চার দেয়ালের কারাবন্দী জীবনের কঠোর বাস্তবতার মধ্যেও ঈদ আসে এক ভিন্ন আবহ নিয়ে। নানা সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে এই দিনটিতে বন্দীদের জীবনে যোগ হয় কিছুটা আনন্দ, কিছুটা স্বস্তি আর স্বজনদের স্মৃতিমাখা আবেগ। উন্নত খাবার, ধর্মীয় আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রিয়জনের সঙ্গে কথা বলার সুযোগ সব মিলিয়ে কারাগারেও ঈদ হয়ে ওঠে মানবিক অনুভূতির এক বিশেষ দিন।
কারা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ঈদ-উল-ফিতর উপলক্ষে দেশের কারাগারগুলোতে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। সাধারণ বন্দীদের পাশাপাশি ভিআইপি ও ডিভিশনপ্রাপ্ত বন্দীদের জন্যও রাখা হয়েছে একই ধরনের খাবারের ব্যবস্থা।
ঈদের দিন সকালে বন্দীদের জন্য পরিবেশন করা হয় পায়েস, সেমাই ও মুড়ি। দুপুরের খাবারের তালিকায় ছিলো পোলাও, গরুর মাংস, মুরগির রোস্ট, সালাদ, মিষ্টি এবং পান-সুপারি। অমুসলিম বন্দীদের জন্য ছিলো খাসির মাংস। রাতের খাবারে থাকবে সাদা ভাত, আলুর দম ও রুই মাছ ভাজা।
শুধু কারা কর্তৃপক্ষের দেওয়া খাবারই নয়, ঈদের আনন্দ আরো বাড়িয়ে দিতে বন্দীরা স্বজনদের আনা খাবার খাওয়ার সুযোগও পেয়েছেন। নিরাপত্তা নিশ্চিত করে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর সেই খাবার ভেতরে প্রবেশ করানো হয়।
কারা কর্মকর্তারা জানান, সারা বছরের তুলনায় ঈদের দিনে বন্দীদের খাবারের মান উন্নত রাখতে মাথাপিছু ২৫০ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সাধারণ দিনে যেখানে সকালের নাশতায় থাকে হালুয়া,রুটি ও ডিম, আর দুপুর-রাতে ভাত, ডাল, সবজি বা মাছ-মাংস সেখানে ঈদের আয়োজন নিঃসন্দেহে বাড়তি আনন্দের উপলক্ষ হয়ে ওঠে।
তবে ঈদের আসল আনন্দ লুকিয়ে থাকে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগে। চার দেয়ালের ভেতরে বন্দি থাকা মানুষগুলোর জন্য পরিবারের কণ্ঠ শোনার সুযোগ যেন এক অমূল্য প্রাপ্তি। ঈদের দিন থেকে পরবর্তী তিন দিনের মধ্যে বন্দীরা একবার পাঁচ মিনিটের জন্য মুঠোফোনে কথা বলতে পারবেন স্বজনদের সঙ্গে। একই সময়ের মধ্যে একবার সরাসরি সাক্ষাতের সুযোগও দেওয়া হচ্ছে, যেখানে সাধারণত ১৫ দিন পরপর দেখা করার নিয়ম রয়েছে।
কারাগারের বাইরে অপেক্ষমাণ স্বজনদের জন্যও রয়েছে ছোট্ট আপ্যায়ন। প্রিয়জনের সঙ্গে দেখা করতে আসা মানুষদের রজনীগন্ধা ফুল, চকলেট ও জুস দিয়ে আপ্যায়ন করছে কারা কর্তৃপক্ষ, যা এই কঠিন বাস্তবতার মাঝেও মানবিকতার এক অনন্য উদাহরণ।
এ বিষয়ে কাশিমপুর হাই সিকিউরিটি কারাগারের সিনিয়র জেল সুপার মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, ঈদের দিন বন্দীরা যেন কিছুটা আনন্দ অনুভব করতে পারেন, সে লক্ষ্যেই বিশেষ খাবার, নামাজ ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছিল। পাশাপাশি স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থাও রাখা হয়েছে।
ঈদের দিন কারাগারের ভেতরেই অনুষ্ঠিত হয় জামাত। নামাজ শেষে শুরু হয় সাংস্কৃতিক আয়োজন, যেখানে বন্দীদের মধ্য থেকেই শিল্পীরা গান পরিবেশন করেন। এছাড়াও বন্দীদের অংশগ্রহণে প্রীতি ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছে।
বর্তমানে গাজীপুরের কাশিমপুরের চারটি কারাগারে প্রায় ১০ হাজার বন্দী রয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর বিভিন্ন মামলায় আটক রয়েছেন, যাদের মধ্যে সাবেক মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও বিভিন্ন পেশাজীবীরাও রয়েছেন। তাদের অনেকেই এবার দ্বিতীয়বারের মতো ঈদ কাটাচ্ছেন কারাগারের ভেতরে।