সম্প্রতি নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ টমাস সার্জেন্ট চায়না মিডিয়া গ্রুপকে (সিএমজি) দেওয়া এক বিশেষ সাক্ষাৎকারে চীন-মার্কিন সম্পর্ক এবং তাঁর দৃষ্টিতে চীনের সার্বিক চিত্রসহ নানা বিষয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন। তিনি বছরের পর বছর ধরে চীন সফর করে আসছেন এবং মনে করেন, চীনের এই অভাবনীয় উন্নয়ন সত্যিই এক বিস্ময়।
সাক্ষাৎকারে এই বিস্ময়ের পেছনের প্রাতিষ্ঠানিক যুক্তি ও সাংস্কৃতিক জিন নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি, তাঁর বিখ্যাত ‘যৌক্তিক প্রত্যাশা তত্ত্ব’ কীভাবে চীনের পাঁচসালা পরিকল্পনার সঙ্গে অনুরণিত হয়—তা নিয়ে তিনি বিস্তারিত কথা বলেন।
সাক্ষাৎকারে টমাস সার্জেন্ট বলেন, "কয়েক দশক ধরে চীন পদ্ধতিগতভাবে বহির্বিশ্বের সঙ্গে উন্মুক্ততা বজায় রেখেছে। পণ্য ও সেবার বাণিজ্য, আন্তঃসীমান্ত অবাধ বাণিজ্য, বন্দর খুলে দেওয়া এবং সীমান্ত সংযোগ স্থাপন—এগুলো সবই চীনের সাফল্যের চাবিকাঠি।"
তিনি আক্ষেপের সুরে বলেন, "আমার দেশ (যুক্তরাষ্ট্র) যখন বাণিজ্যযুদ্ধ শুরু করেছে—যা যুক্তরাষ্ট্রের নিজেদের উন্নয়নের জন্যই সহায়ক নয়—তখন আপনি বুঝতে পারবেন কেন আমি বিষয়টি এতটা গভীরভাবে উপলব্ধি করছি। চীন এমন কিছু সঠিক কাজ করছে, যা আমেরিকা এখন আর করছে না। যেমন—বাজার উন্মুক্ত করা, বিজ্ঞানচর্চা এগিয়ে নেওয়া, শিক্ষার প্রতি গুরুত্ব দেওয়া, উচ্চশিক্ষায় মনোযোগ দেওয়া এবং অধ্যাপক ও শিক্ষার্থীদের বৈজ্ঞানিক চেতনাকে সম্মান করতে শেখানো। এগুলোই সাফল্যের মূল উপাদান।"
তাঁর মতে, এর সবকিছুর পেছনে রয়েছে চীনের শীর্ষ নেতাদের সঠিক সিদ্ধান্ত, যা দেশে সৃজনশীলতা, উদ্যোক্তা মনোভাব ও গবেষণার সক্ষমতাকে উজ্জীবিত করেছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, "যুক্তরাষ্ট্রের উচিত চীনের কাছ থেকে শেখা, কারণ চীন এই কাজগুলো অত্যন্ত সুচারুভাবে করেছে। ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে: যেসব দেশ বহির্বিশ্বের সঙ্গে উন্মুক্ততা বজায় রাখে, উদ্যোক্তা মনোভাবকে উজ্জীবিত করে এবং স্থিতিশীল শৃঙ্খলা, নিয়মকানুন ও ভালো ব্যবসায়িক পরিবেশ নিশ্চিত করে, তারাই দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন অর্জন করতে পারে।"
চীনের নীতি নির্ধারণী দূরদর্শিতার প্রশংসা করে তিনি বলেন, চীন সমাজ ও অর্থনীতির উন্নয়নের দিকনির্দেশনার জন্য সম্প্রতি তাদের "পঞ্চদশ পাঁচসালা পরিকল্পনা" ঘোষণা করেছে। এই পরিকল্পনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে গভীরভাবে সংযুক্ত।
তিনি ব্যাখ্যা করেন, "পাঁচ বছর মোটেও ছোট সময় নয়। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন পাঁচ বছর, দশ বছর কেন নয়? কারণ, খুব দূরের ভবিষ্যৎ অনেক অনিশ্চিত। পাঁচ বছরের পরিকল্পনা অনেক বেশি বাস্তবসম্মত, যেখানে প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তনের জন্য জায়গা রাখা যায়। আর চীন তাদের প্রতিটি পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনাকে একের পর এক সুনিপুণভাবে সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছে।"
মার্কিন অর্থনীতি প্রসঙ্গে এই নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদ বলেন, "এখন পর্যন্ত এমন কোনো প্রমাণ নেই যে উৎপাদন শিল্প আমেরিকায় ফিরে আসছে। অত্যধিক উচ্চ শুল্ক আরোপ করে আমেরিকার বাজার বন্ধ করে দিলেই উৎপাদন শিল্পের চাকরি আমেরিকায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়। এটি কোনোভাবেই মুক্ত বাজার অর্থনীতির লক্ষণ নয়।"
সবশেষে চীনের সাফল্যের মূলমন্ত্র সম্পর্কে তিনি বলেন, "আপনি যখন আমাকে জিজ্ঞেস করেন চীন কোন কাজটি সঠিকভাবে করেছে, তখন আমি বলব—চীন একটি চমৎকার নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। সরকার নিয়ম তৈরি করে, একটি সাধারণ দিকনির্দেশনা নির্ধারণ করে দেয় এবং তারপর মানুষকে নিজ নিজ দক্ষতা প্রয়োগের সুযোগ দেয়। এই নিয়মের কাঠামোর ভেতরেই পূর্ণ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে একটি ন্যায্য প্রতিযোগিতার পরিবেশ তৈরি হয়। ঠিক এই বিষয়টিই অর্থনীতিবিদরা প্রশংসা করেন এবং অধিকাংশ মানুষ এমনটাই প্রত্যাশা করে।"
(শুয়েই/তৌহিদ/জিনিয়া)