চীনের ইয়ুননান প্রদেশের বিজ্ঞানীরা কফির স্বাদ আরও উন্নত করার একটি নতুন উপায় খুঁজে পেয়েছেন। এ কাজে তারা ব্যবহার করেছেন স্থানীয় একটি ছত্রাক। এই গবেষণা পুরোপুরি সফল হলে চীনের অ্যারাবিকা কফি আন্তর্জাতিক মানের ‘স্পেশালটি কফি’ শ্রেণিতে করে নেবে আরও শক্তপোক্ত জায়গা।
গবেষণার নেতৃত্ব দিচ্ছেন ছিউ মিংহুয়া। চীনের বিজ্ঞান একাডেমির অধীন খুনমিং উদ্ভিদবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের গবেষক তিনি। তার নেতৃত্বাধীন গবেষক দলটি আবিষ্কার করেছে, কফি ফলের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে থাকা কিছু ছত্রাক কফির ঘ্রাণ ও মিষ্টতা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়াতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, এই ছত্রাকগুলো কফি ফলের ভেতরে স্বাভাবিকভাবে বাস করে। তাই এগুলোকে এক ধরনের ‘প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা’ বলা হচ্ছে। কফির ভেতরের জটিল রাসায়নিক উপাদান ভেঙে এমন যৌগ তৈরি করে, যা কফির ঘ্রাণ ও স্বাদকে আরও সমৃদ্ধ করে এগুলো। গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ফুড কেমিস্ট্রির সাম্প্রতিক ইস্যুতে।
গবেষকরা ইয়ুননানের পাঁচটি প্রধান অ্যারাবিকা কফি জাত থেকে মোট ৬৫৫ ধরনের ছত্রাক আলাদা করতে সক্ষম হয়েছেন। এর মধ্যে একটি বিশেষ ছত্রাকের নাম টালারোমাইসিস ফানিকুলোসাস কেকিউ২। এটি ব্যবহার করার পর কফির স্বাদের মানদণ্ডে দেড় পয়েন্ট পর্যন্ত উন্নতি দেখা গেছে।
একই সঙ্গে কফিতে ভ্যানিলা ও দারুচিনির মতো নতুন সুগন্ধও তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী কফিকে ‘স্পেশালটি কফি’ বলতে কমপক্ষে ৮০ স্কোর পেতে হয়। এই ছত্রাক সেই সীমা অতিক্রম করতেও সাহায্য করছে।
ছিউ মিংহুয়া বলেন, আগে কফির স্বাদ মূলত নির্ভর করত কফির জাত, উৎপাদন অঞ্চল, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং রোস্টিংয়ের ওপর। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোয় অণুজীবের মাধ্যমে গাঁজন প্রক্রিয়াও কফির স্বাদ উন্নত করার গুরুত্বপূর্ণ উপায় হয়ে উঠেছে।
প্রচলিত গাঁজন পদ্ধতিতে সাধারণত বাইরে থেকে আনা এনজাইম বা ল্যাকটিক অ্যাসিড ব্যাকটেরিয়া ব্যবহার করা হয়। এতে স্থানীয় কফির নিজস্ব স্বাদ অনেক সময় বজায় থাকে না।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে, এই ছত্রাক ব্যবহারের ফলে কফিতে সুক্রোজ বা প্রাকৃতিক চিনির পরিমাণ প্রায় ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ বেড়েছে। পাশাপাশি ৪০ ধরনের বিশেষ রাসায়নিক উপাদানও শনাক্ত করা হয়েছে, যা কফির স্বাদ ও ঘ্রাণ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ছিউ মিংহুয়া এই ছত্রাকগুলোকে কফি ফলের ভেতরের ‘প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াজাত কারখানা’ হিসেবে তুলনা করেছেন। কারণ এগুলোর এনজাইম কার্যক্ষমতা বেশি এবং এগুলো জটিল যৌগ দ্রুত ভেঙে নতুন স্বাদের উপাদান তৈরি করতে পারে।
বিশেষ করে ইয়ুননানের কফির জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। কারণ দীর্ঘদিন ধরে ইয়ুননানের কফিতে ফুল বা ফলের মতো সুগন্ধ তুলনামূলকভাবে কম ছিল।
ছিউ বলেন, কফি ফলের ভেতরের এই ছত্রাকগুলোয় অনেক সুগন্ধ তৈরিকারী অণুজীব রয়েছে। সঠিক ছত্রাক নির্বাচন করা গেলে স্বাদ ও ঘ্রাণ সমৃদ্ধ করা সম্ভব।
এখন ইয়ুননান কাঁচা কফি সরবরাহকারী অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে উচ্চমূল্যের স্পেশালটি কফি উৎপাদক অঞ্চলে পরিণত হওয়ার চেষ্টা করছে। তাই স্থানীয় স্বাদের বিশেষ বৈশিষ্ট্য তৈরি করা এখন অগ্রাধিকার পাচ্ছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইয়ুননান ছিল চীনের সবচেয়ে বড় কফি রপ্তানিকারক অঞ্চল। প্রদেশটি দেশের মোট কফি রপ্তানির ৪০ শতাংশেরও বেশি সরবরাহ করেছে বলে জানিয়েছে খুনমিং শুল্ক প্রশাসন।
এ ছাড়া গত তিন থেকে চার বছরে ইয়ুননানের কফি শিল্পের আকার দ্রুত বেড়েছে। শিল্পটির মোট উৎপাদনমূল্য ১০ বিলিয়ন ইউয়ান থেকে প্রায় ১০০ বিলিয়ন ইউয়ানে পৌঁছেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয় কর্তৃপক্ষ।
ফয়সল/সাকিব
তথ্য ও ছবি: চায়না ডেইলি