েছিল। যানটি একাধিকবার পুনর্ব্যবহারের উপযোগী করে উন্নয়ন করা হচ্ছে। এর উপপ্রধান নকশাবিদ ওয়াং ইংচেং জানান, ক্রু লাইফ-সাপোর্ট ও উচ্চ নির্ভরযোগ্যতা সম্পন্ন নিরাপত্তা প্রযুক্তি যুক্ত করতে বিস্তৃত পরীক্ষা চলছে, যা ভবিষ্যতে কম খরচে উপকক্ষীয় বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং বাণিজ্যিক স্পেস ট্যুরিজমের সম্ভাবনা আরও বাড়াবে।
লেখক: ফয়সল আবদুল্লাহ