শেকড়ের টানে ঈদ: তারুণ্যের চোখে উৎসবের ভিন্ন রঙ

শেকড়ের টানে ঈদ: তারুণ্যের চোখে উৎসবের ভিন্ন রঙ
শেকড়ের টানে ঈদ: তারুণ্যের চোখে উৎসবের ভিন্ন রঙ

রমজানের দীর্ঘ সিয়াম সাধনা শেষে শাওয়ালের চাঁদ বয়ে আনে পরম আনন্দ। ঈদ মানেই তো যান্ত্রিকতা ভুলে শেকড়ের টানে প্রিয়জনদের কাছে ফিরে যাওয়া। নতুন পোশাকের উজ্জ্বলতা ছাপিয়ে এই দিনটি হয়ে ওঠে ভালোবাসা ও ত্যাগের এক অনন্য মিলনমেলা। ঈদের এই আনন্দ কেবল উদযাপনেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সমাজের সুবিধাবঞ্চিতদের সাথে খুশি ভাগ করে নেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে এর প্রকৃত সার্থকতা। পবিত্র ঈদকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন প্রান্তের শিক্ষার্থীদের বৈচিত্র্যময় ভাবনা ও অনুভূতির কথাগুলোই আজ আমরা জানবো। আর এই বিষয়গুলোই তুলে ধরেছেন ইকবাল মাহমুদ


ঈদ মানে হলো ফিরে আসার টান

ঈদের আনন্দ আসলে কেবল ক্যালেন্ডারের একটি তারিখ নয়, বরং এটি হৃদয়ের এক গভীর অনুভূতির নাম। দীর্ঘ এক মাস আত্মশুদ্ধির পথ পেরিয়ে ঈদ যখন আমাদের দুয়ারে কড়া নাড়ে, তখন চারপাশের বাতাসেও যেন এক পশলা প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ে।
​আমার ভাবনায়, ঈদ মানে হলো ফিরে আসার টান। যান্ত্রিক জীবনের ব্যস্ততা ভুলে শেকড়ের টানে আপনজনদের কাছে ছুটে যাওয়া আর শৈশবের সেই অমলিন স্মৃতিগুলোকে নতুন করে ঝালিয়ে নেওয়ার নামই ঈদ। নতুন পোশাকের উজ্জ্বলতার চেয়েও বেশি উজ্জ্বল হয়ে ওঠে যখন অনেকদিন পর প্রিয় মানুষের হাসিমুখটা সামনে দেখি। সেমাইয়ের মিষ্টি ঘ্রাণ আর ঈদের নামাজের পর সেই চিরাচরিত কোলাকুলি—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব ভালোলাগায় মন ভরে ওঠে। ​তবে ঈদের পূর্ণতা পায় তখনই, যখন আমাদের এই আনন্দের ভাগ সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষগুলোও পায়। নিজের সুখকে বিলিয়ে দেওয়ার মাঝেই লুকিয়ে আছে ঈদের আসল সার্থকতা। ঈদ হোক আমাদের ভেতরের অহংকার আর ভেদাভেদ ঘুচিয়ে দিয়ে একে অপরকে ভালোবাসার এক পহেলা বৈশাখী উৎসবের মতো রঙিন মিলনমেলা।

তাসনুভা বিনতে ইসলাম 
লোকপ্রশাসন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

ঈদের আনন্দ কমেনি—বরং বদলে গেছে তার রূপ

ঈদ একসময় ছিল নিখাদ আনন্দের প্রতীক—নতুন জামা, নামাজ শেষে কোলাকুলি, মেলায় ঘুরে বেড়ানো আর সেমাইয়ের ঘ্রাণে ভরা দিন। এখন সময় বদলেছে; ব্যস্ততা ও প্রযুক্তির ভিড়ে সেই সরল আনন্দ কিছুটা ম্লান। 

বয়স বাড়ার সাথে সাথে ঈদের আনন্দটাও কিছুটা বদলে গেছে, মেলায় যাওয়া বা বন্ধুদের সঙ্গে  ঘোরাঘুরি আগের মতো দেখা যায় না, অনেকেই ঈদের আনন্দ সীমাবদ্ধ রাখে মোবাইলের পর্দায়।

তবুও ঈদ হারিয়ে যায়নি। পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানো, প্রিয়জনদের সঙ্গে দেখা করা আর একসঙ্গে খাবার ভাগ করে নেওয়ার মধ্যেই আজও ঈদের আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে। তাই বলা যায়, ঈদের আনন্দ কমেনি—বরং বদলে গেছে তার রূপ।

এলাহী মঞ্জুর ইমন
পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়।

 

"ঈদ মানেই ইহকালীন জীবনের এক সেরা উৎসব"

ঈদ প্রতিটা মুসলমানদের জন্য এক বৈধ আনন্দের দিন।এই দিন আসলেই সকলের মুখে হাসি ফুটে।বছরের বিগত মাসগুলোর দুঃখ ভুলে সবাই একাত্ম হয়ে নিজেদের আনন্দ ভাগাভাগি করে নেয়।গরীব-দুঃখী মানুষদের মনেও খুশির জোয়ার দেখা যায়।তারা তাদের যাবতীয় কষ্ট ভুলে একটু সুখ খোঁজার চেষ্টা করে।আত্মীয় -স্বজনসহ পরিচিত, অপরিচিত, বন্ধু-বান্ধব, প্রতিবেশী সকলে একে অন্যের সাথে কুশল বিনিময় করে।একজন আরেকজনের বাড়িতে যায়।মুসলমানদের এই উৎসব ধর্মীয় শিষ্টাচার এবং নৈতিকতা মেনে করা হয়।শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রীক নয় বরং সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য আনন্দের দুয়ার যেন খুলে দেয় এই উৎসব।ঈদের নামায পরা,পোশাক পরা,খাবার খাওয়া, ঘুরতে যাওয়া সব মিলিয়ে মুসলিমরা তাদের যাবতীয় দুঃখকে ভুলে থাকার চেষ্টায় থাকে এই দিনে।এই সাময়িক আনন্দ বিশেষ হয়ে উঠে সকলের কাছে এই দিনের রহমতময় ফজিলত এর জন্য ।এজন্য ঈদকে বলা হয় মুসলমান জাতির  জন্য একটি পবিত্র দিন।

আফিয়া আলম 
সমাজকল্যাণ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।


সকলে সাথে এবারের ঈদ হোক পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ

ঈদ মানে খুশি ও আনন্দ। দীর্ঘ একমাস সিয়াম সাধনার পর যখন ঈদের চাঁদ দেখা যায় তখন মনে এক গভীর অনুভূতি তৈরি হয়।আমার কাছে ঈদ মানে মিলনমেলা । জীবনের সকল কর্ম ব্যস্ততা ভুলে একদিন পরিবার , আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু বান্ধবীদের সাথে আনন্দ মুহূর্ত পার করার নাম ঈদ । নতুন পোশাকে পরিবারের সকলের সাথে নামাজ আদায় করা ,মজা মজা খাবার খাওয়া ও সালামি গ্রহণ করা যেন এক প্রশান্তি ধারা সৃষ্টি করে। তেমনি ভালো লাগে পরিবারের গুরুজনদের সাথে দেখা করতে এবং তাদের কাছে থেকে দোয়া নিতে।
তবে ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায় যখন সমাজের সকল শ্রেণীর মানুষের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়া হয়। এক কাতারে দাঁড়িয়ে সকল শ্রেণীর মানুষ ঈদের সালাত আদায় করা । অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মধ্যে খাবার বিতরণ করা। যা ঈদের সৌন্দর্য কে দ্বিগুণ করে দেয় । সকলে সাথে এবারের ঈদ হোক পবিত্র ও শান্তিপূর্ণ।

মির্জা ফারিহা ইয়াসমিন স্নেহা 
মার্কেটিং বিভাগ, রাজশাহী কলেজ, রাজশাহী।

 

বাড়ি ফেরার আনন্দটাই আলাদা

রাজশাহী কলেজে পড়ার কারণে বছরের বেশিরভাগ সময়ই পরিবার থেকে দূরে থাকতে হয়। ক্লাস, পরীক্ষা, সহশিক্ষা কার্যক্রম আর শহরের ব্যস্ততায় দিনগুলো কেটে যায় দ্রুতই। কিন্তু এই ব্যস্ততার মাঝেও মনটা কোথাও যেন পড়ে থাকে, বাড়ির উঠোনে পরিচিত মুখগুলো আর আপন মানুষের সান্নিধ্যে। তাই ঈদ এলেই প্রথম যে অনুভূতিটা গভীরভাবে নাড়া দেয়, তা হলো বাড়ি ফেরার আনন্দ।

ঈদ ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় বাড়ি ফেরার প্রস্তুতি। বাসস্ট্যান্ড কিংবা রেলস্টেশনের ভিড়, দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে টিকিট সংগ্রহ, কখনো কষ্টকর যাত্রা -সবকিছুই যেন এক অন্যরকম আনন্দে ভরে ওঠে। পথের কষ্ট তখন আর কষ্ট মনে হয় না, বরং প্রতিটি মুহূর্তেই থাকে প্রিয়জনদের কাছে ফেরার এক অদম্য টান। জানালার বাইরে ছুটে চলা দৃশ্যপট আর মনে জমে থাকা অপেক্ষা নিয়ে তৈরি হয় এক অনন্য অনুভূতি।

বাড়িতে পৌঁছানোর পর যে প্রশান্তি মেলে, তা কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যায় না। মায়ের হাতে রান্না করা প্রিয় খাবারের স্বাদ, পরিবারের সবার সঙ্গে একসঙ্গে বসে খাওয়া, ছোট ছোট আড্ডা গুলোর মুহূর্তই ঈদের প্রকৃত আনন্দকে পূর্ণতা দেয়। সারা বছর যাদের জন্য মন কাঁদে, তাদের সঙ্গে কাটানো এই অল্প কয়েকটা দিন যেন জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় হয়ে ওঠে।

শহরের ব্যস্ত, যান্ত্রিক জীবনের বাইরে গ্রামের স্নিগ্ধ পরিবেশে কাটানো সময় মনকে নতুন করে সতেজ করে তোলে। খোলা আকাশ, সবুজ মাঠ, ভোরের নরম বাতাস কিংবা সন্ধ্যার নিরিবিলি সময় -এক অন্যরকম শান্তি অনুভব করা যায়। এই স্বস্তি ও প্রশান্তিই নতুন উদ্যমে আবার কাজে ফেরার প্রেরণা জোগায়। বছরের ব্যস্ততার মাঝেও এই কয়েকটি দিন যেন জীবনের সবচেয়ে সুন্দর স্মৃতিগুলোকে নতুন করে রাঙিয়ে দেয়। সত্যিই, বাড়ি ফেরার আনন্দের মতো আর কিছুই নেই।

আবু রায়হান
শিক্ষার্থী, সংস্কৃত বিভাগ, রাজশাহী কলেজ।


ঈদ বয়ে আনুক সৌহার্দ্যের প্রকৃত বন্ধন

ঈদ মানে হাসি-খুশি, আনন্দ, ভালোবাসা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন। ঈদ কেবল ধর্মীয় উৎসব নয়, এটি সর্বজনীন আনন্দের দিন। এই দিনে ধনী-গরিবের ভেদাভেদ ভুলে সবাই এক কাতারে শামিল হয়। ঈদ শুধু ব্যক্তিগত আনন্দ নয়, এটি সম্মিলিতভাবে উদযাপনের আনন্দ, যেখানে প্রত্যেক মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখ ভাগ করে নেয়। তবে ঈদের আনন্দ তখনই পূর্ণতা পায়, যখন সমাজের প্রতিটি মানুষ এতে অংশ নিতে পারে। দরিদ্র, অসহায় ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই ঈদের প্রকৃত সৌন্দর্য। আমাদের উচিত ঈদের খুশিকে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেওয়া, যাতে কেউ আনন্দ থেকে বঞ্চিত না থাকে। এ বছর ঈদ এমন এক সময়ে এসেছে, যখন বিশ্ব নানা সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। যুদ্ধ, দারিদ্র্য, বৈষম্য ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে অনেক মানুষ কষ্টে আছে। তবে আমরা আশা করি শীঘ্রই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। ঈদ যাত্রায় সড়কপথ, রেলপথ, নৌপথে চলাচলে আমাদের আরও সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। একটু অসাবধানতায় শতশত ঈদের খুশি মলিন হয়ে দুঃখের ভার নেমে আসছে। সবাইকে আরও সাবধান থাকতে হবে এবং সবার পাশে থাকতে হবে। ঈদ আমাদের শেখায়- মানবতার পাশে দাঁড়ানোই প্রকৃত ধর্মীয় দায়িত্ব। আমরা ঈদে আমরা একটি সুন্দর, শান্তিপূর্ণ সমাজ গড়ার শপথ নেই। এই ঈদ আমাদের সবার জীবনে বয়ে আনুক অনাবিল সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধি।


উম্মে সালমা 
অর্থনীতি বিভাগ, চট্টগ্রাম কলেজ।

Rate This Article

How would you rate this article?

ইকবাল মাহমুদ

ইকবাল মাহমুদ

অতিথি লেখক

Experienced writer with deep knowledge in their field.

Our Editorial Standards

We are committed to providing accurate, well-researched, and trustworthy content.

Fact-Checked

This article has been thoroughly fact-checked by our editorial team.

Expert Review

Reviewed by subject matter experts for accuracy and completeness.

Regularly Updated

We regularly update our content to ensure it remains current.

Unbiased Coverage

We strive to present balanced information.